ঢাকা ০৮:২৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

প্রশাসনে বড় রদবদল: লক্ষ্য ‘মেরিটোক্রেসি’, নাকি দলীয়করণের ছায়া?

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০১:২৩:৪৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নতুন মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহণের পরপরই জনপ্রশাসনে পরিবর্তনের প্রবল হাওয়া বইতে শুরু করেছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আবদুর রশীদ এবং সাবেক প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব এম সিরাজ উদ্দিন মিয়ার স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে যে প্রক্রিয়ার সূচনা হয়েছিল, তা এখন সচিবালয় ছাড়িয়ে সেনাবাহিনী, পুলিশ এমনকি বিচার বিভাগ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। সরকারের নীতিনির্ধারকরা একে ‘মেধাতান্ত্রিক প্রশাসন’ বা ‘মেরিটোক্রেসি’ প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ বললেও, রাজনৈতিক মহলে দলীয়করণের পুরনো শঙ্কা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

শীর্ষ দুই পদের পরিবর্তন ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে অনিশ্চয়তা

তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের সন্ধিক্ষণে প্রশাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি পদের কর্মকর্তারা নিজে থেকেই দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন। এরপর থেকেই বিএনপি তাদের কৌশলগত পরিকল্পনা অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলোতে লোকবল নিয়োগের কাজ শুরু করেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময় হওয়া অনেক চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ এখন বাতিলের পথে। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, নতুন সরকার এই নিয়োগগুলো নিয়ে পুনরায় ভাবার ইঙ্গিত দিয়েছে, যার ফলে অনেক সিনিয়র কর্মকর্তা নিজে থেকেই দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

সেনাবাহিনীর শীর্ষ পদে রদবদল

গত রবিবার ও সোমবার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সেনা সদর থেকে একাধিক আদেশ জারির মাধ্যমে সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে রদবদল করা হয়েছে। সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের বর্তমান পিএসও লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস এম কামরুল হাসানকে রাষ্ট্রদূত হিসেবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়েছে। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে পদোন্নতি পাওয়া মেজর জেনারেল মীর মুশফিকুর রহমান। এছাড়া চিফ অব জেনারেল স্টাফ (সিজিএস) এবং আর্টডকের জিওসি পদেও নতুন কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হয়েছে, যা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় নতুন গতিশীলতা আনবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পুলিশের নেতৃত্বে পরিবর্তনের ইঙ্গিত

পুলিশ প্রশাসনে নতুন মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ও ডিএমপি কমিশনার কে হচ্ছেন, তা নিয়ে এখন তুঙ্গে আলোচনা। বর্তমান আইজিপি বাহারুল আলমের পদত্যাগের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট করেছেন যে, পুলিশ প্রশাসনে শীর্ষ পর্যায়ে কিছু পরিবর্তন ধীরে ধীরে আনা হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্যমতে, সরকার কাউকে বিশেষ সুবিধা দিতে চায় না এবং সব নিয়োগ হবে যোগ্যতার ভিত্তিতে।

ট্রাইব্যুনাল ও সচিবালয়ে নতুন মুখ

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আমিনুল ইসলাম। গত সোমবার দুপুরে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অন্যদিকে, ধর্ম মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিবদের সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত (ওএসডি) করা হয়েছে। এখন সবার নজর রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা বা অ্যাটর্নি জেনারেল পদের দিকে। বর্তমান আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান এর আগে এই পদে ছিলেন, তাই তাঁর শূন্য স্থানে কে আসছেন তা নিয়ে চলছে গুঞ্জন।

প্রত্যাশা বনাম বাস্তবতা

বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে ‘মেরিটোক্রেসি’ বা মেধাভিত্তিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, বর্তমান রদবদল তার কতটুকু প্রতিফলন ঘটবে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খান এ প্রসঙ্গে বলেন, “মেধার দাবিতে হওয়া আন্দোলনের পর অন্তর্বর্তী সরকারে আমরা মেধার যথাযথ প্রতিফলন দেখিনি। নির্বাচিত সরকার সবেমাত্র গঠিত হলো, তাদের ইশতেহারে মেধার কথা বলা হয়েছে। এখন দেখা যাক কাজের ক্ষেত্রে তার প্রতিফলন ঘটে কিনা। নতুন সরকারকে এখনই মূল্যায়ন না করে সময় দেওয়া উচিত।”

প্রশাসনের এই বিশাল রদবদল শেষ পর্যন্ত দক্ষ ও নিরপেক্ষ জনকাঠামো তৈরি করবে নাকি পূর্ববর্তী সরকারের মতো রাজনৈতিক আনুগত্যের দিকে ঝুঁকে পড়বে—তা সময়ই বলে দেবে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

মাঠের রাজা হলেও যে অপূর্ণতা আজও পোড়ায় মেসিকে

প্রশাসনে বড় রদবদল: লক্ষ্য ‘মেরিটোক্রেসি’, নাকি দলীয়করণের ছায়া?

আপডেট সময় : ০১:২৩:৪৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নতুন মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহণের পরপরই জনপ্রশাসনে পরিবর্তনের প্রবল হাওয়া বইতে শুরু করেছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আবদুর রশীদ এবং সাবেক প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব এম সিরাজ উদ্দিন মিয়ার স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে যে প্রক্রিয়ার সূচনা হয়েছিল, তা এখন সচিবালয় ছাড়িয়ে সেনাবাহিনী, পুলিশ এমনকি বিচার বিভাগ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। সরকারের নীতিনির্ধারকরা একে ‘মেধাতান্ত্রিক প্রশাসন’ বা ‘মেরিটোক্রেসি’ প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ বললেও, রাজনৈতিক মহলে দলীয়করণের পুরনো শঙ্কা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

শীর্ষ দুই পদের পরিবর্তন ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে অনিশ্চয়তা

তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের সন্ধিক্ষণে প্রশাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি পদের কর্মকর্তারা নিজে থেকেই দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন। এরপর থেকেই বিএনপি তাদের কৌশলগত পরিকল্পনা অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলোতে লোকবল নিয়োগের কাজ শুরু করেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময় হওয়া অনেক চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ এখন বাতিলের পথে। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, নতুন সরকার এই নিয়োগগুলো নিয়ে পুনরায় ভাবার ইঙ্গিত দিয়েছে, যার ফলে অনেক সিনিয়র কর্মকর্তা নিজে থেকেই দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

সেনাবাহিনীর শীর্ষ পদে রদবদল

গত রবিবার ও সোমবার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সেনা সদর থেকে একাধিক আদেশ জারির মাধ্যমে সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে রদবদল করা হয়েছে। সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের বর্তমান পিএসও লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস এম কামরুল হাসানকে রাষ্ট্রদূত হিসেবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়েছে। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে পদোন্নতি পাওয়া মেজর জেনারেল মীর মুশফিকুর রহমান। এছাড়া চিফ অব জেনারেল স্টাফ (সিজিএস) এবং আর্টডকের জিওসি পদেও নতুন কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হয়েছে, যা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় নতুন গতিশীলতা আনবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পুলিশের নেতৃত্বে পরিবর্তনের ইঙ্গিত

পুলিশ প্রশাসনে নতুন মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ও ডিএমপি কমিশনার কে হচ্ছেন, তা নিয়ে এখন তুঙ্গে আলোচনা। বর্তমান আইজিপি বাহারুল আলমের পদত্যাগের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট করেছেন যে, পুলিশ প্রশাসনে শীর্ষ পর্যায়ে কিছু পরিবর্তন ধীরে ধীরে আনা হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্যমতে, সরকার কাউকে বিশেষ সুবিধা দিতে চায় না এবং সব নিয়োগ হবে যোগ্যতার ভিত্তিতে।

ট্রাইব্যুনাল ও সচিবালয়ে নতুন মুখ

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আমিনুল ইসলাম। গত সোমবার দুপুরে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অন্যদিকে, ধর্ম মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিবদের সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত (ওএসডি) করা হয়েছে। এখন সবার নজর রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা বা অ্যাটর্নি জেনারেল পদের দিকে। বর্তমান আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান এর আগে এই পদে ছিলেন, তাই তাঁর শূন্য স্থানে কে আসছেন তা নিয়ে চলছে গুঞ্জন।

প্রত্যাশা বনাম বাস্তবতা

বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে ‘মেরিটোক্রেসি’ বা মেধাভিত্তিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, বর্তমান রদবদল তার কতটুকু প্রতিফলন ঘটবে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খান এ প্রসঙ্গে বলেন, “মেধার দাবিতে হওয়া আন্দোলনের পর অন্তর্বর্তী সরকারে আমরা মেধার যথাযথ প্রতিফলন দেখিনি। নির্বাচিত সরকার সবেমাত্র গঠিত হলো, তাদের ইশতেহারে মেধার কথা বলা হয়েছে। এখন দেখা যাক কাজের ক্ষেত্রে তার প্রতিফলন ঘটে কিনা। নতুন সরকারকে এখনই মূল্যায়ন না করে সময় দেওয়া উচিত।”

প্রশাসনের এই বিশাল রদবদল শেষ পর্যন্ত দক্ষ ও নিরপেক্ষ জনকাঠামো তৈরি করবে নাকি পূর্ববর্তী সরকারের মতো রাজনৈতিক আনুগত্যের দিকে ঝুঁকে পড়বে—তা সময়ই বলে দেবে।