ঢাকা ০৬:০৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

শাহজালাল বিমানবন্দরের আগুনে কয়েক হাজার কোটি টাকার পণ্য ছাই

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৩১:১৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৫
  • ৭৯ বার পড়া হয়েছে

প্রায় সাত ঘণ্টার ভয়াবহ তাণ্ডবের পর অবশেষে নিয়ন্ত্রণে এসেছে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আমদানি কার্গো ভিলেজের আগুন। ফায়ার সার্ভিসের ৩৭টি ইউনিট সহ অন্যান্য বাহিনীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শনিবার (১৮ অক্টোবর) রাত ৯টা ১৮ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে, এই প্রতিবেদন লেখার সময় (রাত ২টা) পর্যন্ত আগুন পুরোপুরি নেভানো সম্ভব হয়নি।

দুপুর আনুমানিক ২টা ১৫ মিনিটে কার্গো এলাকায় হঠাৎ আগুন লাগার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সাথে যোগ দেয় বিমান বাহিনী, নৌবাহিনী, পুলিশ, র‍্যাব, আনসার এবং সেনাবাহিনী।

প্রায় ১২ ঘণ্টা ধরে চলা এই অগ্নিকাণ্ডে বিমানবন্দরের আমদানি কার্গো শাখায় রাখা হাজার হাজার কোটি টাকার মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এই শাখায় বিদেশ থেকে আমদানি করা পোশাক, ইলেকট্রনিকস সামগ্রী, বিভিন্ন রাসায়নিক পণ্য এবং আরও নানা ধরনের পণ্য মজুত ছিল।

বিমানবন্দরের ৮ নম্বর গেটের পাশের এই আমদানি কার্গো শাখায় কুরিয়ার সার্ভিস, ফার্মাসিউটিক্যাল, কুল রুম, বিস্ফোরক দ্রব্যের (ডেঞ্জারাস গুডস) গোডাউন, আমদানি করা মোবাইল এবং বিজিএমইএর গোডাউন ছিল। আগুনে সব পণ্য নষ্ট হওয়ায় ব্যবসায়ীরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

তামিম এক্সপ্রেস লিমিটেডের পরিচালক সুলতান আহমেদ জানান, সকালে তাঁর কোম্পানির প্রায় আড়াই টন মালামাল কার্গো শাখায় এসেছিল। শনিবার অর্ধদিবস কার্যক্রম থাকায় তিনি সেগুলো বের করতে পারেননি এবং সবকিছু পুড়ে শেষ হয়ে গেছে।

কর্মরত ব্যক্তিরা জানান, আমদানি করা রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থ থাকায় আগুন দ্রুত ভয়াবহ আকার ধারণ করে। এ কারণে পানি দিয়েও সহজে আগুন নেভানো সম্ভব হচ্ছিল না, বরং আগুন আরও দাউদাউ করে জ্বলতে থাকে।

অগ্নিকাণ্ডের কারণে বিমানবন্দরে প্রায় ৭ ঘণ্টা বিমান চলাচল বন্ধ থাকে। এতে বিভিন্ন দেশে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন। ফ্লাইট বন্ধ থাকায় টার্মিনালের ভেতরে ও বাইরে বহু যাত্রীকে দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষায় থাকতে দেখা যায়।

সিঙ্গাপুরগামী মিয়া পারভেজ, যাঁর ফ্লাইট ছিল রাত ১১টা ৫০ মিনিটে, তিনি গভীর উদ্বেগে ছিলেন। তিনি জানান, কাজে যোগ দেওয়ার নির্ধারিত তারিখ সোমবার। ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় সময়মতো যেতে না পারলে তাঁর চাকরি হারানোর এবং পারমিট বাতিলের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এদিকে, বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের স্বজনরাও বিমানবন্দরের বাইরে উৎকণ্ঠার সঙ্গে অপেক্ষা করেন। দুবাই থেকে আসা বাবা জালাল হাওলাদারকে নিতে আসা ১৫ বছর বয়সী রাফিয়া বলেন, অনেক দিন পর বাবাকে নিতে এসেও তাঁরা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না এবং কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে, সে বিষয়েও কেউ কিছু বলতে পারছে না।

আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর বিমান চলাচল কার্যক্রম পুনরায় চালু হয়েছে। রাত ৯টা ৬ মিনিটে ফ্লাই দুবাইয়ের একটি ফ্লাইট নিরাপদে শাহজালাল বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বেবিচকের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) কাউছার মাহমুদ এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

এদিকে, অগ্নিকাণ্ডের কারণ তদন্ত ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের জন্য দুটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে, যা পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেবে। অন্যদিকে, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ পাঁচ সদস্যের আরেকটি কমিটি করেছে।

ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল জানান, আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে তীব্র বাতাসই ছিল সবচেয়ে বড় বাধা। তিনি বলেন, খোলা জায়গায় প্রচুর বাতাস থাকায় অক্সিজেনের সরবরাহ অব্যাহত ছিল, যা আগুনকে ছড়াতে সহায়তা করে।

অগ্নিনির্বাপণের সময় আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ২৫ জন সদস্য আহত হয়েছেন। ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা উত্তর জোন কমান্ডার গোলাম মাওলা তুহিন জানান, আহতদের মধ্যে ১০ জনকে সিএমএইচ এবং ৮ জনকে কুর্মিটোলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বাকিদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

কার্গো নিরাপত্তা মূল্যায়নে শতভাগ নম্বর অর্জনের মাত্র এক সপ্তাহ পরই এই অগ্নিকাণ্ড ঘটায় এটিকে ঘিরে ‘ষড়যন্ত্রের ধোঁয়া’ তৈরি হয়েছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক বিবৃতিতে একাধিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাকে ‘পূর্বপরিকল্পিত’ এবং দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার চক্রান্ত বলে অভিযোগ করেছেন।

জবাবে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা সংস্থাগুলো প্রতিটি ঘটনা গভীরভাবে তদন্ত করছে। নাশকতা বা অগ্নিসংযোগের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেলে সরকার তাৎক্ষণিক ও দৃঢ় পদক্ষেপ নেবে। কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জনজীবন বা রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে বিঘ্নিত করার সুযোগ দেওয়া হবে না।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বিপিএল মহারণ: আজ সিলেট-রংপুর, ঢাকা-রাজশাহী; টিভিতে কখন দেখবেন?

শাহজালাল বিমানবন্দরের আগুনে কয়েক হাজার কোটি টাকার পণ্য ছাই

আপডেট সময় : ০৯:৩১:১৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৫

প্রায় সাত ঘণ্টার ভয়াবহ তাণ্ডবের পর অবশেষে নিয়ন্ত্রণে এসেছে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আমদানি কার্গো ভিলেজের আগুন। ফায়ার সার্ভিসের ৩৭টি ইউনিট সহ অন্যান্য বাহিনীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শনিবার (১৮ অক্টোবর) রাত ৯টা ১৮ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে, এই প্রতিবেদন লেখার সময় (রাত ২টা) পর্যন্ত আগুন পুরোপুরি নেভানো সম্ভব হয়নি।

দুপুর আনুমানিক ২টা ১৫ মিনিটে কার্গো এলাকায় হঠাৎ আগুন লাগার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সাথে যোগ দেয় বিমান বাহিনী, নৌবাহিনী, পুলিশ, র‍্যাব, আনসার এবং সেনাবাহিনী।

প্রায় ১২ ঘণ্টা ধরে চলা এই অগ্নিকাণ্ডে বিমানবন্দরের আমদানি কার্গো শাখায় রাখা হাজার হাজার কোটি টাকার মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এই শাখায় বিদেশ থেকে আমদানি করা পোশাক, ইলেকট্রনিকস সামগ্রী, বিভিন্ন রাসায়নিক পণ্য এবং আরও নানা ধরনের পণ্য মজুত ছিল।

বিমানবন্দরের ৮ নম্বর গেটের পাশের এই আমদানি কার্গো শাখায় কুরিয়ার সার্ভিস, ফার্মাসিউটিক্যাল, কুল রুম, বিস্ফোরক দ্রব্যের (ডেঞ্জারাস গুডস) গোডাউন, আমদানি করা মোবাইল এবং বিজিএমইএর গোডাউন ছিল। আগুনে সব পণ্য নষ্ট হওয়ায় ব্যবসায়ীরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

তামিম এক্সপ্রেস লিমিটেডের পরিচালক সুলতান আহমেদ জানান, সকালে তাঁর কোম্পানির প্রায় আড়াই টন মালামাল কার্গো শাখায় এসেছিল। শনিবার অর্ধদিবস কার্যক্রম থাকায় তিনি সেগুলো বের করতে পারেননি এবং সবকিছু পুড়ে শেষ হয়ে গেছে।

কর্মরত ব্যক্তিরা জানান, আমদানি করা রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থ থাকায় আগুন দ্রুত ভয়াবহ আকার ধারণ করে। এ কারণে পানি দিয়েও সহজে আগুন নেভানো সম্ভব হচ্ছিল না, বরং আগুন আরও দাউদাউ করে জ্বলতে থাকে।

অগ্নিকাণ্ডের কারণে বিমানবন্দরে প্রায় ৭ ঘণ্টা বিমান চলাচল বন্ধ থাকে। এতে বিভিন্ন দেশে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন। ফ্লাইট বন্ধ থাকায় টার্মিনালের ভেতরে ও বাইরে বহু যাত্রীকে দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষায় থাকতে দেখা যায়।

সিঙ্গাপুরগামী মিয়া পারভেজ, যাঁর ফ্লাইট ছিল রাত ১১টা ৫০ মিনিটে, তিনি গভীর উদ্বেগে ছিলেন। তিনি জানান, কাজে যোগ দেওয়ার নির্ধারিত তারিখ সোমবার। ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় সময়মতো যেতে না পারলে তাঁর চাকরি হারানোর এবং পারমিট বাতিলের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এদিকে, বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের স্বজনরাও বিমানবন্দরের বাইরে উৎকণ্ঠার সঙ্গে অপেক্ষা করেন। দুবাই থেকে আসা বাবা জালাল হাওলাদারকে নিতে আসা ১৫ বছর বয়সী রাফিয়া বলেন, অনেক দিন পর বাবাকে নিতে এসেও তাঁরা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না এবং কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে, সে বিষয়েও কেউ কিছু বলতে পারছে না।

আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর বিমান চলাচল কার্যক্রম পুনরায় চালু হয়েছে। রাত ৯টা ৬ মিনিটে ফ্লাই দুবাইয়ের একটি ফ্লাইট নিরাপদে শাহজালাল বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বেবিচকের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) কাউছার মাহমুদ এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

এদিকে, অগ্নিকাণ্ডের কারণ তদন্ত ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের জন্য দুটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে, যা পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেবে। অন্যদিকে, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ পাঁচ সদস্যের আরেকটি কমিটি করেছে।

ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল জানান, আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে তীব্র বাতাসই ছিল সবচেয়ে বড় বাধা। তিনি বলেন, খোলা জায়গায় প্রচুর বাতাস থাকায় অক্সিজেনের সরবরাহ অব্যাহত ছিল, যা আগুনকে ছড়াতে সহায়তা করে।

অগ্নিনির্বাপণের সময় আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ২৫ জন সদস্য আহত হয়েছেন। ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা উত্তর জোন কমান্ডার গোলাম মাওলা তুহিন জানান, আহতদের মধ্যে ১০ জনকে সিএমএইচ এবং ৮ জনকে কুর্মিটোলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বাকিদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

কার্গো নিরাপত্তা মূল্যায়নে শতভাগ নম্বর অর্জনের মাত্র এক সপ্তাহ পরই এই অগ্নিকাণ্ড ঘটায় এটিকে ঘিরে ‘ষড়যন্ত্রের ধোঁয়া’ তৈরি হয়েছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক বিবৃতিতে একাধিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাকে ‘পূর্বপরিকল্পিত’ এবং দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার চক্রান্ত বলে অভিযোগ করেছেন।

জবাবে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা সংস্থাগুলো প্রতিটি ঘটনা গভীরভাবে তদন্ত করছে। নাশকতা বা অগ্নিসংযোগের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেলে সরকার তাৎক্ষণিক ও দৃঢ় পদক্ষেপ নেবে। কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জনজীবন বা রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে বিঘ্নিত করার সুযোগ দেওয়া হবে না।