ঢাকা ১০:২৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬

বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি: রেকর্ড উপস্থিতি থেকে সর্বনিম্ন পতন

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৪:১২:৪৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৫ বার পড়া হয়েছে

একটি দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি জনগণের আস্থা, তাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক পরিবেশের প্রতিফলন হিসেবে ভোটার উপস্থিতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইতিহাসে এই উপস্থিতির চিত্রে যেমন রেকর্ড সংখ্যক ভোটার অংশগ্রহণের নজির রয়েছে, তেমনি লক্ষ্য করা গেছে উল্লেখযোগ্যভাবে কম উপস্থিতি। এই প্রতিবেদনটি ১৯৭৩ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনগুলোতে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন ভোটার উপস্থিতি এবং এর প্রেক্ষাপট তুলে ধরবে। যদিও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কেবল ভোটার সংখ্যা দিয়ে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা বিচার করা যায় না, তবুও এটি নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

আওয়ামী লীগ শাসনামলের বিতর্কিত নির্বাচনসমূহ:

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন (২০২৪):
২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ‘স্বল্প ভোটের নির্বাচন’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। দলীয় সরকারের অধীনে এই নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগে ৯টি আসনের ২১টি কেন্দ্রের ভোট স্থগিত করা হয়েছিল। ২৯৯টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ২২৩টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে। নির্বাচন কমিশন জানায়, মোট ১১ কোটি ৯৫ লাখ এক হাজার ৫৮৫ জন ভোটারের মধ্যে চার কোটি ৯৯ লাখ ৫৫ হাজার ৪৪৫ জন ভোট দিয়েছেন। তবে, এই তথ্যের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচনের দিন বেলা ৩টা পর্যন্ত ২৭.১৫ শতাংশ ভোট পড়ার তথ্য দেওয়া হলেও, বিকাল ৫টায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার জানান ৪১.৮ শতাংশ ভোট পড়েছে। এই পরিসংখ্যান নিয়ে সংশয় প্রকাশ করলে তৎকালীন সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল তা চ্যালেঞ্জ করার আহ্বান জানান। ২৮টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করলেও বিএনপি সহ ১৬টি নিবন্ধিত দল নির্বাচন বর্জন করে। বিএনপি এই নির্বাচনকে ‘প্রহসন’ আখ্যা দেয় এবং ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে অপকৌশলের আশ্রয় নেওয়ার অভিযোগ আনে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং তদন্তের আহ্বান জানায়। এই নির্বাচনকে ‘ডামি’ প্রার্থীর নির্বাচন হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়, যেখানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নেন।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন (২০১৮):
৩০ ডিসেম্বর, ২০১৮ তারিখে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে বিএনপি সহ ৩৯টি দল অংশ নিলেও ব্যাপক কারচুপির অভিযোগে নির্বাচনটি বিতর্কিত হয়ে পড়ে। ‘রাতের ভোট’ আখ্যা পাওয়া এই নির্বাচনে ভোটের আগের রাতেই বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের দখলে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। অনেক স্থানে এই অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গিয়েছিল। গণমাধ্যমগুলোর ওপর বিধিনিষেধ থাকায় অনেক অনিয়ম প্রচার করা সম্ভব হয়নি। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ২৮৮টি আসন লাভ করে, যেখানে বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট পায় মাত্র সাতটি। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই নির্বাচনে মোট ভোটার ছিল ১০ কোটি ৪১ লাখ ৫৬ হাজার ২৬৯ জন, এবং ভোট পড়েছে ৮ কোটি ৩৫ লাখ ৩২ হাজার ৯১১ জন, যা ৮০.২০ শতাংশ। ভোট পড়ার হার বিবেচনায় এটি বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ছিল।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন (২০১৪):
আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনটি ছিল মূলত বিরোধী দলবিহীন। সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিলের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী সহ অধিকাংশ বিরোধী দল নির্বাচন বর্জন করে। ফলে ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৫৪ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। ১৪৭টি আসনে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয় এবং নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, তাতে ভোট পড়েছিল ৪০.০৪ শতাংশ। তবে, মানবাধিকার কমিশন ও অন্যান্য সংস্থার মতে, ভোট পড়ার হার ছিল প্রায় ১০ শতাংশ।

১৯৯১ থেকে ২০০৮: তুলনামূলক গ্রহণযোগ্য চার নির্বাচন

২০০৮: ‘সুষ্ঠু’ নির্বাচন ও আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন:
২৯ ডিসেম্বর, ২০০৮ তারিখে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এককভাবে ২৩০টি আসন লাভ করে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হওয়া এই নির্বাচনকে অনেক পর্যবেক্ষক বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হিসেবে গণ্য করেন। সেবার ভোটার উপস্থিতি ছিল ৮৭.১৩ শতাংশ।

২০০১: বিএনপির সর্বশেষ বিজয়:
১ অক্টোবর, ২০০১ তারিখে অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ১৯৩টি আসন লাভ করে সরকার গঠন করে। মোট ভোটার ছিল ৭ কোটি ৪৯ লাখ ৪৬ হাজার ৩৬৪ জন এবং ভোট পড়েছিল ৭৫.৫৯ শতাংশ।

১৯৯৬: একই বছরে দুই নির্বাচন:
১৯৯৬ সালে দুইবার সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৫ ফেব্রুয়ারির ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে হওয়ায় অধিকাংশ বিরোধী দল বয়কট করে এবং মাত্র ২৬.৫৪ শতাংশ ভোট পড়ে। পরবর্তীতে সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হয় এবং ১২ জুন অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৮১টি রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৪৬টি এবং বিএনপি ১১৬টি আসন লাভ করে। জাতীয় পার্টির সমর্থনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। এই নির্বাচনে ভোট পড়ার হার ছিল ৭৪.৯৬ শতাংশ।

১৯৯১: বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী:
২৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯১ তারিখে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সাধারণ নির্বাচন। প্রায় সাড়ে ৬ কোটি ভোটারের মধ্যে ৫৫ শতাংশেরও বেশি ভোট পড়ে। এই নির্বাচনে বিএনপি ১৪০টি আসনে জিতে জামায়াতে ইসলামীর সাথে জোট গঠন করে এবং খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন।

প্রথম চার নির্বাচন:

চতুর্থ সংসদ নির্বাচন (১৯৮৮):
সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের অধীনে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনটি বিএনপি, আওয়ামী লীগ সহ অধিকাংশ বড় দল বয়কট করে। নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, ভোটার উপস্থিতি ছিল মাত্র ৫৪.৯৩ শতাংশ। এই নির্বাচনটি এরশাদের পতনের পথ প্রশস্ত করে।

তৃতীয় সংসদ নির্বাচন (১৯৮৬):
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত জাতীয় পার্টি এই নির্বাচনে জয়লাভ করে। মোট ভোটারের ৪২.৩৪ শতাংশ ভোট পড়েছিল। এই সংসদ মাত্র ১৭ মাস টিকে ছিল।

দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন (১৯৭৯):
এই নির্বাচনটি বহুদলীয় রাজনীতির সূচনা করে এবং জিয়াউর রহমানের গঠিত বিএনপি ২০৭টি আসনে জয়লাভ করে। ভোট পড়েছিল ৪৯.৬৭ শতাংশ।

প্রথম সংসদ নির্বাচন (১৯৭৩):
৭ মার্চ, ১৯৭৩ তারিখে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ১৪টি রাজনৈতিক দল অংশ নেয় এবং আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। সাড়ে ৩ কোটির বেশি ভোটারের মধ্যে ৫৫ শতাংশ ভোট দিয়েছিল। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে সাংবিধানিক শাসন প্রতিষ্ঠার এটি ছিল একটি বড় পদক্ষেপ।

ভোটার উপস্থিতি কি নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করে তোলে?

নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সর্বনিম্ন ২৬.৫৪ শতাংশ ভোট পড়েছিল। অন্যদিকে, ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৮০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছিল, যা সর্বোচ্চ। তবে, ২০১৮ সালের নির্বাচনটি বিতর্কিত ছিল।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আব্দুল আলীম বলেন, “ভোটার উপস্থিতি বেশি হওয়া মানেই নির্বাচন গ্রহণযোগ্য নয়। উপস্থিতি স্বতঃস্ফূর্ত কিনা তা দেখতে হবে।” তিনি আরও বলেন, “গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও বড় একটি বিষয়। যদি আগে থেকেই জানা থাকে কে জিতবে, তবে সেই নির্বাচন অর্থহীন।” ২০১৪ সালের নির্বাচনকে তিনি ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন’ হিসেবে উল্লেখ করেন, যেখানে ‘ডামি’ প্রার্থীর উপস্থিতি ভোটারদের নিরুৎসাহিত করেছে।

তিনি আরও বলেন, “নির্বাচন যখন অংশগ্রহণমূলক হয় না, তখন ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যেতে আগ্রহী হয় না। পাশাপাশি, নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচন প্রক্রিয়ার ওপর ভোটারদের আস্থা থাকাও এখানে জরুরি।” আব্দুল আলীমের মতে, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামী নির্বাচনগুলোতে নির্বাচনী মাঠকে সমতল রাখা উচিত এবং নির্বাচন কমিশনের উচিত যেকোনো অভিযোগ যাচাই করে দেখা।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

গণমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকে বাংলাদেশের ৩ ধাপ অবনতি: ১৮০ দেশের মধ্যে ১৫২তম অবস্থান

বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি: রেকর্ড উপস্থিতি থেকে সর্বনিম্ন পতন

আপডেট সময় : ০৪:১২:৪৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬

একটি দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি জনগণের আস্থা, তাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক পরিবেশের প্রতিফলন হিসেবে ভোটার উপস্থিতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইতিহাসে এই উপস্থিতির চিত্রে যেমন রেকর্ড সংখ্যক ভোটার অংশগ্রহণের নজির রয়েছে, তেমনি লক্ষ্য করা গেছে উল্লেখযোগ্যভাবে কম উপস্থিতি। এই প্রতিবেদনটি ১৯৭৩ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনগুলোতে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন ভোটার উপস্থিতি এবং এর প্রেক্ষাপট তুলে ধরবে। যদিও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কেবল ভোটার সংখ্যা দিয়ে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা বিচার করা যায় না, তবুও এটি নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

আওয়ামী লীগ শাসনামলের বিতর্কিত নির্বাচনসমূহ:

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন (২০২৪):
২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ‘স্বল্প ভোটের নির্বাচন’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। দলীয় সরকারের অধীনে এই নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগে ৯টি আসনের ২১টি কেন্দ্রের ভোট স্থগিত করা হয়েছিল। ২৯৯টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ২২৩টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে। নির্বাচন কমিশন জানায়, মোট ১১ কোটি ৯৫ লাখ এক হাজার ৫৮৫ জন ভোটারের মধ্যে চার কোটি ৯৯ লাখ ৫৫ হাজার ৪৪৫ জন ভোট দিয়েছেন। তবে, এই তথ্যের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচনের দিন বেলা ৩টা পর্যন্ত ২৭.১৫ শতাংশ ভোট পড়ার তথ্য দেওয়া হলেও, বিকাল ৫টায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার জানান ৪১.৮ শতাংশ ভোট পড়েছে। এই পরিসংখ্যান নিয়ে সংশয় প্রকাশ করলে তৎকালীন সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল তা চ্যালেঞ্জ করার আহ্বান জানান। ২৮টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করলেও বিএনপি সহ ১৬টি নিবন্ধিত দল নির্বাচন বর্জন করে। বিএনপি এই নির্বাচনকে ‘প্রহসন’ আখ্যা দেয় এবং ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে অপকৌশলের আশ্রয় নেওয়ার অভিযোগ আনে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং তদন্তের আহ্বান জানায়। এই নির্বাচনকে ‘ডামি’ প্রার্থীর নির্বাচন হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়, যেখানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নেন।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন (২০১৮):
৩০ ডিসেম্বর, ২০১৮ তারিখে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে বিএনপি সহ ৩৯টি দল অংশ নিলেও ব্যাপক কারচুপির অভিযোগে নির্বাচনটি বিতর্কিত হয়ে পড়ে। ‘রাতের ভোট’ আখ্যা পাওয়া এই নির্বাচনে ভোটের আগের রাতেই বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের দখলে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। অনেক স্থানে এই অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গিয়েছিল। গণমাধ্যমগুলোর ওপর বিধিনিষেধ থাকায় অনেক অনিয়ম প্রচার করা সম্ভব হয়নি। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ২৮৮টি আসন লাভ করে, যেখানে বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট পায় মাত্র সাতটি। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই নির্বাচনে মোট ভোটার ছিল ১০ কোটি ৪১ লাখ ৫৬ হাজার ২৬৯ জন, এবং ভোট পড়েছে ৮ কোটি ৩৫ লাখ ৩২ হাজার ৯১১ জন, যা ৮০.২০ শতাংশ। ভোট পড়ার হার বিবেচনায় এটি বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ছিল।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন (২০১৪):
আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনটি ছিল মূলত বিরোধী দলবিহীন। সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিলের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী সহ অধিকাংশ বিরোধী দল নির্বাচন বর্জন করে। ফলে ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৫৪ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। ১৪৭টি আসনে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয় এবং নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, তাতে ভোট পড়েছিল ৪০.০৪ শতাংশ। তবে, মানবাধিকার কমিশন ও অন্যান্য সংস্থার মতে, ভোট পড়ার হার ছিল প্রায় ১০ শতাংশ।

১৯৯১ থেকে ২০০৮: তুলনামূলক গ্রহণযোগ্য চার নির্বাচন

২০০৮: ‘সুষ্ঠু’ নির্বাচন ও আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন:
২৯ ডিসেম্বর, ২০০৮ তারিখে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এককভাবে ২৩০টি আসন লাভ করে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হওয়া এই নির্বাচনকে অনেক পর্যবেক্ষক বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হিসেবে গণ্য করেন। সেবার ভোটার উপস্থিতি ছিল ৮৭.১৩ শতাংশ।

২০০১: বিএনপির সর্বশেষ বিজয়:
১ অক্টোবর, ২০০১ তারিখে অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ১৯৩টি আসন লাভ করে সরকার গঠন করে। মোট ভোটার ছিল ৭ কোটি ৪৯ লাখ ৪৬ হাজার ৩৬৪ জন এবং ভোট পড়েছিল ৭৫.৫৯ শতাংশ।

১৯৯৬: একই বছরে দুই নির্বাচন:
১৯৯৬ সালে দুইবার সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৫ ফেব্রুয়ারির ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে হওয়ায় অধিকাংশ বিরোধী দল বয়কট করে এবং মাত্র ২৬.৫৪ শতাংশ ভোট পড়ে। পরবর্তীতে সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হয় এবং ১২ জুন অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৮১টি রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৪৬টি এবং বিএনপি ১১৬টি আসন লাভ করে। জাতীয় পার্টির সমর্থনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। এই নির্বাচনে ভোট পড়ার হার ছিল ৭৪.৯৬ শতাংশ।

১৯৯১: বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী:
২৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯১ তারিখে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সাধারণ নির্বাচন। প্রায় সাড়ে ৬ কোটি ভোটারের মধ্যে ৫৫ শতাংশেরও বেশি ভোট পড়ে। এই নির্বাচনে বিএনপি ১৪০টি আসনে জিতে জামায়াতে ইসলামীর সাথে জোট গঠন করে এবং খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন।

প্রথম চার নির্বাচন:

চতুর্থ সংসদ নির্বাচন (১৯৮৮):
সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের অধীনে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনটি বিএনপি, আওয়ামী লীগ সহ অধিকাংশ বড় দল বয়কট করে। নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, ভোটার উপস্থিতি ছিল মাত্র ৫৪.৯৩ শতাংশ। এই নির্বাচনটি এরশাদের পতনের পথ প্রশস্ত করে।

তৃতীয় সংসদ নির্বাচন (১৯৮৬):
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত জাতীয় পার্টি এই নির্বাচনে জয়লাভ করে। মোট ভোটারের ৪২.৩৪ শতাংশ ভোট পড়েছিল। এই সংসদ মাত্র ১৭ মাস টিকে ছিল।

দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন (১৯৭৯):
এই নির্বাচনটি বহুদলীয় রাজনীতির সূচনা করে এবং জিয়াউর রহমানের গঠিত বিএনপি ২০৭টি আসনে জয়লাভ করে। ভোট পড়েছিল ৪৯.৬৭ শতাংশ।

প্রথম সংসদ নির্বাচন (১৯৭৩):
৭ মার্চ, ১৯৭৩ তারিখে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ১৪টি রাজনৈতিক দল অংশ নেয় এবং আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। সাড়ে ৩ কোটির বেশি ভোটারের মধ্যে ৫৫ শতাংশ ভোট দিয়েছিল। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে সাংবিধানিক শাসন প্রতিষ্ঠার এটি ছিল একটি বড় পদক্ষেপ।

ভোটার উপস্থিতি কি নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করে তোলে?

নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সর্বনিম্ন ২৬.৫৪ শতাংশ ভোট পড়েছিল। অন্যদিকে, ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৮০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছিল, যা সর্বোচ্চ। তবে, ২০১৮ সালের নির্বাচনটি বিতর্কিত ছিল।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আব্দুল আলীম বলেন, “ভোটার উপস্থিতি বেশি হওয়া মানেই নির্বাচন গ্রহণযোগ্য নয়। উপস্থিতি স্বতঃস্ফূর্ত কিনা তা দেখতে হবে।” তিনি আরও বলেন, “গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও বড় একটি বিষয়। যদি আগে থেকেই জানা থাকে কে জিতবে, তবে সেই নির্বাচন অর্থহীন।” ২০১৪ সালের নির্বাচনকে তিনি ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন’ হিসেবে উল্লেখ করেন, যেখানে ‘ডামি’ প্রার্থীর উপস্থিতি ভোটারদের নিরুৎসাহিত করেছে।

তিনি আরও বলেন, “নির্বাচন যখন অংশগ্রহণমূলক হয় না, তখন ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যেতে আগ্রহী হয় না। পাশাপাশি, নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচন প্রক্রিয়ার ওপর ভোটারদের আস্থা থাকাও এখানে জরুরি।” আব্দুল আলীমের মতে, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামী নির্বাচনগুলোতে নির্বাচনী মাঠকে সমতল রাখা উচিত এবং নির্বাচন কমিশনের উচিত যেকোনো অভিযোগ যাচাই করে দেখা।