বাংলাদেশের স্যাটেলাইট টেলিভিশন জগতে একটি দীর্ঘদিনের প্রশ্ন— বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোর জন্য একটি সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট সম্প্রচার নীতিমালা কবে তৈরি হবে? বর্তমানে তথ্য মন্ত্রণালয় যেকোনো নাগরিকের আবেদনের ভিত্তিতেই বেসরকারি স্যাটেলাইট টিভির লাইসেন্স দিয়ে যাচ্ছে, আর এর পেছনে কোনো কড়া বা বাঁধাধরা নিয়ম কাজ করছে না। ২০১৪ সালে জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালায় একটি ‘সম্প্রচার কমিশন’ গঠনের কথা বলা হলেও, সেই সিদ্ধান্ত আর আলোর মুখ দেখেনি। এমনকি গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশও এ বিষয়ে বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে, সংশ্লিষ্টদের মনে বারবার একই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে: এই গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা কবে তৈরি হবে?
সুনির্দিষ্ট নিয়মের অনুপস্থিতির কারণে লাইসেন্স পাওয়ার পরও বেশ কিছু টিভি চ্যানেল এখনো সম্প্রচারে আসতে পারেনি। তারা কর্তৃপক্ষকে কেবল ‘প্রস্তুতি চলছে’ বলে জানাচ্ছে, কিন্তু কবে নাগাদ সম্প্রচার শুরু হবে, তার কোনো দিনক্ষণ দিতে পারছে না। গুরুতর অভিযোগ রয়েছে যে, এদের কেউ কেউ নাকি লাইসেন্সের মালিকানার অংশ গোপনে বিক্রি করে দেওয়ার চেষ্টাও করছে। এখন পর্যন্ত দেশে ৫০টি বেসরকারি টিভি চ্যানেল লাইসেন্স পেয়েছে, যার মধ্যে সম্প্রচারে রয়েছে মাত্র ৩৬টি। বাকি ১৪টি চ্যানেলের ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। অবশ্য, সম্প্রচার শুরু হওয়ার পর বিভিন্ন কারণে ছয়টি চ্যানেল বন্ধও হয়ে গিয়েছিল, যা এখনো আর চালু হয়নি। বর্তমানে চালু থাকা চ্যানেলগুলোর মধ্যে বিনোদনমূলক ২৩টি, সংবাদভিত্তিক ৮টি, আর বাকিগুলো সংগীত, শিশু-কিশোর, খেলাধুলা ও ইনফোটেইনমেন্ট ঘরানার।
তথ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আবেদন করার সময় জাতীয় পরিচয়পত্র, ট্রেড লাইসেন্স, কর সনদ এবং ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে চ্যানেল পরিচালনার সামর্থ্যের অঙ্গীকারনামাসহ আরও কিছু নথিপত্র জমা দিতে হয়। আবেদনপত্রটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে যাচাই করা হয় এবং সব মহলের ‘সবুজ সংকেত’ মিললেই বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) থেকে তরঙ্গ (ফ্রিকোয়েন্সি ক্লিয়ারেন্স) পাওয়া যায়।
অনেকে বলছেন, লাইসেন্স পাওয়ার পর চ্যানেলটিকে সম্প্রচারের যোগ্য করে তুলতে বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ দরকার হয়। এ কারণে কেউ কেউ বিনিয়োগকারী খুঁজতে সময় নেন, আবার কেউ কেউ পুরো মালিকানাই বিক্রি করার চেষ্টা করেন। পত্রিকা প্রকাশের ক্ষেত্রে ডিক্লারেশন পাওয়ার পর নির্দিষ্ট সময়ের বাধ্যবাধকতা থাকলেও, টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স পাওয়ার পর কত দিনের মধ্যে সম্প্রচারে আসতে হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় এই বিলম্ব হচ্ছে। আরেকটা জটিলতা হলো, কেউ যদি লাইসেন্স পাওয়ার পর চ্যানেল বিক্রি করতেও চান, তবুও লাইসেন্সটি যার নামে আছে, তাকেই চ্যানেলের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত থাকতে হয়—কারও কাছে লাইসেন্স হস্তান্তর করা যায় না। এসব জটিলতার কারণেই অনেক চ্যানেল লাইসেন্স পেয়েও সম্প্রচারে আসতে পারছে না। একাত্তর টিভির সাবেক কর্মকর্তা মনির হোসেন লিটনও মনে করেন, এই ধরনের নীতিমালা না থাকাটা টিভি চ্যানেলের সম্প্রচারে বিলম্বের অন্যতম প্রধান কারণ।
বাংলাদেশে স্যাটেলাইট টেলিভিশনের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৯২ সালে। ১৯৯৭ সালে এটিএন বাংলা এবং ১৯৯৯ সালে চ্যানেল আই সম্প্রচারে আসে। সরকার প্রথম বেসরকারি খাতে টিভির অনুমোদন দেয় ১৯৯৮ সালে। এরপর বিভিন্ন মেয়াদে আসা সরকারগুলো বিভিন্ন সময়ে চ্যানেলের অনুমোদন দিয়েছে। যেমন, ২০১৩ সালেই ১৫টি চ্যানেলকে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল। তবে, তথ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. মোহম্মদ আলতাব-উল-আলম এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। সব মিলিয়ে, বেসরকারি টিভি চ্যানেলের অনুমোদন প্রক্রিয়া ও সম্প্রচার কার্যক্রমকে একটি শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে দ্রুত একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।
রিপোর্টারের নাম 






















