ঢাকা ১১:১৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৮ মার্চ ২০২৬

অবাধে বালু তোলায় হুমকির মুখে সেতু, সড়ক ও বাঁধ

রংপুরের বদরগঞ্জে পুলিশকে ম্যানেজ করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাকর্মীরা মিলেমিশে যমুনেশ্বরী নদী থেকে অবাধে বালু তুলছেন। এতে হুমকির মুখে পড়েছে যমুনেশ্বরীর ওপর নির্মিত সেতু, মহাসড়ক ও বাঁধ। বালুবাহী ট্রাক্টরের বিকট শব্দ এবং ধুলাবালিতে পরিবেশ দূষণ হয়ে পড়েছে। কেউ প্রতিবাদ করলে মামলা-হামলার হুমকি দেন বালুখেকোরা।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, বদরগঞ্জের কুতুবপুর ইউনিয়নের দালালপাড়ার আওয়ামী লীগ নেতার ছেলে নাহিদ লিখনের বালুর বিশাল পয়েন্ট। তার পাশেই কুতুবপুর ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি অহিদুল হকের বালুর পয়েন্ট। নদীর মাঝখানে কয়েকটি ড্রামের উপরে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে লম্বা পাইপ দিয়ে তোলা হচ্ছে বালু। প্রতিদিন কাকডাকা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সারিবদ্ধভাবে বালুবাহী গাড়িগুলো নাগেরহাট বন্দরের ব‍্যস্ততম পাকা সড়ক ধরে বেপরোয়া গতিতে ছুটে চলে বালুর পয়েন্টে।

এসব বালুবাহী গাড়ি ও ড্রেজার মেশিনের বিকট শব্দে ঘুমাতে পারেন না নদীপাড়ের কয়েকটি গ্রামের মানুষ। বালুবাহী বেপরোয়া গাড়ি চলাচলে ৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীসহ সাধারণ মানুষ থাকে সব সময় দুর্ঘটনার আতঙ্কে।

নদী থেকে বালুবোঝাই গাড়িগুলো ওঠানামা করার কারণেই এলজিইডির পাকা সড়কগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কয়েকটি সড়কে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। ফলে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে সড়কগুলো।

এছাড়া রংপুর সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের মিঠাপুকুর-ফুলবাড়ি মহাসড়কসহ যমুনেশ্বরী সেতুটি ও সৈয়দপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের ২৫ কোটি টাকা ব‍্যয়ে নির্মাণ করা গ্রাম প্রতিরক্ষা বাঁধটি পড়েছে চরম হুমকির মুখে।

এ বিষয়ে রংপুর সওজ, এলজিইডি এবং পাউবোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নির্বিকার। তারা বালুখেকোদের বিরুদ্ধে ব‍্যবস্থা নেওয়ার কথা বললেও ব‍্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ আছে তাদের বিরুদ্ধে। কোনো ব‍্যবস্থা না নেওয়ায় বালু সিন্ডিকেট একাট্টা হয়ে উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে- কুতুবপুর ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি সবুজ মেম্বারের ভাই-ভাতিজারা বালু লুটের সঙ্গে জড়িত। একই ইউপির বিএনপির সহসভাপতি অহিদুল হকসহ অনেক নেতা বালুর উপর নির্ভরশীল। তাদের সংসার চলে বালু বিক্রির টাকায়। শুধু তাই নয়, লোহানিপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির অনেক নেতাকর্মী এই বালুর উপর নির্ভরশীল।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে টানা দেড় যুগ এলাকার বালু ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করত আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের স্থানীয় নেতারা। পালা-বদলের সঙ্গে সঙ্গেই বিএনপির নেতারা দখলে নিয়ে নেয় যমুনেশ্বরী নদীর বিশাল বালুমহাল।

নাগেরহাট বাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, যমুনেশ্বরী নদীর নাটারাম এলাকা থেকে ৮ কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে ১৮টি অবৈধ বালুর পয়েন্ট। এসব বালুর পয়েন্ট আগে নিয়ন্ত্রণ করতেন আওয়ামী লীগের লোকজন। এখন আওয়ামী লীগ নেতাদের পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণ করছেন বিএনপি নেতা সবুজ সোনার, অহিদুল হক, ইয়াবা কারবারি ইলিয়াস আলী, খাটো সবুজ, অরুন্নেছা এলাকার জাহাঙ্গীর আলমসহ স্থানীয় নেতাকর্মীরা। এদের মধ্যে ওহিদুল ও সবুজ পুলিশকে টাকা দেওয়ার কথা বলে অন্যান্য গাড়ি থেকে টাকা তোলেন। তাদের দোর্দণ্ডপ্রতাপ। ঝামেলার ভয়ে কেউ কথা বলতে চান না তাদের বিরুদ্ধে।

বদরগঞ্জ থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নয়াপাড়া গ্রামের নুরে সোফা আলমের ছেলে ইলিয়াস আলী পুলিশের তালিকায় শীর্ষ মাদক কারবারি। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং পুলিশ বিভিন্ন সময় তার বাড়িতে দফায় দফায় হানা দিয়ে বিপুল ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করেছি। এসব মামলায় বাবা-ছেলে একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়েছেন। মাদক মামলার বোঝা মাথায় নিয়েও নদীর বালু লুটপাটে মরিয়া হয়ে উঠেছে সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্যরা। প্রতিদিন প্রায় দেড় হাজার গাড়ি বালু বিক্রি হয়। বালুবাহী এসব গাড়ি চলাচলের কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়েন পথচারীরা।

এলাকাবাসী জানায়, সবুজ মেম্বারের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে আওয়ামী লীগের নেতারা নদী থেকে চুরি করছেন লাখ লাখ টাকার বালু। উপজেলা প্রশাসন মাঝেমধ্যে এসব অবৈধ বালুর পয়েন্টে লোক দেখানো হানা দিয়ে ড্রেজার মেশিন, বালু তোলার সরঞ্জাম ও বালুবাহী গাড়িগুলো ভাঙচুর করেই তাদের দায়িত্বের ইতি টানেন।

গেল ৯ ফেব্রুয়ারি কুতুবপুর অরুন্নেছা এলাকার ভ্যানচালক মেহেদী হাসানের ছেলে শিশু শিক্ষার্থী মো. সিয়াম (৮) ইউপি সদস্য নিক্সন আলীর বালুর পয়েন্টের গর্তে পড়ে মারা যায়। এতে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে বিক্ষুব্ধ জনতা বালু তোলার ড্রেজার মেশিনে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং দুটি বালুবাহী ট্রাক্টর ভাঙচুর করে।

এদিকে গত বছরের ১১ ডিসেম্বর নদী থেকে বালু তোলা বন্ধের দাবিতে দুই ইউনিয়নের ১০ গ্রামের শত শত নারী-পুরুষ প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে মানববন্ধন করেন। কর্মসূচি শেষে বদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসারসহ বিভিন্ন দপ্তরে স্মারকলিপি দেন আন্দোলনকারীরা।

‘সেতু বাঁচাও, বাঁধ বাচাও, নদী বাঁচাও’ কমিটির সভাপতি কালাম মিয়া ও সদস‍্য সচিব শাহ আমান জানান, ইউপি সদস্য সবুজ, অহিদুল হক ও ফোকলা জামান এলাকার বালু উত্তোলন সিন্ডিকেটের অন‍্যতম সদস্য। বালু লুটপাটের সংবাদ প্রকাশ করায় আমার দেশ-এর বদরগঞ্জ প্রতিনিধি এম এ সালাম বিশ্বাস ও স্থানীয় সাংবাদিক মনজুরুল আলমকে বালুখেকোরা বিভিন্নভাবে হয়রানি ও হুমকি দেন।

কয়েকজন বালু ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, থানায় সাপ্তাহিক মোটা অংকের টাকা দিয়ে আমরা বালু তুলছি। টাকা দেওয়া একদিন পিছিয়ে গেলেই বাঁধে বিপত্তি। পরেরদিন পুলিশ এসে বালুর পয়েন্টগুলোতে তাণ্ডব চালায়। পুলিশকে চাহিদামত টাকা দিলে বালুর গাড়িগুলো চলাচলে কোনো বাধা দেওয়া হয় না। তারা আরো বলেন, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বা প্রশাসনের কেউ বালু মহলে অভিযান চালাতে এলে পুলিশের পক্ষ থেকে আগেই আমাদের জানিয়ে দেওয়া হয়। সে ক্ষেত্রে আমরা দ্রুত বালুর পয়েন্ট থেকে গাড়িগুলো সরিয়ে নেই। পুলিশ যে বালুর পয়েন্টগুলোর সঙ্গে জড়িত, এ বিষয়ে এলাকাবাসী প্রকাশ্যে অভিযোগ করেন।

বদরগঞ্জ থানার ওসি হাসান জাহিদ সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, কেউ অভিযোগ করলেই দ্রুত পুলিশ পাঠিয়ে আমরা বালুর পয়েন্টগুলো বন্ধ করে দেই।

বদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার আঞ্জুমান সুলতানা আমার দেশকে জানান, আমরা তো বালুর পয়েন্টগুলোতে অভিযান চালিয়ে আসছি।

তাহলে বালু উত্তোলন বন্ধ হচ্ছে না কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গন্তব‍্যে পৌঁছানোর আগেই বালুখেকোদের কাছে খবর চলে যায়। তখন তারা সেখান থেকে সটকে পড়ে।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু মুসা জানান, অতিরিক্ত বালু বহন করে ট্রাক দিয়ে যে সড়ক নষ্ট করা হচ্ছে, সে বিষয় দেখার জন্য প্রশাসনকে জানিয়েছি। তারা অবশ্যই ব্যবস্থা নেবেন।

এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ড. মো. সফররাজ বান্দার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সরেজমিনে তদন্ত করে মতামত ব্যক্ত করবেন বলে জানান।

রংপুর জেলা প্রশাসক এনামুল আহসান জানান, উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবং এসিল্যান্ডকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন থেকে বিরত রাখতে প্রতিনিয়ত অভিযান চালাতে বলা হয়েছে। যারা আইন অমান্য করে বিভিন্ন পয়েন্টে অবৈধভাবে বালু তুলছেন, তাদের জরিমানার পাশাপাশি ট্রাক্টর ও ডাম্প ট্রাক জব্দ করা হচ্ছে। খবর পেলেই বালুর পয়েন্টে অভিযান চালানো হয়।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

অবাধে বালু তোলায় হুমকির মুখে সেতু, সড়ক ও বাঁধ

আপডেট সময় : ০৯:৪১:৩৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৮ মার্চ ২০২৬

রংপুরের বদরগঞ্জে পুলিশকে ম্যানেজ করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাকর্মীরা মিলেমিশে যমুনেশ্বরী নদী থেকে অবাধে বালু তুলছেন। এতে হুমকির মুখে পড়েছে যমুনেশ্বরীর ওপর নির্মিত সেতু, মহাসড়ক ও বাঁধ। বালুবাহী ট্রাক্টরের বিকট শব্দ এবং ধুলাবালিতে পরিবেশ দূষণ হয়ে পড়েছে। কেউ প্রতিবাদ করলে মামলা-হামলার হুমকি দেন বালুখেকোরা।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, বদরগঞ্জের কুতুবপুর ইউনিয়নের দালালপাড়ার আওয়ামী লীগ নেতার ছেলে নাহিদ লিখনের বালুর বিশাল পয়েন্ট। তার পাশেই কুতুবপুর ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি অহিদুল হকের বালুর পয়েন্ট। নদীর মাঝখানে কয়েকটি ড্রামের উপরে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে লম্বা পাইপ দিয়ে তোলা হচ্ছে বালু। প্রতিদিন কাকডাকা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সারিবদ্ধভাবে বালুবাহী গাড়িগুলো নাগেরহাট বন্দরের ব‍্যস্ততম পাকা সড়ক ধরে বেপরোয়া গতিতে ছুটে চলে বালুর পয়েন্টে।

এসব বালুবাহী গাড়ি ও ড্রেজার মেশিনের বিকট শব্দে ঘুমাতে পারেন না নদীপাড়ের কয়েকটি গ্রামের মানুষ। বালুবাহী বেপরোয়া গাড়ি চলাচলে ৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীসহ সাধারণ মানুষ থাকে সব সময় দুর্ঘটনার আতঙ্কে।

নদী থেকে বালুবোঝাই গাড়িগুলো ওঠানামা করার কারণেই এলজিইডির পাকা সড়কগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কয়েকটি সড়কে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। ফলে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে সড়কগুলো।

এছাড়া রংপুর সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের মিঠাপুকুর-ফুলবাড়ি মহাসড়কসহ যমুনেশ্বরী সেতুটি ও সৈয়দপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের ২৫ কোটি টাকা ব‍্যয়ে নির্মাণ করা গ্রাম প্রতিরক্ষা বাঁধটি পড়েছে চরম হুমকির মুখে।

এ বিষয়ে রংপুর সওজ, এলজিইডি এবং পাউবোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নির্বিকার। তারা বালুখেকোদের বিরুদ্ধে ব‍্যবস্থা নেওয়ার কথা বললেও ব‍্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ আছে তাদের বিরুদ্ধে। কোনো ব‍্যবস্থা না নেওয়ায় বালু সিন্ডিকেট একাট্টা হয়ে উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে- কুতুবপুর ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি সবুজ মেম্বারের ভাই-ভাতিজারা বালু লুটের সঙ্গে জড়িত। একই ইউপির বিএনপির সহসভাপতি অহিদুল হকসহ অনেক নেতা বালুর উপর নির্ভরশীল। তাদের সংসার চলে বালু বিক্রির টাকায়। শুধু তাই নয়, লোহানিপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির অনেক নেতাকর্মী এই বালুর উপর নির্ভরশীল।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে টানা দেড় যুগ এলাকার বালু ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করত আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের স্থানীয় নেতারা। পালা-বদলের সঙ্গে সঙ্গেই বিএনপির নেতারা দখলে নিয়ে নেয় যমুনেশ্বরী নদীর বিশাল বালুমহাল।

নাগেরহাট বাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, যমুনেশ্বরী নদীর নাটারাম এলাকা থেকে ৮ কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে ১৮টি অবৈধ বালুর পয়েন্ট। এসব বালুর পয়েন্ট আগে নিয়ন্ত্রণ করতেন আওয়ামী লীগের লোকজন। এখন আওয়ামী লীগ নেতাদের পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণ করছেন বিএনপি নেতা সবুজ সোনার, অহিদুল হক, ইয়াবা কারবারি ইলিয়াস আলী, খাটো সবুজ, অরুন্নেছা এলাকার জাহাঙ্গীর আলমসহ স্থানীয় নেতাকর্মীরা। এদের মধ্যে ওহিদুল ও সবুজ পুলিশকে টাকা দেওয়ার কথা বলে অন্যান্য গাড়ি থেকে টাকা তোলেন। তাদের দোর্দণ্ডপ্রতাপ। ঝামেলার ভয়ে কেউ কথা বলতে চান না তাদের বিরুদ্ধে।

বদরগঞ্জ থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নয়াপাড়া গ্রামের নুরে সোফা আলমের ছেলে ইলিয়াস আলী পুলিশের তালিকায় শীর্ষ মাদক কারবারি। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং পুলিশ বিভিন্ন সময় তার বাড়িতে দফায় দফায় হানা দিয়ে বিপুল ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করেছি। এসব মামলায় বাবা-ছেলে একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়েছেন। মাদক মামলার বোঝা মাথায় নিয়েও নদীর বালু লুটপাটে মরিয়া হয়ে উঠেছে সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্যরা। প্রতিদিন প্রায় দেড় হাজার গাড়ি বালু বিক্রি হয়। বালুবাহী এসব গাড়ি চলাচলের কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়েন পথচারীরা।

এলাকাবাসী জানায়, সবুজ মেম্বারের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে আওয়ামী লীগের নেতারা নদী থেকে চুরি করছেন লাখ লাখ টাকার বালু। উপজেলা প্রশাসন মাঝেমধ্যে এসব অবৈধ বালুর পয়েন্টে লোক দেখানো হানা দিয়ে ড্রেজার মেশিন, বালু তোলার সরঞ্জাম ও বালুবাহী গাড়িগুলো ভাঙচুর করেই তাদের দায়িত্বের ইতি টানেন।

গেল ৯ ফেব্রুয়ারি কুতুবপুর অরুন্নেছা এলাকার ভ্যানচালক মেহেদী হাসানের ছেলে শিশু শিক্ষার্থী মো. সিয়াম (৮) ইউপি সদস্য নিক্সন আলীর বালুর পয়েন্টের গর্তে পড়ে মারা যায়। এতে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে বিক্ষুব্ধ জনতা বালু তোলার ড্রেজার মেশিনে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং দুটি বালুবাহী ট্রাক্টর ভাঙচুর করে।

এদিকে গত বছরের ১১ ডিসেম্বর নদী থেকে বালু তোলা বন্ধের দাবিতে দুই ইউনিয়নের ১০ গ্রামের শত শত নারী-পুরুষ প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে মানববন্ধন করেন। কর্মসূচি শেষে বদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসারসহ বিভিন্ন দপ্তরে স্মারকলিপি দেন আন্দোলনকারীরা।

‘সেতু বাঁচাও, বাঁধ বাচাও, নদী বাঁচাও’ কমিটির সভাপতি কালাম মিয়া ও সদস‍্য সচিব শাহ আমান জানান, ইউপি সদস্য সবুজ, অহিদুল হক ও ফোকলা জামান এলাকার বালু উত্তোলন সিন্ডিকেটের অন‍্যতম সদস্য। বালু লুটপাটের সংবাদ প্রকাশ করায় আমার দেশ-এর বদরগঞ্জ প্রতিনিধি এম এ সালাম বিশ্বাস ও স্থানীয় সাংবাদিক মনজুরুল আলমকে বালুখেকোরা বিভিন্নভাবে হয়রানি ও হুমকি দেন।

কয়েকজন বালু ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, থানায় সাপ্তাহিক মোটা অংকের টাকা দিয়ে আমরা বালু তুলছি। টাকা দেওয়া একদিন পিছিয়ে গেলেই বাঁধে বিপত্তি। পরেরদিন পুলিশ এসে বালুর পয়েন্টগুলোতে তাণ্ডব চালায়। পুলিশকে চাহিদামত টাকা দিলে বালুর গাড়িগুলো চলাচলে কোনো বাধা দেওয়া হয় না। তারা আরো বলেন, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বা প্রশাসনের কেউ বালু মহলে অভিযান চালাতে এলে পুলিশের পক্ষ থেকে আগেই আমাদের জানিয়ে দেওয়া হয়। সে ক্ষেত্রে আমরা দ্রুত বালুর পয়েন্ট থেকে গাড়িগুলো সরিয়ে নেই। পুলিশ যে বালুর পয়েন্টগুলোর সঙ্গে জড়িত, এ বিষয়ে এলাকাবাসী প্রকাশ্যে অভিযোগ করেন।

বদরগঞ্জ থানার ওসি হাসান জাহিদ সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, কেউ অভিযোগ করলেই দ্রুত পুলিশ পাঠিয়ে আমরা বালুর পয়েন্টগুলো বন্ধ করে দেই।

বদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার আঞ্জুমান সুলতানা আমার দেশকে জানান, আমরা তো বালুর পয়েন্টগুলোতে অভিযান চালিয়ে আসছি।

তাহলে বালু উত্তোলন বন্ধ হচ্ছে না কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গন্তব‍্যে পৌঁছানোর আগেই বালুখেকোদের কাছে খবর চলে যায়। তখন তারা সেখান থেকে সটকে পড়ে।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু মুসা জানান, অতিরিক্ত বালু বহন করে ট্রাক দিয়ে যে সড়ক নষ্ট করা হচ্ছে, সে বিষয় দেখার জন্য প্রশাসনকে জানিয়েছি। তারা অবশ্যই ব্যবস্থা নেবেন।

এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ড. মো. সফররাজ বান্দার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সরেজমিনে তদন্ত করে মতামত ব্যক্ত করবেন বলে জানান।

রংপুর জেলা প্রশাসক এনামুল আহসান জানান, উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবং এসিল্যান্ডকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন থেকে বিরত রাখতে প্রতিনিয়ত অভিযান চালাতে বলা হয়েছে। যারা আইন অমান্য করে বিভিন্ন পয়েন্টে অবৈধভাবে বালু তুলছেন, তাদের জরিমানার পাশাপাশি ট্রাক্টর ও ডাম্প ট্রাক জব্দ করা হচ্ছে। খবর পেলেই বালুর পয়েন্টে অভিযান চালানো হয়।