ঢাকা ০৩:১২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

‘গণতন্ত্র ও সংস্কারের যে ধারা শুরু হয়েছে, তা যেন কখনো থেমে না যায়’: জাতির উদ্দেশে ড. ইউনূস

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:০৯:২২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১২ বার পড়া হয়েছে

দীর্ঘ ১৮ মাসের দায়িত্ব পালন শেষে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রাক্কালে জাতির উদ্দেশে বিদায়ী ভাষণ দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। সোমবার রাতে দেওয়া এই ভাষণে তিনি দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে সমুন্নত রাখা এবং সংস্কারের ধারা অব্যাহত রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রতিষ্ঠান গড়ার মাধ্যমে যে নতুন পথচলা শুরু হয়েছে, তা যেন কোনোভাবেই থমকে না যায়।

প্রধান উপদেষ্টা তার ভাষণে বিগত শাসনের ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেন, “আমরা কোনো শূন্যস্থান থেকে কাজ শুরু করিনি, বরং আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল ‘মাইনাস’ থেকে। চারদিকের ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার করে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে পুনরায় দাঁড় করিয়ে আমরা সংস্কারের পথে এগিয়েছি।” তিনি আরও যোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নিলেও দেশে যে জবাবদিহিতা, বাকস্বাধীনতা এবং অধিকার চর্চার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, সেটিই হবে আগামী দিনের বাংলাদেশের মূল ভিত্তি।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে ড. ইউনূস বলেন, যারা দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন বা পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, তাদের আত্মত্যাগ যেন জাতি কখনো ভুলে না যায়। প্রতিটি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় তাদের স্মৃতিকে সামনে রাখার আহ্বান জানান তিনি। একইসঙ্গে, ক্ষমতার অপব্যবহারের ইতিহাসকে সংরক্ষণ করতে পলাতক প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ‘গণভবন’কে ‘জাতীয় জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’ হিসেবে ঘোষণা করার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।

রাষ্ট্রীয় সংস্কার প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা জানান, তরুণদের স্বপ্নের নতুন বাংলাদেশ গড়তে গত ১৮ মাসে প্রায় ১৩০টি নতুন আইন ও সংশোধনী আনা হয়েছে। জারি করা হয়েছে প্রায় ৬০০টি নির্বাহী আদেশ, যার ৮৪ শতাংশই ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, পুলিশ এখন আর মারণাস্ত্র ব্যবহার করে না বা কাউকে বেআইনিভাবে তুলে নিয়ে যায় না। পুলিশ বাহিনীকে একটি জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক সংস্থা হিসেবে গড়ে তুলতে ‘পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫’ প্রণয়ন করা হয়েছে।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পৃথক সচিবালয় গঠন এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বিচারক নিয়োগের কাঠামোগত পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেন প্রধান উপদেষ্টা। বিপর্যস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, “দায়িত্ব নেওয়ার সময় ব্যাংকিং খাত ছিল ভঙ্গুর এবং অর্থপাচার ছিল লাগামহীন। বর্তমানে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের মাধ্যমে আরও শক্তিশালী হচ্ছে।”

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন আর কোনো দেশের ওপর নির্ভরশীল বা নতজানু নয় বলে দাবি করেন ড. ইউনূস। তিনি বলেন, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে বাংলাদেশ এখন বিশ্বমঞ্চে একটি আত্মবিশ্বাসী ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্র। এছাড়া মৃতপ্রায় রোহিঙ্গা ইস্যুটিকে পুনরায় আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসাকেও সরকারের অন্যতম সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

অধ্যাপক ইউনূস তার ভাষণে ‘জুলাই সনদ’কে এই সরকারের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, গণভোটের মাধ্যমে জনগণ এই সনদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে, যা ভবিষ্যতে দেশে ফ্যাসিবাদ ফেরার পথ চিরতরে বন্ধ করে দেবে। পরিশেষে, একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়তে দল-মত নির্বিশেষে দেশের সকল নাগরিককে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে নিজের বক্তব্য শেষ করেন প্রধান উপদেষ্টা।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

সিকিমে উৎপত্তি: ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মৃদু ভূমিকম্প

‘গণতন্ত্র ও সংস্কারের যে ধারা শুরু হয়েছে, তা যেন কখনো থেমে না যায়’: জাতির উদ্দেশে ড. ইউনূস

আপডেট সময় : ০৯:০৯:২২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

দীর্ঘ ১৮ মাসের দায়িত্ব পালন শেষে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রাক্কালে জাতির উদ্দেশে বিদায়ী ভাষণ দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। সোমবার রাতে দেওয়া এই ভাষণে তিনি দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে সমুন্নত রাখা এবং সংস্কারের ধারা অব্যাহত রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রতিষ্ঠান গড়ার মাধ্যমে যে নতুন পথচলা শুরু হয়েছে, তা যেন কোনোভাবেই থমকে না যায়।

প্রধান উপদেষ্টা তার ভাষণে বিগত শাসনের ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেন, “আমরা কোনো শূন্যস্থান থেকে কাজ শুরু করিনি, বরং আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল ‘মাইনাস’ থেকে। চারদিকের ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার করে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে পুনরায় দাঁড় করিয়ে আমরা সংস্কারের পথে এগিয়েছি।” তিনি আরও যোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নিলেও দেশে যে জবাবদিহিতা, বাকস্বাধীনতা এবং অধিকার চর্চার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, সেটিই হবে আগামী দিনের বাংলাদেশের মূল ভিত্তি।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে ড. ইউনূস বলেন, যারা দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন বা পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, তাদের আত্মত্যাগ যেন জাতি কখনো ভুলে না যায়। প্রতিটি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় তাদের স্মৃতিকে সামনে রাখার আহ্বান জানান তিনি। একইসঙ্গে, ক্ষমতার অপব্যবহারের ইতিহাসকে সংরক্ষণ করতে পলাতক প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ‘গণভবন’কে ‘জাতীয় জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’ হিসেবে ঘোষণা করার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।

রাষ্ট্রীয় সংস্কার প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা জানান, তরুণদের স্বপ্নের নতুন বাংলাদেশ গড়তে গত ১৮ মাসে প্রায় ১৩০টি নতুন আইন ও সংশোধনী আনা হয়েছে। জারি করা হয়েছে প্রায় ৬০০টি নির্বাহী আদেশ, যার ৮৪ শতাংশই ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, পুলিশ এখন আর মারণাস্ত্র ব্যবহার করে না বা কাউকে বেআইনিভাবে তুলে নিয়ে যায় না। পুলিশ বাহিনীকে একটি জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক সংস্থা হিসেবে গড়ে তুলতে ‘পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫’ প্রণয়ন করা হয়েছে।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পৃথক সচিবালয় গঠন এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বিচারক নিয়োগের কাঠামোগত পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেন প্রধান উপদেষ্টা। বিপর্যস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, “দায়িত্ব নেওয়ার সময় ব্যাংকিং খাত ছিল ভঙ্গুর এবং অর্থপাচার ছিল লাগামহীন। বর্তমানে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের মাধ্যমে আরও শক্তিশালী হচ্ছে।”

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন আর কোনো দেশের ওপর নির্ভরশীল বা নতজানু নয় বলে দাবি করেন ড. ইউনূস। তিনি বলেন, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে বাংলাদেশ এখন বিশ্বমঞ্চে একটি আত্মবিশ্বাসী ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্র। এছাড়া মৃতপ্রায় রোহিঙ্গা ইস্যুটিকে পুনরায় আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসাকেও সরকারের অন্যতম সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

অধ্যাপক ইউনূস তার ভাষণে ‘জুলাই সনদ’কে এই সরকারের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, গণভোটের মাধ্যমে জনগণ এই সনদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে, যা ভবিষ্যতে দেশে ফ্যাসিবাদ ফেরার পথ চিরতরে বন্ধ করে দেবে। পরিশেষে, একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়তে দল-মত নির্বিশেষে দেশের সকল নাগরিককে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে নিজের বক্তব্য শেষ করেন প্রধান উপদেষ্টা।