ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আমদানি কার্গো ভিলেজে লাগা ভয়াবহ আগুন কেবল কয়েকশ’ কোটি টাকার পণ্যই নষ্ট করেনি, এটি দেশের সামগ্রিক বাণিজ্য কার্যক্রম এবং আমদানি-রপ্তানির সরবরাহ (লজিস্টিক) শৃঙ্খলে বড় ধরনের আঘাত হেনেছে। বিমানবন্দরের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এমন ঘটনা বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের নিরাপত্তা ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছে।
বিমানবন্দর কার্গো ভিলেজ হলো আকাশপথে পণ্য পরিবহন ও বাণিজ্যের মূল কেন্দ্র। এখান থেকেই প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তৈরি পোশাক, ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ, ওষুধ, কৃষিপণ্য, ফুল এবং উচ্চমূল্যের পার্সেল আমদানি ও রপ্তানি হয়।
আগুনে এসব পণ্যের বিশাল অংশ নষ্ট হওয়ায় শত শত দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান ও ক্রেতার চালান সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তার মতে, “এটা শুধু পণ্যের ক্ষতি নয়, পুরো সাপ্লাই চেইন অচল হয়ে গেছে। কার্গো হ্যান্ডলিং বন্ধ থাকলে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য আটকে থাকবে।”
প্রাথমিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েকশ’ কোটি টাকা অনুমান করা হলেও, এর চেয়েও গভীর ক্ষতি হচ্ছে দেশের রপ্তানি আস্থা ও লজিস্টিক সক্ষমতায়।
চরম ঝুঁকিতে তৈরি পোশাক খাত
পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, বিমানযোগে পাঠানো চালানগুলো সাধারণত অতি জরুরি হয়, যেখানে সময়ই প্রধান বিবেচ্য বিষয়। বিজিএমইএ-র এক পরিচালক বলেন, “একটি চালান যদি ২৪ ঘণ্টা দেরি হয়, তবে অনেক সময় পুরো অর্ডারই বাতিল হয়ে যায়। এই বিলম্ব পুরো খাতের সুনামকে ক্ষুণ্ন করে।”
বিকেএমইএ ও ইএবি’র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম কার্গো ভিলেজের নিরাপত্তা দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “এত সংবেদনশীল জায়গায় এমন দুর্ঘটনা অগ্রহণযোগ্য। সাম্প্রতিক সময়ে মিরপুর, চট্টগ্রাম ইপিজেড এবং এখন বিমানবন্দরে—পরপর এই অগ্নিকাণ্ডগুলো নিছক দুর্ঘটনা নাকি নাশকতার অংশ, তা দ্রুত তদন্ত করা দরকার।”
আমদানিকারক ও ভোক্তার ওপর চাপ
কার্গো ভিলেজের আগুনে ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল, শিল্পযন্ত্রাংশ, মোবাইল ফোন, ইলেকট্রনিক পণ্য, খাদ্য ও ফলমূলের চালানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব আমদানিকারক বিমা দাবি ছাড়া আর কোনো পথ পান না, যা নিষ্পত্তি হতে মাসের পর মাস সময় লাগতে পারে। ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, এই আর্থিক ক্ষতির বোঝা শেষ পর্যন্ত আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি ও বাজারমূল্য বাড়ানোর মাধ্যমে সাধারণ ভোক্তার ওপর পড়বে। বিশেষ করে ওষুধ ও খাদ্যপণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হলে অভ্যন্তরীণ বাজারে ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক আস্থায় টানাপোড়েন
একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে আগুন নিয়ন্ত্রণে না আসা আন্তর্জাতিক লজিস্টিক কোম্পানি, বিমা সংস্থা ও বিদেশি ক্রেতাদের আস্থায় বড় ধাক্কা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের নিরাপত্তা মান নিয়ে প্রশ্ন উঠলে আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন বা বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলোর মূল্যায়নে দেশের রেটিং কমতে পারে। এর ফলস্বরূপ, কার্গো হ্যান্ডলিং ও বিমা প্রিমিয়াম উভয়ই বেড়ে যেতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমিয়ে দেবে।
ক্ষতির পরিমাণ ছাড়াতে পারে হাজার কোটি
শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে দৈনিক ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টন পণ্য ওঠানামা করে। যদি কার্গো ভিলেজের কার্যক্রম ৩ থেকে ৫ দিন ব্যাহত থাকে, তবে সরাসরি অর্থনৈতিক ক্ষতি ৩০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার মধ্যে হতে পারে। তবে বিআইডিএস-এর অর্থনীতিবিদদের মতে, রপ্তানি বাতিল, আমদানি বিলম্ব, বিমা ব্যয় এবং লজিস্টিক খরচ যোগ করলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক ক্ষতি এক হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।
অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হানের মতে, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে একের পর এক এই দুর্ঘটনাগুলো রপ্তানি খাতের পুনরুদ্ধারের পথে বড় বাধা সৃষ্টি করছে এবং উৎপাদনের ধারাবাহিকতা ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন জরুরি ভিত্তিতে ক্ষয়ক্ষতির তালিকা তৈরি, বিকল্প কার্গো হ্যান্ডলিং ব্যবস্থা চালু এবং বিমা দাবি দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে, কার্গো ভিলেজে আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, ডিজিটাল মনিটরিং এবং উন্নত নিরাপত্তা প্রোটোকল নিশ্চিত করতে হবে।
সব মিলিয়ে, বিমানবন্দরের আগুনের ধোঁয়া এখন কেবল পণ্য পোড়ার প্রতীক নয়—এটি বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের দুর্বল অবকাঠামো ও নিরাপত্তা সংস্কৃতির কঠোর বাস্তবতাকেও ফুটিয়ে তুলেছে।
রিপোর্টারের নাম 
























