ঢাকা ০৭:০২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন: লালদিয়া টার্মিনাল পরিচালনায় এপিএম টার্মিনালস, মালিকানা থাকছে বাংলাদেশের হাতে

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১১:৫৭:০৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৭ নভেম্বর ২০২৫
  • ১৫ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম বন্দরকে আধুনিকায়ন, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে নিতে ডেনমার্কভিত্তিক এপিএম টার্মিনালসকে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের কনটেইনার পোর্ট পারফর্মেন্স ইনডেক্স অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দরের নিম্ন অবস্থান (৪০৫টির মধ্যে ৩৩৪তম) এবং দুর্নীতি ও দীর্ঘ অপেক্ষার সময় দূর করে বিশ্বমানের অপারেশন নিশ্চিত করতেই সরকার এই মডেল গ্রহণ করেছে। ভিয়েতনামের কাই মেপ বন্দরের গ্লোবাল অপারেটর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়ে সপ্তম স্থানে উঠে আসার দৃষ্টান্তকে সামনে রেখে বাংলাদেশ এই পথে হাঁটছে।

টার্মিনাল নির্মাণ ও চুক্তির শর্তাবলী

  • মালিকানা ও বিনিয়োগ: আশিক চৌধুরী নিশ্চিত করেছেন যে পোর্টের মালিকানা কোনোভাবেই বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে যাচ্ছে না। বন্দরের মালিকানা বাংলাদেশের কাছেই থাকছে। এপিএম টার্মিনালস লালদিয়া চরে সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে প্রায় ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে বিশ্বমানের একটি টার্মিনাল নির্মাণ করবে এবং সাইনিং মানি হিসাবে ২৫০ কোটি টাকা দেবে।
  • পরিচালনার মেয়াদ: নির্মাণ শেষে এপিএম একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকবে। এই চুক্তির মেয়াদকাল হচ্ছে ৩০ বছর। মেয়াদ শেষে পুরো অবকাঠামো সরকারের অধীনেই ফিরে আসবে। বিডা চেয়ারম্যান এটিকে ‘গাড়ি আমাদের, তারা শুধু চালক’ বলে উল্লেখ করেন।
  • আয়ের কাঠামো: চুক্তির মেয়াদকালে হ্যান্ডেল করা প্রতিটি কনটেইনারের জন্য এপিএম টার্মিনালস বাংলাদেশকে একটি নির্দিষ্ট ফি দিবে। এমনকি, কোনো কনটেইনার হ্যান্ডেল করতে না পারলেও ন্যূনতম একটি ভলিউম ধরে পেমেন্ট করার শর্ত রয়েছে।
  • প্রকল্পের ধরণ: এটি একটি পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) প্রকল্প। রেগুলেটর হিসেবে কাজ করবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
  • চুক্তির প্রকাশ: আইনগত সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ দর কষাকষিতে দেশের স্বার্থ রক্ষার্থে ভারত ও চীনসহ অন্যান্য দেশের মতো এই চুক্তির পূর্ণাঙ্গ দলিল জনসম্মুখে প্রকাশ করা হচ্ছে না।

জাতীয় নিরাপত্তা ও লাভ

  • নিরাপত্তা: জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো ঝুঁকি তৈরি হবে না। নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসসহ সকল সংস্থার নিরাপত্তা প্রটোকল যথারীতি বলবৎ থাকবে। টার্মিনালে ব্যবহৃত প্রযুক্তি ও ডেটা লোকালাইজেশন ব্যবস্থা সরকারের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধান ও চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণাধীন থাকবে।
  • জাতীয় লাভ: এই চুক্তির ফলে দেশের নিম্নলিখিত লাভগুলো হবে:
    • প্রতি বছর অতিরিক্ত ৮ লাখ টিইইউ ধারণক্ষমতা যুক্ত হবে (প্রায় ৪৪% বৃদ্ধি)।
    • পণ্য পরিবহনের খরচ ও সময় কমবে।
    • দ্বিগুণ বড় কনটেইনার জাহাজ বন্দরে ভিড়তে পারবে এবং বিশ্বের দূরবর্তী দেশগুলোর সঙ্গে সরাসরি জাহাজ সংযোগ উন্মুক্ত হবে।
    • নির্মাণ ও পরিচালনা পর্যায়ে ৫০০-৭০০ সরাসরি স্থানীয় কর্মসংস্থান এবং পরিবহন ও লজিস্টিকস-এ হাজারেরও বেশি পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
    • স্থানীয় প্রকৌশলী ও ব্যবস্থাপকরা এপিএম টার্মিনালসের নিজস্ব ট্রেনিং প্রোগ্রামের মাধ্যমে বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ পাবেন।
    • এটি হবে দেশের প্রথম পরিবেশবান্ধব গ্রীন পোর্ট।

বিডা চেয়ারম্যান মন্তব্য করেন, এই প্রক্রিয়ায় যারা দুর্নীতি করতেন বা বন্দর থেকে চাঁদা তুলতেন, তাদের মন খারাপ হয়েছে। অন্যদিকে একদল ‘বিশেষ অজ্ঞ’ এই চুক্তির বিষয়ে ভুল তথ্য প্রচার করে ‘ভিউ ব্যবসা বাড়াচ্ছেন’।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরানে সহিংসতায় প্রাণহানি: দেশজুড়ে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা

চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন: লালদিয়া টার্মিনাল পরিচালনায় এপিএম টার্মিনালস, মালিকানা থাকছে বাংলাদেশের হাতে

আপডেট সময় : ১১:৫৭:০৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৭ নভেম্বর ২০২৫

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম বন্দরকে আধুনিকায়ন, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে নিতে ডেনমার্কভিত্তিক এপিএম টার্মিনালসকে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের কনটেইনার পোর্ট পারফর্মেন্স ইনডেক্স অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দরের নিম্ন অবস্থান (৪০৫টির মধ্যে ৩৩৪তম) এবং দুর্নীতি ও দীর্ঘ অপেক্ষার সময় দূর করে বিশ্বমানের অপারেশন নিশ্চিত করতেই সরকার এই মডেল গ্রহণ করেছে। ভিয়েতনামের কাই মেপ বন্দরের গ্লোবাল অপারেটর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়ে সপ্তম স্থানে উঠে আসার দৃষ্টান্তকে সামনে রেখে বাংলাদেশ এই পথে হাঁটছে।

টার্মিনাল নির্মাণ ও চুক্তির শর্তাবলী

  • মালিকানা ও বিনিয়োগ: আশিক চৌধুরী নিশ্চিত করেছেন যে পোর্টের মালিকানা কোনোভাবেই বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে যাচ্ছে না। বন্দরের মালিকানা বাংলাদেশের কাছেই থাকছে। এপিএম টার্মিনালস লালদিয়া চরে সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে প্রায় ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে বিশ্বমানের একটি টার্মিনাল নির্মাণ করবে এবং সাইনিং মানি হিসাবে ২৫০ কোটি টাকা দেবে।
  • পরিচালনার মেয়াদ: নির্মাণ শেষে এপিএম একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকবে। এই চুক্তির মেয়াদকাল হচ্ছে ৩০ বছর। মেয়াদ শেষে পুরো অবকাঠামো সরকারের অধীনেই ফিরে আসবে। বিডা চেয়ারম্যান এটিকে ‘গাড়ি আমাদের, তারা শুধু চালক’ বলে উল্লেখ করেন।
  • আয়ের কাঠামো: চুক্তির মেয়াদকালে হ্যান্ডেল করা প্রতিটি কনটেইনারের জন্য এপিএম টার্মিনালস বাংলাদেশকে একটি নির্দিষ্ট ফি দিবে। এমনকি, কোনো কনটেইনার হ্যান্ডেল করতে না পারলেও ন্যূনতম একটি ভলিউম ধরে পেমেন্ট করার শর্ত রয়েছে।
  • প্রকল্পের ধরণ: এটি একটি পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) প্রকল্প। রেগুলেটর হিসেবে কাজ করবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
  • চুক্তির প্রকাশ: আইনগত সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ দর কষাকষিতে দেশের স্বার্থ রক্ষার্থে ভারত ও চীনসহ অন্যান্য দেশের মতো এই চুক্তির পূর্ণাঙ্গ দলিল জনসম্মুখে প্রকাশ করা হচ্ছে না।

জাতীয় নিরাপত্তা ও লাভ

  • নিরাপত্তা: জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো ঝুঁকি তৈরি হবে না। নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসসহ সকল সংস্থার নিরাপত্তা প্রটোকল যথারীতি বলবৎ থাকবে। টার্মিনালে ব্যবহৃত প্রযুক্তি ও ডেটা লোকালাইজেশন ব্যবস্থা সরকারের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধান ও চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণাধীন থাকবে।
  • জাতীয় লাভ: এই চুক্তির ফলে দেশের নিম্নলিখিত লাভগুলো হবে:
    • প্রতি বছর অতিরিক্ত ৮ লাখ টিইইউ ধারণক্ষমতা যুক্ত হবে (প্রায় ৪৪% বৃদ্ধি)।
    • পণ্য পরিবহনের খরচ ও সময় কমবে।
    • দ্বিগুণ বড় কনটেইনার জাহাজ বন্দরে ভিড়তে পারবে এবং বিশ্বের দূরবর্তী দেশগুলোর সঙ্গে সরাসরি জাহাজ সংযোগ উন্মুক্ত হবে।
    • নির্মাণ ও পরিচালনা পর্যায়ে ৫০০-৭০০ সরাসরি স্থানীয় কর্মসংস্থান এবং পরিবহন ও লজিস্টিকস-এ হাজারেরও বেশি পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
    • স্থানীয় প্রকৌশলী ও ব্যবস্থাপকরা এপিএম টার্মিনালসের নিজস্ব ট্রেনিং প্রোগ্রামের মাধ্যমে বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ পাবেন।
    • এটি হবে দেশের প্রথম পরিবেশবান্ধব গ্রীন পোর্ট।

বিডা চেয়ারম্যান মন্তব্য করেন, এই প্রক্রিয়ায় যারা দুর্নীতি করতেন বা বন্দর থেকে চাঁদা তুলতেন, তাদের মন খারাপ হয়েছে। অন্যদিকে একদল ‘বিশেষ অজ্ঞ’ এই চুক্তির বিষয়ে ভুল তথ্য প্রচার করে ‘ভিউ ব্যবসা বাড়াচ্ছেন’।