## উত্তরাঞ্চলে ট্রেন যোগাযোগ: অবহেলা ও ভোগান্তির চক্রে যাত্রী
উত্তরাঞ্চলের ট্রেন যোগাযোগ ব্যবস্থা বর্তমানে চরম অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার শিকার। শিডিউল বিপর্যয়, জরাজীর্ণ বগি, বন্ধ থাকা রেলস্টেশন এবং অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ—সব মিলিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে, সড়কপথে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় যেসকল এলাকার মানুষের ট্রেনই একমাত্র ভরসা, তাদের দুর্ভোগ যেন চরমে পৌঁছেছে।
গাইবান্ধার মহিমাগঞ্জ থেকে বগুড়ার সান্তাহারগামী করতোয়া আন্তঃনগর এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রী মোস্তাফিজুর রহমান সুজন জানান, ট্রেনের বগিগুলোর ভেতরের চিত্র অত্যন্ত হতাশাজনক। আসন থেকে শুরু করে প্রতিটি কোণায় ধুলোবালি ও আবর্জনার স্তূপ। নোংরা পরিবেশে বসা তো দূরের কথা, কাপড়ের উপর ময়লা লেগে যাওয়ার সম্ভাবনাও প্রবল। তার মতে, বগিগুলো দেখে মনে হয় যেন পশুপাখির আশ্রয়স্থল। একই অভিযোগ সাঘাটার বোনারপাড়া রেলস্টেশন থেকে ওঠা যাত্রী রফিকুল ইসলামেরও। তিনি জানান, রাত ৮টা ২০ মিনিটে ছাড়ার কথা থাকলেও ট্রেনটি প্রায়শই ১০টার পরে আসে, যা যাত্রীদের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সান্তাহার-পঞ্চগড় রুটে চলাচলকারী দোলনচাঁপা এক্সপ্রেস ট্রেনের অবস্থাও একই রকম। বগুড়া, গাইবান্ধা, রংপুর, দিনাজপুর—এসব এলাকার শত শত যাত্রী ব্যবসা-বাণিজ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনে এই ট্রেনে যাতায়াত করেন। কিন্তু ট্রেনটি প্রায় প্রতিদিনই নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা দেরিতে চলাচল করে। আন্তঃনগর ট্রেন হওয়া সত্ত্বেও এর পরিবেশ লোকাল ট্রেনের মতো। ভাঙা দরজা-জানালা মেরামত করা হয় না, টয়লেটগুলোতে প্রায়শই পানি থাকে না এবং দুর্গন্ধের কারণে যাত্রীরা অস্বস্তিতে ভোগেন। মাঝেমধ্যে ইঞ্জিন বিকল হয়ে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। নিয়মিত এই রুটে যাতায়াতকারী বোনারপাড়ার যাত্রী রানা সরকার ও বুলু মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আন্তঃনগর ট্রেনের টিকিট কেটেও লোকাল ট্রেনের চেয়ে খারাপ সুবিধা পাচ্ছি। এর ওপর শতাধিক হকারের উপদ্রব যাত্রীদের ভোগান্তি আরও বাড়িয়ে দেয়।”
সান্তাহার-বোনারপাড়া-লালমনিরহাট রুটে প্রায় ১৫টি রেলস্টেশন দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। এর ফলে স্টেশনগুলোতে ট্রেনের লেভেলক্রসিং ব্যবস্থা নেই। ঢাকাগামী লালমনি, বুড়িমারী, করতোয়া এবং রংপুর এক্সপ্রেসের মতো বড় ট্রেনগুলো কোনো স্টেশনে থামলে বিপরীত দিক থেকে আসা লোকাল ট্রেনের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। বন্ধ থাকা স্টেশনগুলোর কারণে এই লেভেলক্রসিংয়ের অপেক্ষায় আন্তঃনগর ট্রেনগুলো আটকে থাকে, যা প্রতিদিনের বিলম্বের অন্যতম কারণ এবং যাত্রী ভোগান্তি বাড়িয়ে তোলে।
এই রুটে চলাচলকারী লোকাল ট্রেনগুলোর অবস্থা আরও করুণ। বোনারপাড়া থেকে সান্তাহারগামী ‘কলেজ ট্রেন’ সন্ধ্যায় আলো-আঁধারে চলাচল করে। টয়লেটগুলো ভাঙা এবং ধারণ ক্ষমতার তিনগুণ যাত্রী নিয়ে চললেও বগি বাড়ানোর কোনো উদ্যোগ নেই। টিকিটবিহীন যাত্রীদের অবাধ বিচরণ এবং টিকিট পরিদর্শকের অনুপস্থিতি এক ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। ভেলুরপাড়া রেলস্টেশন থেকে ওঠা কলেজ ট্রেনের যাত্রী রেজাউল করিম জানান, ট্রেনটি দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত। এত যাত্রী কষ্ট করে যাতায়াত করলেও তাদের ভোগান্তি লাঘবে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ট্রেনটিতে পকেটমারদের দৌরাত্ম্য থাকায় যাত্রীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বোনারপাড়া রেলওয়ে জংশন স্টেশনের মাস্টার প্রদীপ চন্দ্র বলেন, এই বিষয়গুলো উপরস্থ কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। লালমনিরহাট বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক তছলিম আহম্মেদ খান জানান, তিনি সম্প্রতি যোগদান করেছেন এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সকল সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করবেন। তবে, যাত্রীদের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘবে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
রিপোর্টারের নাম 























