শিরোনাম: সংস্কারের শপথ বর্জন: জামায়াতে ইসলামীর অনড় অবস্থান ও সরকারের প্রতি আহ্বান
ভূমিকা:
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হলেও, সরকারি দলের সংস্কারের শপথ বর্জনের প্রতিবাদে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের জোটের সংসদ সদস্যরা অংশগ্রহণ করেননি। জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এই সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, সরকারি দল জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং জুলাইয়ের গণভোটের রায়কে উপেক্ষা ও অবজ্ঞা করেছে। তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান যেন তারা জুলাইয়ের গণভোটের রায়কে সম্মান জানায় এবং সংস্কারের শপথ গ্রহণ করে।
বিস্তারিত বর্ণনা:
জামায়াতে ইসলামী ও ১১ দলীয় ঐক্যের সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “সরকারি দল কেন একটি শপথ নিয়েছেন, তার ব্যাখ্যা তারা দিয়েছেন। আমাদের ব্যাখ্যা হলো-ছাব্বিশে কোনো নির্বাচন হওয়ার কথাই ছিল না। এই ২৬ সালে নির্বাচনটা হয়েছে, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের কারণে। যাদের কারণে এই নির্বাচন ও এই সংসদ, আমি তাদেরকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। আর গোটা দেশবাসী সেদিন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল-আমরা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা আজকে হয়তো শপথ নিতে ভিন্ন চিন্তা করতে পারতাম। কারণ জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা ও গণভোটের রায়ের প্রতি সম্মান দেখানো রাজনৈতিক দল হিসেবে আমাদের পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করেছি। আমরা জুলাই আকাঙ্ক্ষা, গণভোট এবং যারা আমাদেরকে ভোট দিয়েছেন, তাদেরকে সম্মান করেছি এবং আমরা একমত হয়েছি যে, এই শপথ নেওয়া আমাদের কর্তব্য।”
জামায়াত আমির উল্লেখ করেন যে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। জাতি আশা করেছিল, উৎসবমুখর পরিবেশে স্বাচ্ছন্দে তাদের ভোটের আমানত প্রয়োগ করবে। কিন্তু এই আশা পুরোপুরি পূরণ হয়নি।
তিনি জানান, শপথ গ্রহণের দিন নির্ধারিত হওয়ার পরও সোমবার গভীর রাতে চিঠি পাওয়ায় তারা কিছুটা অস্বস্তিবোধ করেন। তবুও, নাগরিক দায়িত্ব হিসেবে দেশবাসীর প্রতি সম্মান রেখে তারা শপথ নিতে এসেছিলেন। তিনি বলেন, “আমরা লক্ষ্য করেছি, একই দিনে একইসঙ্গে শপথ অনুষ্ঠিত হতো। এবারই বোধহয় তার ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা গেছে। সরকারি দল আগে শপথ নিয়েছেন। আমাদেরকে সংসদ সচিবালয় থেকে দেওয়া দাওয়াতনামায় দুইটি শপথের কথা উল্লেখ ছিল। বলা হয়েছিল-প্রথমে সংসদ সদস্য হিসেবে আমরা শপথ নেবো, আরেকটা শপথ হবে জুলাই সনদের গণভোটের ভিত্তিতে সংস্কারের শপথ। আমরা সংসদ হলে প্রবেশ করলে কর্মকর্তারা জিজ্ঞেস করলেন যে, সকালে সরকারি দল শুধু সংসদ সদস্যের শপথ নিয়েছেন, আপনারা কি করবেন? আমরা বললাম-আমরা দুটিরই শপথ নিতে এখানে এসেছি।”
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সংস্কারের শপথ না নেওয়ার বিষয়ে সরকারি দল তাদের ব্যাখ্যায় বলেছেন, সংসদ বসলে প্রভিশন ক্রিয়েট করে তারা এটা দেখবেন। জামায়াত এই বিষয়টি দ্রুত দেখতে চায়। তিনি বলেন, “যদি তারা জুলাইকে সম্মান ও সংস্কারকে ধারণ করেন, আজকের শপথ নেওয়া প্রধানমন্ত্রীও নির্বাচনি ক্যাম্পেইনে গিয়ে বলেছেন-গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলুন। যদি এর প্রতি তারা শ্রদ্ধাশীল হন, আমরা মনে করি তারা ওই শপথটাও নেবেন। তাদের পছন্দমতো গ্রহণযোগ্য অথরিটির কাছে শপথ নিতে পারেন, আমাদের কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু আমরা দেখতে চাই, জুলাই সম্মানিত হয়েছে এবং জুলাই স্বীকৃত হয়েছে। জুলাইকে অসম্মান-অশ্রদ্ধা এবং স্বীকৃতি না দিয়ে ছাব্বিশের এই পার্লামেন্ট নিশ্চয়ই কোনো গৌরবের আসনে বসতে পারবে না।”
তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, সরকারি দলও দুটি শপথ নেবেন এবং তারাও নেবেন। কিন্তু তারা এসে “ধাক্কা খেয়েছেন”। তিনি বলেন, “আমরা আমাদের জুলাই শহীদ ও যোদ্ধাদের প্রতি অশ্রদ্ধা করতে পারি না। যে কারণে আমাদের শত ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও এই শপথ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে না পারায় আমাদের আফসোসের জায়গা থেকে গেলো। আমাদের মত তারাও দুইটা শপথ নিলে আমরা স্বাচ্ছন্দ্যে যেতে পারতাম। তাহলে আমাদের জন্য কোনো আপত্তির জায়গা থাকতো না।”
শপথ নেওয়া সংসদ সদস্যদের বিষয়ে জামায়াত আমির বলেন, তারা নির্বাচনি প্রক্রিয়ার সময় দলের পক্ষ থেকে বলেছিলেন, তাদের কেউ যদি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং তারা সরকার গঠন করেন, কেউ মন্ত্রী হন তাহলে তারা সরকারি প্লট সুবিধা নেবেন না এবং ট্যাক্সবিহীন গাড়িতে চড়বেন না। তাদের এই সিদ্ধান্তে তারা অবিচল ও অটল।
তিনি বলেন, “আমরা সরকারি দল হতে পারিনি এ নিয়ে কোনো আফসোস নাই। আমাদের আফসোসের জায়গা-পরপর তিনটি নির্বাচন ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর জাতি খুব আশা করেছিল, যেভাবে উৎসবমুখর পরিবেশে তারা ভোট দিয়েছিলেন, সেই ভোটের প্রতিফলনটা হবে ফলাফলে। কিন্তু সেখানে অনেক কিছু ঘটেছে, তা অন্য একদিন বলবো। যার কারণে জাতির এই উৎসব ফলপ্রকাশের সাথে সাথে মিলিয়ে গেছে।”
তারপরও, জামায়াত দেশের জনগণের প্রতি তাদের ভালোবাসা ব্যক্ত করে এবং সরকারের যেকোনো ভালো উদ্যোগে সমর্থন জানানোর প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে, দেশ ও জনগণের স্বার্থের বিপক্ষে কিছু দেখলে তারা জনগণের হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন বলে জানান। তারা গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য শত কষ্ট থাকা সত্ত্বেও সংসদে অংশগ্রহণ করছেন।
এ সময় এনসিপি আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের খলিলুর রহমানের মন্ত্রিসভায় যোগ দেওয়া অনৈতিক। তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে ছাত্র উপদেষ্টারা পদত্যাগ করেছিল নির্বাচনের নিরপেক্ষতার স্বার্থে। এখন ড. খলিলুর রহমান যদি বিএনপি সরকারের অংশ হন, তাহলে প্রশ্ন উঠবে আগের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ওই রাজনৈতিক দলের পক্ষ হয়ে কাজ করেছে। তিনি আরও বলেন, “আমাদের অনেকগুলো আসনে হারিয়ে দেওয়া হলো এবং পরিকল্পনা করে দুই-তৃতীয়াংশ আসন সরকারি দল নিয়ে নিলো।”
তিনি মনে করেন, সংস্কার যাতে না হয় তার জন্য একটি “ইঞ্জিনিয়ারিং” চলছে এবং খলিলুর রহমানের মন্ত্রিসভায় যোগ দেওয়ার মাধ্যমে তা উন্মোচিত হচ্ছে।
এ সময় জামায়াতের নায়েবে আমির ও বিরোধী দলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের সহ অন্যান্য সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
রিপোর্টারের নাম 

























