## ফেনীর নির্বাচনী লড়াই: বিএনপির ‘প্রত্যাবর্তন’ নাকি জামায়াতের ‘বাজিমাত’?
ফেনী: আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে ফেনীর তিনটি সংসদীয় আসনে নির্বাচনী উত্তাপ ক্রমশ বাড়ছে। আগামী বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সে ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন কমিশন ভোটগ্রহণের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। এই নির্বাচনকে ঘিরে একদিকে যেমন বিএনপি তাদের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারের স্বপ্নে বিভোর, তেমনই জামায়াতে ইসলামী জোটের প্রার্থীরা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার আশা করছেন।
নবীনদের ভিড়ে পরীক্ষিত প্রতিদ্বন্দ্বী:
ফেনীর এই তিনটি আসনে মোট ২৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যাদের মধ্যে অধিকাংশই নতুন মুখ। প্রথমবারের মতো সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা এই নবীন প্রার্থীদের মধ্যে ১৭টি দলের ২৫ জন এবং একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন। তবে, নির্বাচনী লড়াইয়ের মূল আকর্ষণ হয়ে উঠেছেন বিএনপি এবং জামায়াত জোটের প্রার্থীরা।
ঐতিহ্য বনাম নতুন সম্ভাবনা:
ফেনী সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জেলা এবং বিএনপির একটি শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ঐতিহ্যগতভাবে এই আসনে বিএনপির ভোট ব্যাংক বেশ শক্তিশালী। দলটির নেতাকর্মীরা আশা করছেন, অতীতের গৌরবময় ইতিহাস ফিরিয়ে এনে এবারও তারা তিনটি আসনেই জয়লাভ করবেন। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী জোটের প্রার্থীরা এবার চমক দেখাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে অন্য যেকোনো নির্বাচনের চেয়ে এবার বেশি উচ্ছ্বাস ও আশাবাদ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তারা বিশ্বাস করেন, এবারের নির্বাচনে তারা ‘বাজিমাত’ করতে পারবেন।
ফেনী সদর: বহুমুখী লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দু:
ফেনী সদর আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বেশ কয়েকটি ধারায়। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী, সাবেক সংসদ সদস্য জয়নাল আবেদীন (ভিপি জয়নাল) দলীয় ভোট ব্যাংক এবং মুক্তিযুদ্ধে তার বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য স্থানীয়ভাবে পরিচিত। তবে, এই আসনে জামায়াত জোটের সমর্থিত আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু নতুন ভোটার এবং ‘জুলাই স্পিরিট’-এর কারণে মুখ্য প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারেন। যদিও এটি বিএনপির ভোট ব্যাংক হিসেবে পরিচিত, মঞ্জুর উত্থান আসনটিকে একটি বহুমুখী লড়াইয়ের কেন্দ্রে পরিণত করেছে।
অন্যান্য আসনেও হাড্ডাহাড্ডি লড়াই:
ফেনী-১ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী রফিকুল আলম মজনুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী এস এম কামাল উদ্দিন। একইভাবে, ফেনী-৩ আসনে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টুর বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. ফখরুদ্দিন মানিক শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।
ভোটব্যাংকের হিসাব ও তরুণ ভোটারদের প্রভাব:
জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলাল উদ্দিন আলাল আত্মবিশ্বাসের সাথে জানিয়েছেন, “ফেনী খালেদা জিয়ার জন্মভূমি। নির্বাচনে এই আসনে ধানের শীষ বিপুল ভোটে জয়লাভ করবে।” অন্যদিকে, জেলা জামায়াত আমির মুফতি আবদুল হান্নান বলেছেন, “নির্বাচন সুষ্ঠু হলে ফেনীর তিনটি আসনেই জামায়াতে ইসলামী বিজয়ী হবে।”
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, তিনটি আসনে মোট ৪২৮টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে ১২৫টি কেন্দ্রকে সাধারণ, ২৪৮টি কেন্দ্রকে গুরুত্বপূর্ণ এবং ৫৫টি কেন্দ্রকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ফেনীর তিনটি আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ১৩ লাখ ৩০ হাজার ৯২৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ লাখ ৮৭ হাজার ৮৬৭ জন এবং নারী ভোটার ৬ লাখ ৪৩ হাজার ৪৯ জন। বিশেষ উল্লেখযোগ্য হলো, মোট ভোটারের প্রায় ৪৪.৬০ শতাংশ অর্থাৎ ৫ লক্ষ ৯৩ হাজার ৭৫০ জন তরুণ ভোটার (১৮-৩৭ বছর)। স্থানীয় বিশ্লেষকদের মতে, এই তরুণ ভোটাররাই এবারের নির্বাচনে ‘গেম চেঞ্জার’ হতে পারেন। বিগত বছরগুলোতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন না হওয়ায় তাদের প্রভাব সেভাবে পড়েনি। তবে, এবার ‘জুলাই আন্দোলনের স্পিরিট’ এবং কোনো নির্দিষ্ট দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্যের পরিবর্তে ‘ব্যক্তিকে’ ভোট দেওয়ার প্রবণতা এই তরুণ ভোটারদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে।
আওয়ামী লীগের নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞার কারণে তাদের ভোট ব্যাংক নিজেদের পক্ষে টানার জন্য বিভিন্ন প্রার্থীর তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সব মিলিয়ে, আসন্ন নির্বাচন ফেনীর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে, যেখানে পুরনো ঐতিহ্য এবং নতুন সম্ভাবনার মধ্যে এক হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
রিপোর্টারের নাম 























