বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদলের পর নবগঠিত সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভঙ্গুর অর্থনীতি এবং বিপুল পরিমাণ ঋণের বোঝা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের (জুলাই-ডিসেম্বর) আর্থিক চিত্র বলছে, সরকারের রাজস্ব আয়ের তুলনায় ব্যয়ের পরিমাণ অনেক বেশি। রাষ্ট্রীয় কোষাগারের এই নাজুক পরিস্থিতির মধ্যেই নতুন সরকারের ওপর চেপেছে অতীতের ২৩ লাখ কোটি টাকারও বেশি ঋণ এবং বিদ্যুৎ খাতের পুঞ্জীভূত ৪৫ হাজার কোটি টাকার বকেয়া।
আয়-ব্যয়ের পরিসংখ্যান ও বাজেট ঘাটতি: অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথমার্ধে সরকার রাজস্ব সংগ্রহ করেছে প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকা। অথচ একই সময়ে পরিচালন ও উন্নয়ন খাতে ব্যয় হয়েছে ২ লাখ ৫৮ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এই বাড়তি ব্যয় মেটাতে সরকারকে মাত্র ছয় মাসেই ৩৩ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা ঋণ নিতে হয়েছে। বিশেষ করে পরিচালন ব্যয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই চলে যাচ্ছে সুদ পরিশোধ, ভর্তুকি এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতায়।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও অর্থের সংকট: তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তাদের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী ৫ কোটি পরিবারকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং প্রকৃত কৃষকদের ‘কৃষক কার্ড’ দেওয়ার কার্যক্রম শুরু করেছে। প্রাথমিকভাবে ১৩টি উপজেলায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ শুরু হলেও, এটি সারাদেশে বিস্তৃত করতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন। এছাড়া আসন্ন ঈদের আগে ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের সম্মানী দেওয়ার ঘোষণাও সরকারের ব্যয়ের চাপ বাড়াবে।
ঋণের ফাঁদ ও বিশেষজ্ঞের উদ্বেগ: সদ্য দায়িত্ব নেওয়া অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এই ঋণের বোঝা মাথায় নিয়েই তাদের জনবান্ধব বাজেট করতে হবে। তবে বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, বিদ্যুৎ খাতের বকেয়া এবং নতুন রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ফলে সরকারের ব্যয় কমানোর সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। আইএমএফ-এর প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরেই বাংলাদেশকে প্রায় ৩ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ ও সুদ বাবদ পরিশোধ করতে হবে, যা আগামী বছর আরও বাড়বে।
জ্বালানি খাতের ‘অগ্নিপরীক্ষা’: বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান পরিস্থিতিকে নিজের জন্য ‘অগ্নিপরীক্ষা’ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। একদিকে বিপুল বকেয়া পরিশোধ, অন্যদিকে শিল্প ও আবাসিক খাতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি নিশ্চিত করার জন্য নতুন করে আমদানির প্রয়োজন—এই দুইয়ের সমন্বয়ে হিমশিম খাচ্ছে মন্ত্রণালয়।
সমাধানের পথ: অর্থনীতিবিদদের মতে, ঋণনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ হলো সরাসরি কর (Direct Tax) আদায় বৃদ্ধি করা। তবে কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে রাতারাতি রাজস্ব বাড়ানো কঠিন। সরকারের জন্য এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রেখে কীভাবে এই বিশাল আর্থিক ঘাটতি মোকাবিলা করে জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা যায়।
রিপোর্টারের নাম 


















