ঢাকা ০১:১৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬

রাজনৈতিক টানাপোড়েন: টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অনিশ্চয়তার মেঘ, বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাতিল

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:১৮:৪৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৮ বার পড়া হয়েছে

বিশ্বজুড়ে ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ এক মহা উৎসবের নাম। প্রতি দুই বা চার বছর পর পর এই বৈশ্বিক আসরের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন কোটি কোটি ভক্ত-সমর্থক। চারদিকে যখন উৎসবের আমেজ বিরাজ করার কথা, ঠিক তখনই ২০২৬ সালের আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে রাজনীতির কালো ছায়া গ্রাস করেছে ক্রিকেটীয় উন্মাদনাকে। ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশের ত্রিমুখী রাজনৈতিক টানাপোড়েনে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে উপমহাদেশ, যা মাঠের লড়াই শুরুর আগেই প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে—ক্রিকেট কি পারবে নিজেকে এই রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব থেকে মুক্ত রাখতে? নাকি ব্যাট-বলের শব্দ রাজনীতির কোলাহলে হারিয়ে যাবে?

আধুনিক ক্রিকেটের অন্যতম বড় এই আসর, ২০ ওভারের লড়াই মানেই যেখানে থাকে তুমুল উন্মাদনা। ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও আমেরিকার দলগুলো এক ছাদের নিচে আসে এই প্রতিযোগিতায়। এবারের আসর আয়োজনের সব প্রস্তুতিই সম্পন্ন ছিল—ভেন্যু, সূচি, সম্প্রচার পরিকল্পনা। কিন্তু উৎসবের ঠিক আগমুহূর্তে উপমহাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ক্রিকেটের দরজায় এসে আঘাত হেনেছে।

এই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে। দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের অবনতি এতটাই গভীর যে তা ক্রিকেট সীমান্তেও প্রভাব ফেলেছে। এর শুরুটা হয় চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে ভারতের পাকিস্তানে খেলতে অস্বীকৃতি জানানোর মধ্য দিয়ে। এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানও ভারতে খেলতে অস্বীকৃতি জানায়। এরপর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) আইপিএল-এ খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ এবং ভারতীয় বোর্ডের কিছু সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানায়। সার্বিক পরিস্থিতিতে ক্রিকেটারদের জন্য ভারত নিরাপদ নয়—এই দাবি জানিয়ে বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তাদের ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় স্থানান্তরের অনুরোধ করে। তবে আইসিসি, ভারতের আপত্তির মুখে, বাংলাদেশের সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে। ফলস্বরূপ, এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের জায়গায় স্কটল্যান্ডকে খেলার সুযোগ করে দেওয়া হয়।

এই টানাপোড়েনের মধ্যেই পাকিস্তান সরকার জানিয়ে দিয়েছে, তারা নিরপেক্ষ ভেন্যু হলেও ভারতের বিপক্ষে গ্রুপ ম্যাচ খেলবে না। রাজনীতির এই টর্নেডো ক্রিকেটের দিকে ধেয়ে এসে পুরো বিশ্বকাপেই এক অস্বস্তিকর বাতাস বইয়ে দিচ্ছে। পরিস্থিতি এমন যে, এই টানটান উত্তেজনা কাটাতে হলে যেন করাত লাগাতে হয়। তবুও আশার জায়গা আছে। হয়তো বল মাঠে গড়ালে ক্রিকেটপ্রেমীদের নজর ফিরবে ক্রিকেটের সৌন্দর্যের দিকে। শ্রীলঙ্কার আলো-ছায়ায় দুলতে থাকা সুইং, ভারতের উইকেটে নিখুঁত বাউন্স, টুর্নামেন্ট যত গড়াবে স্পিনারদের জন্য তৈরি হওয়া ক্ষয়ে যাওয়া পিচ—এসবই ক্রিকেটপ্রেমীদের আবার মাঠে টেনে আনতে পারে।

এই বিশ্বকাপ হতে পারত ক্রিকেটপ্রেমীদের স্বপ্নের আসর। গ্রুপ পর্বে দিনে তিনটি ম্যাচ—স্ট্রিমিং যুগের দর্শকদের জন্য এক মহা উৎসবের মতো। দুই শতাধিক ক্রিকেটার প্রতি সপ্তাহে মাঠে নামবেন এমন এক ফরম্যাটে, যেখানে প্রতিভার বিস্তার সবচেয়ে বেশি। দুই দেশে আটটি ভেন্যু—যেখানে ক্রিকেট নিঃসন্দেহে সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। কাগজে-কলমে সবই ছিল নিখুঁত। আজকের ক্রিকেট ভক্তরা আর শুধু পোস্টারে দেয়াল সাজান না। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশ্লেষণ লেখেন, ম্যাচের গল্প শেয়ার করেন, ভাইরাল ভিডিও বানান, মিম তৈরি করেন। ক্রিকেট যখন তার সেরা রূপে থাকে, তখন সেটি হয়ে ওঠে মানুষের অভিন্ন ভাষা। এই বিশ্বকাপও তেমন কিছু হতে পারত।

উপমহাদেশের টেস্ট খেলুড়ে পাঁচ দেশের একটি বাংলাদেশ। শুধুই ক্রিকেটীয় বিবেচনায় তাদের এই বিশ্বকাপে থাকার কথা ছিল, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু রাজনীতি ও আইসিসির সিদ্ধান্তে সেই সুযোগ হারিয়েছে তারা। ফলে বিশ্বকাপ অনেকটাই অর্থহীন হয়ে পড়েছে। উৎসবের মঞ্চ রঙ হারিয়েছে। বাংলাদেশের কোটি কোটি ক্রিকেটপ্রেমীও বঞ্চিত হয়েছেন এই উৎসব থেকে। বৈশ্বিক ভ্রাতৃত্বের এই সংকটের সমাধান—ক্রিকেটের এই মুহূর্তে দরকার নিজের সেরা রূপে ফিরে যাওয়া। দরকার সেই স্মরণীয় গল্পগুলো—২০১২ সালের গ্যাংনাম নাচ, ২০১৪ ফাইনালে শ্রীলঙ্কার নিখুঁত ইয়র্কার, কার্লোস ব্র্যাথওয়েটের টানা চার ছক্কা, বাউন্ডারি সীমানায় সূর্যকুমার যাদবের অবিশ্বাস্য ক্যাচ কিংবা ২০২১ সালে জেমস নিশামের নায়কোচিত উত্থান।

হয়তো এসব প্রত্যাশা কিছুটা সরল। কিন্তু খেলাটির নিয়ন্ত্রকদের সিদ্ধান্ত আমাদের সামনে আর কী পথই বা খোলা রেখেছে? আরেকটি সম্ভাবনাও আছে—যেখানে ভূ-রাজনৈতিক ফাটল আরও গভীর হবে, যেমনটা হয়েছিল গত এশিয়া কাপের করুণ পরিণতিতে। এই বিশ্বকাপ যেন সেই পথে না যায়—এটা এখন আর শুধু আশা নয়, এক ধরনের প্রার্থনা। কারণ উৎসব শেষে আলো নিভে গেলে, পতাকা গুটিয়ে নিলেও কোটি কোটি মানুষকে এই উপমহাদেশে একসঙ্গে বাঁচতে হবে। ক্রিকেট যদি বিভাজনের অস্ত্র হয়ে ওঠে, সেটিই হবে সবচেয়ে বড় পরাজয়।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

চাঁদপুরে গভীর রাতে ডাকাতি, গৃহবধূ নিহত

রাজনৈতিক টানাপোড়েন: টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অনিশ্চয়তার মেঘ, বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাতিল

আপডেট সময় : ০৮:১৮:৪৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বিশ্বজুড়ে ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ এক মহা উৎসবের নাম। প্রতি দুই বা চার বছর পর পর এই বৈশ্বিক আসরের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন কোটি কোটি ভক্ত-সমর্থক। চারদিকে যখন উৎসবের আমেজ বিরাজ করার কথা, ঠিক তখনই ২০২৬ সালের আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে রাজনীতির কালো ছায়া গ্রাস করেছে ক্রিকেটীয় উন্মাদনাকে। ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশের ত্রিমুখী রাজনৈতিক টানাপোড়েনে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে উপমহাদেশ, যা মাঠের লড়াই শুরুর আগেই প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে—ক্রিকেট কি পারবে নিজেকে এই রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব থেকে মুক্ত রাখতে? নাকি ব্যাট-বলের শব্দ রাজনীতির কোলাহলে হারিয়ে যাবে?

আধুনিক ক্রিকেটের অন্যতম বড় এই আসর, ২০ ওভারের লড়াই মানেই যেখানে থাকে তুমুল উন্মাদনা। ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও আমেরিকার দলগুলো এক ছাদের নিচে আসে এই প্রতিযোগিতায়। এবারের আসর আয়োজনের সব প্রস্তুতিই সম্পন্ন ছিল—ভেন্যু, সূচি, সম্প্রচার পরিকল্পনা। কিন্তু উৎসবের ঠিক আগমুহূর্তে উপমহাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ক্রিকেটের দরজায় এসে আঘাত হেনেছে।

এই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে। দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের অবনতি এতটাই গভীর যে তা ক্রিকেট সীমান্তেও প্রভাব ফেলেছে। এর শুরুটা হয় চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে ভারতের পাকিস্তানে খেলতে অস্বীকৃতি জানানোর মধ্য দিয়ে। এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানও ভারতে খেলতে অস্বীকৃতি জানায়। এরপর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) আইপিএল-এ খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ এবং ভারতীয় বোর্ডের কিছু সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানায়। সার্বিক পরিস্থিতিতে ক্রিকেটারদের জন্য ভারত নিরাপদ নয়—এই দাবি জানিয়ে বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তাদের ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় স্থানান্তরের অনুরোধ করে। তবে আইসিসি, ভারতের আপত্তির মুখে, বাংলাদেশের সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে। ফলস্বরূপ, এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের জায়গায় স্কটল্যান্ডকে খেলার সুযোগ করে দেওয়া হয়।

এই টানাপোড়েনের মধ্যেই পাকিস্তান সরকার জানিয়ে দিয়েছে, তারা নিরপেক্ষ ভেন্যু হলেও ভারতের বিপক্ষে গ্রুপ ম্যাচ খেলবে না। রাজনীতির এই টর্নেডো ক্রিকেটের দিকে ধেয়ে এসে পুরো বিশ্বকাপেই এক অস্বস্তিকর বাতাস বইয়ে দিচ্ছে। পরিস্থিতি এমন যে, এই টানটান উত্তেজনা কাটাতে হলে যেন করাত লাগাতে হয়। তবুও আশার জায়গা আছে। হয়তো বল মাঠে গড়ালে ক্রিকেটপ্রেমীদের নজর ফিরবে ক্রিকেটের সৌন্দর্যের দিকে। শ্রীলঙ্কার আলো-ছায়ায় দুলতে থাকা সুইং, ভারতের উইকেটে নিখুঁত বাউন্স, টুর্নামেন্ট যত গড়াবে স্পিনারদের জন্য তৈরি হওয়া ক্ষয়ে যাওয়া পিচ—এসবই ক্রিকেটপ্রেমীদের আবার মাঠে টেনে আনতে পারে।

এই বিশ্বকাপ হতে পারত ক্রিকেটপ্রেমীদের স্বপ্নের আসর। গ্রুপ পর্বে দিনে তিনটি ম্যাচ—স্ট্রিমিং যুগের দর্শকদের জন্য এক মহা উৎসবের মতো। দুই শতাধিক ক্রিকেটার প্রতি সপ্তাহে মাঠে নামবেন এমন এক ফরম্যাটে, যেখানে প্রতিভার বিস্তার সবচেয়ে বেশি। দুই দেশে আটটি ভেন্যু—যেখানে ক্রিকেট নিঃসন্দেহে সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। কাগজে-কলমে সবই ছিল নিখুঁত। আজকের ক্রিকেট ভক্তরা আর শুধু পোস্টারে দেয়াল সাজান না। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশ্লেষণ লেখেন, ম্যাচের গল্প শেয়ার করেন, ভাইরাল ভিডিও বানান, মিম তৈরি করেন। ক্রিকেট যখন তার সেরা রূপে থাকে, তখন সেটি হয়ে ওঠে মানুষের অভিন্ন ভাষা। এই বিশ্বকাপও তেমন কিছু হতে পারত।

উপমহাদেশের টেস্ট খেলুড়ে পাঁচ দেশের একটি বাংলাদেশ। শুধুই ক্রিকেটীয় বিবেচনায় তাদের এই বিশ্বকাপে থাকার কথা ছিল, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু রাজনীতি ও আইসিসির সিদ্ধান্তে সেই সুযোগ হারিয়েছে তারা। ফলে বিশ্বকাপ অনেকটাই অর্থহীন হয়ে পড়েছে। উৎসবের মঞ্চ রঙ হারিয়েছে। বাংলাদেশের কোটি কোটি ক্রিকেটপ্রেমীও বঞ্চিত হয়েছেন এই উৎসব থেকে। বৈশ্বিক ভ্রাতৃত্বের এই সংকটের সমাধান—ক্রিকেটের এই মুহূর্তে দরকার নিজের সেরা রূপে ফিরে যাওয়া। দরকার সেই স্মরণীয় গল্পগুলো—২০১২ সালের গ্যাংনাম নাচ, ২০১৪ ফাইনালে শ্রীলঙ্কার নিখুঁত ইয়র্কার, কার্লোস ব্র্যাথওয়েটের টানা চার ছক্কা, বাউন্ডারি সীমানায় সূর্যকুমার যাদবের অবিশ্বাস্য ক্যাচ কিংবা ২০২১ সালে জেমস নিশামের নায়কোচিত উত্থান।

হয়তো এসব প্রত্যাশা কিছুটা সরল। কিন্তু খেলাটির নিয়ন্ত্রকদের সিদ্ধান্ত আমাদের সামনে আর কী পথই বা খোলা রেখেছে? আরেকটি সম্ভাবনাও আছে—যেখানে ভূ-রাজনৈতিক ফাটল আরও গভীর হবে, যেমনটা হয়েছিল গত এশিয়া কাপের করুণ পরিণতিতে। এই বিশ্বকাপ যেন সেই পথে না যায়—এটা এখন আর শুধু আশা নয়, এক ধরনের প্রার্থনা। কারণ উৎসব শেষে আলো নিভে গেলে, পতাকা গুটিয়ে নিলেও কোটি কোটি মানুষকে এই উপমহাদেশে একসঙ্গে বাঁচতে হবে। ক্রিকেট যদি বিভাজনের অস্ত্র হয়ে ওঠে, সেটিই হবে সবচেয়ে বড় পরাজয়।