ঢাকা ১০:৪২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬

ভেজাল কসমেটিকসের আগ্রাসন: জনস্বাস্থ্য রক্ষায় কঠোর নীতিমালা ও শুল্ক সংস্কারের দাবি

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১২:৪২:৩৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৮ বার পড়া হয়েছে

ভেজাল ও নিম্নমানের কসমেটিকস, হোমকেয়ার এবং স্কিনকেয়ার পণ্যের আগ্রাসন জনস্বাস্থ্যকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলছে। এই ভয়াবহতা থেকে মুক্তি পেতে নিরাপদ ও মানসম্মত পণ্যের ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং কঠোর নীতিমালা বাস্তবায়ন জরুরি বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। একইসাথে, দেশীয় কসমেটিকস শিল্পের সুরক্ষায় কাঁচামালের আমদানি শুল্ক কমিয়ে তৈরি পণ্যের শুল্ক বাড়ানোর দাবিও জানানো হয়েছে।

গত ২৮ জানুয়ারি, বুধবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর (ডিএনসিআরপি)-এর সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত ‘ভেজাল ও নিম্নমানের পণ্যের আগ্রাসন: ভোক্তার সুরক্ষায় প্রয়োজন কঠোর নীতিমালা’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। ডিএনসিআরপি এবং অ্যাসোসিয়েশন অব স্কিন কেয়ার অ্যান্ড বিউটি প্রোডাক্টস ম্যানুফ্যাকচারারস অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অব বাংলাদেশ (এএসবিএমইবি)-এর যৌথ উদ্যোগে এই সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ড. মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম।

সেমিনারের প্রধান অতিথি জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ফারুক আহম্মেদ বলেন, ভেজাল ও নিম্নমানের পণ্যের আগ্রাসন রোধে ব্যর্থ হলে আগামী প্রজন্ম মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। তিনি হালাল পণ্যের বৈশ্বিক বাজারের বিশাল সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে বলেন, এই বাজারে প্রবেশে দেশের কসমেটিকস ও বিউটি পণ্যের অপরিসীম সুযোগ রয়েছে। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে দেশীয় শিল্পের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সব ধরনের নীতিগত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

মূল প্রবন্ধে ড. আইনুল ইসলাম উল্লেখ করেন, দেশে কসমেটিকস খাত অনেক উপেক্ষিত। অথচ কসমেটিকস কেবল সাজসজ্জা নয়, এটি জনস্বাস্থ্য, সামাজিক কল্যাণ এবং আত্মবিশ্বাসের সাথে জড়িত। তিনি ভেজাল ও নিম্নমানের আমদানিকৃত পণ্যের ভয়াবহতার চিত্র তুলে ধরে বলেন, এই অবস্থা দেশীয় শিল্পের বিকাশকে রুদ্ধ করছে। তার মতে, ভেজাল পণ্য আসল পণ্যের চেয়ে সস্তায় মিললে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা কার্যকর না থাকলে, খারাপ পণ্য ভালো পণ্যকে বাজার থেকে বিতাড়িত করে।

এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক ইসহাকুল হোসেন সুইট ব্যবসা সহজীকরণের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, কসমেটিকস শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে আরোপিত ১২৭.৭২ শতাংশ শুল্ক দেশীয় শিল্পের বিকাশে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। এই উচ্চ শুল্কহার উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে, যার ফলে স্থানীয় শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। দেশীয় শিল্পকে টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক করতে কাঁচামাল আমদানিতে এই শুল্ক কমিয়ে নামমাত্র পর্যায়ে আনার দাবি জানান তিনি।

বাংলাদেশ কসমেটিকস অ্যান্ড টয়লেট্রিজ ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব সাহিদ হোসেন বলেন, ভেজাল পণ্যের বিস্তার রোধ ও দেশীয় শিল্পের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কাঁচামাল আমদানির ওপর আরোপিত শুল্ক অবশ্যই কমাতে হবে। তার মতে, কাঁচামালে শুল্ক কমানো হলে শিল্প-উদ্যোক্তারা আরও বেশি বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন, যা শিল্পের টেকসই বিকাশে সহায়ক হবে। তিনি আরও বলেন, দেশীয় উৎপাদকদের স্বার্থ রক্ষায় বিশেষ করে আমদানিকৃত কসমেটিকস ও বিউটি পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

এসএমই ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি আলী জামান, দেশীয় শিল্পের টেকসই বিকাশের স্বার্থে লাগেজ পার্টি বা অনানুষ্ঠানিক পথে পণ্য আমদানি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার ওপর জোর দেন। তার মতে, লাগেজ পার্টির মাধ্যমে নিম্নমানের ও অনিয়ন্ত্রিত পণ্যের প্রবেশ দেশীয় শিল্পের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে কঠোর নজরদারি ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি তিনি জোরালো আহ্বান জানান।

ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম অব বাংলাদেশ (আইবিএফবি)-এর সহসভাপতি এম এস সিদ্দিকী ভেজাল ও নিম্নমানের পণ্য ক্রয় থেকে বিরত থাকতে ভোক্তাদের সর্বোচ্চ সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ভোক্তার সচেতনতা বাড়লেই ভেজাল পণ্যের বিস্তার কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. শারমিনা হক ভেজাল ও নিম্নমানের কসমেটিকস পণ্য ব্যবহারের ভয়াবহ দিক তুলে ধরে বলেন, এসব পণ্যের ক্ষতিকর প্রভাবে শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে কেউ কেউ চরম হতাশায় আত্মহত্যার পথও বেছে নিচ্ছেন। তিনি বলেন, এই ঝুঁকি এড়াতে ভোক্তাদেরই সবার আগে সচেতন হতে হবে এবং ব্যবহৃত কসমেটিকস পণ্যটি নিরাপদ ও মানসম্মত কি না তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে তিনি ভেজাল ও ক্ষতিকর পণ্যের বিস্তার রোধে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর তদারকি ও নজরদারি আরও জোরদার করার আহ্বান জানান।

এছাড়াও সেমিনারে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক আজিজুল ইসলাম, উপ-পরিচালক আতিয়া সুলতান, বিএসটিআই-এর উপ-পরিচালক আলাউদ্দিন হুসাইন এবং জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মনোয়ার হোসেন বক্তব্য রাখেন।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ক্ষমতার দম্ভ ক্ষণস্থায়ী: ইতিহাসের শিক্ষা

ভেজাল কসমেটিকসের আগ্রাসন: জনস্বাস্থ্য রক্ষায় কঠোর নীতিমালা ও শুল্ক সংস্কারের দাবি

আপডেট সময় : ১২:৪২:৩৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী ২০২৬

ভেজাল ও নিম্নমানের কসমেটিকস, হোমকেয়ার এবং স্কিনকেয়ার পণ্যের আগ্রাসন জনস্বাস্থ্যকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলছে। এই ভয়াবহতা থেকে মুক্তি পেতে নিরাপদ ও মানসম্মত পণ্যের ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং কঠোর নীতিমালা বাস্তবায়ন জরুরি বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। একইসাথে, দেশীয় কসমেটিকস শিল্পের সুরক্ষায় কাঁচামালের আমদানি শুল্ক কমিয়ে তৈরি পণ্যের শুল্ক বাড়ানোর দাবিও জানানো হয়েছে।

গত ২৮ জানুয়ারি, বুধবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর (ডিএনসিআরপি)-এর সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত ‘ভেজাল ও নিম্নমানের পণ্যের আগ্রাসন: ভোক্তার সুরক্ষায় প্রয়োজন কঠোর নীতিমালা’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। ডিএনসিআরপি এবং অ্যাসোসিয়েশন অব স্কিন কেয়ার অ্যান্ড বিউটি প্রোডাক্টস ম্যানুফ্যাকচারারস অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অব বাংলাদেশ (এএসবিএমইবি)-এর যৌথ উদ্যোগে এই সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ড. মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম।

সেমিনারের প্রধান অতিথি জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ফারুক আহম্মেদ বলেন, ভেজাল ও নিম্নমানের পণ্যের আগ্রাসন রোধে ব্যর্থ হলে আগামী প্রজন্ম মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। তিনি হালাল পণ্যের বৈশ্বিক বাজারের বিশাল সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে বলেন, এই বাজারে প্রবেশে দেশের কসমেটিকস ও বিউটি পণ্যের অপরিসীম সুযোগ রয়েছে। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে দেশীয় শিল্পের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সব ধরনের নীতিগত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

মূল প্রবন্ধে ড. আইনুল ইসলাম উল্লেখ করেন, দেশে কসমেটিকস খাত অনেক উপেক্ষিত। অথচ কসমেটিকস কেবল সাজসজ্জা নয়, এটি জনস্বাস্থ্য, সামাজিক কল্যাণ এবং আত্মবিশ্বাসের সাথে জড়িত। তিনি ভেজাল ও নিম্নমানের আমদানিকৃত পণ্যের ভয়াবহতার চিত্র তুলে ধরে বলেন, এই অবস্থা দেশীয় শিল্পের বিকাশকে রুদ্ধ করছে। তার মতে, ভেজাল পণ্য আসল পণ্যের চেয়ে সস্তায় মিললে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা কার্যকর না থাকলে, খারাপ পণ্য ভালো পণ্যকে বাজার থেকে বিতাড়িত করে।

এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক ইসহাকুল হোসেন সুইট ব্যবসা সহজীকরণের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, কসমেটিকস শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে আরোপিত ১২৭.৭২ শতাংশ শুল্ক দেশীয় শিল্পের বিকাশে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। এই উচ্চ শুল্কহার উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে, যার ফলে স্থানীয় শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। দেশীয় শিল্পকে টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক করতে কাঁচামাল আমদানিতে এই শুল্ক কমিয়ে নামমাত্র পর্যায়ে আনার দাবি জানান তিনি।

বাংলাদেশ কসমেটিকস অ্যান্ড টয়লেট্রিজ ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব সাহিদ হোসেন বলেন, ভেজাল পণ্যের বিস্তার রোধ ও দেশীয় শিল্পের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কাঁচামাল আমদানির ওপর আরোপিত শুল্ক অবশ্যই কমাতে হবে। তার মতে, কাঁচামালে শুল্ক কমানো হলে শিল্প-উদ্যোক্তারা আরও বেশি বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন, যা শিল্পের টেকসই বিকাশে সহায়ক হবে। তিনি আরও বলেন, দেশীয় উৎপাদকদের স্বার্থ রক্ষায় বিশেষ করে আমদানিকৃত কসমেটিকস ও বিউটি পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

এসএমই ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি আলী জামান, দেশীয় শিল্পের টেকসই বিকাশের স্বার্থে লাগেজ পার্টি বা অনানুষ্ঠানিক পথে পণ্য আমদানি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার ওপর জোর দেন। তার মতে, লাগেজ পার্টির মাধ্যমে নিম্নমানের ও অনিয়ন্ত্রিত পণ্যের প্রবেশ দেশীয় শিল্পের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে কঠোর নজরদারি ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি তিনি জোরালো আহ্বান জানান।

ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম অব বাংলাদেশ (আইবিএফবি)-এর সহসভাপতি এম এস সিদ্দিকী ভেজাল ও নিম্নমানের পণ্য ক্রয় থেকে বিরত থাকতে ভোক্তাদের সর্বোচ্চ সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ভোক্তার সচেতনতা বাড়লেই ভেজাল পণ্যের বিস্তার কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. শারমিনা হক ভেজাল ও নিম্নমানের কসমেটিকস পণ্য ব্যবহারের ভয়াবহ দিক তুলে ধরে বলেন, এসব পণ্যের ক্ষতিকর প্রভাবে শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে কেউ কেউ চরম হতাশায় আত্মহত্যার পথও বেছে নিচ্ছেন। তিনি বলেন, এই ঝুঁকি এড়াতে ভোক্তাদেরই সবার আগে সচেতন হতে হবে এবং ব্যবহৃত কসমেটিকস পণ্যটি নিরাপদ ও মানসম্মত কি না তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে তিনি ভেজাল ও ক্ষতিকর পণ্যের বিস্তার রোধে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর তদারকি ও নজরদারি আরও জোরদার করার আহ্বান জানান।

এছাড়াও সেমিনারে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক আজিজুল ইসলাম, উপ-পরিচালক আতিয়া সুলতান, বিএসটিআই-এর উপ-পরিচালক আলাউদ্দিন হুসাইন এবং জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মনোয়ার হোসেন বক্তব্য রাখেন।