উনিশ শতকের গোড়ার দিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও স্থানীয় জমিদারদের শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে বাংলার বুকে জ্বলে উঠেছিল যে প্রতিরোধ সংগ্রাম, তার অন্যতম মহানায়ক ছিলেন সাইয়েদ নিসার আলী মীর, যিনি তিতুমীর নামেই সমধিক পরিচিত। চব্বিশ পরগনার চাঁদপুর গ্রামে জন্মগ্রহণকারী এই বীর ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কারের মাধ্যমে সাধারণ কৃষককে সংগঠিত করে এক বিশাল গণআন্দোলন গড়ে তোলেন। জমিদারদের ‘দাড়ি কর’ ও অন্যান্য অত্যাচারের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা তার ঐতিহাসিক ‘বাঁশের কেল্লা’ ছিল ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের এক দুঃসাহসী প্রতীক, যা শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে এক অসম যুদ্ধে আত্মাহুতি দিলেও পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।
১৭৮১ সালে চব্বিশ পরগনা জেলার বারাসত মহকুমার অন্তর্গত চাঁদপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তিতুমীরের জন্ম। বংশানুক্রমিকভাবে তার পরিবার ইসলাম প্রচারে নিয়োজিত ছিল। পিতা সাইয়েদ হাসান আলীও ছিলেন একজন সুপরিচিত ব্যক্তি। শৈশব থেকেই তিতুমীর ছিলেন জ্ঞানপিপাসু। অল্প বয়সেই তিনি পবিত্র কোরআনে হাফেজ হন। আরবি ব্যাকরণ, ফরায়েজ (ইসলামের উত্তরাধিকার আইন), হাদিস, দর্শন, তর্কশাস্ত্র, তাসাউফ এবং আরবি-ফারসি কাব্য ও সাহিত্যে তার ছিল গভীর জ্ঞান। বাংলা ভাষাতেও তিনি ছিলেন অসাধারণ পণ্ডিত।
প্রাথমিক জীবনে তিতুমীর কলকাতার একজন মল্লযোদ্ধা ও আখড়ার দলনেতা ছিলেন। স্থানীয় জমিদাররা প্রজাদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায়ের জন্য তাকে কাজে লাগাতেন। এ সময়ে এক বিবাদে জড়িয়ে তাকে কিছুদিন কারাভোগ করতে হয়। কারামুক্তির পর তিনি দিল্লির রাজপরিবারের এক ব্যক্তির অধীনে কাজ গ্রহণ করেন এবং তার সঙ্গে পবিত্র হজ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা গমন করেন। সেখানেই উপমহাদেশের ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম ও ‘তরিকা-ই-মুহাম্মাদিয়া’ আন্দোলনের প্রধান নেতা সাইয়েদ আহমদ শহীদের সংস্পর্শে আসেন এবং তার কাছে দীক্ষা গ্রহণ করেন। ১৮২৭ সালে দেশে ফিরে তিতুমীর হায়দারপুরে বসতি স্থাপন করে সমাজ সংস্কারের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে এবং তিন-চার শতাধিক মানুষ তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করে। তারা ইসলামের আদর্শে জীবনযাপন করতে শুরু করে এবং দাড়ি রাখা ও বিশেষ ধরনের পোশাক পরিধানের কারণে সমাজে তাদের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে ওঠে। তিতুমীরের নেতৃত্বে বাংলায় এক শক্তিশালী সংস্কার আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করে।
তিতুমীরের সংস্কারমূলক আহ্বানে বাংলার বহু কৃষক সাড়া দেয়, যা দ্রুতই সাধারণ মানুষের সমন্বয়ে একটি গণআন্দোলনে রূপ নেয়। মুসলমান প্রজাদের এই সংঘবদ্ধতা স্থানীয় হিন্দু জমিদারদের মধ্যে ভীতি তৈরি করে। তারাগুনিয়া, নগরকোট ও কুমারগাছির জমিদাররা তিতুমীরের অনুসারীদের শক্তি বৃদ্ধির পথ রুদ্ধ করতে সচেষ্ট হয়। পুড়ার কিষেন দেব রায় মুসলমান প্রজাদের ওপর ‘দাড়ি কর’ নামক এক অপমানজনক কর আরোপ করেন। সরফরাজপুরের প্রজারা এই অন্যায় কর দিতে অস্বীকৃতি জানালে জমিদারদের অত্যাচার আরও বৃদ্ধি পায়। তিতুমীর জমিদারদের এই নিপীড়ন বন্ধের জন্য জেলা ও বিভাগীয় কর্তৃপক্ষের দ্বারস্থ হন, কিন্তু তার সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
শান্তিপূর্ণ উপায়ে জমিদারদের অত্যাচারের প্রতিকার সম্ভব না হওয়ায় তিতুমীর প্রজাদের স্বার্থরক্ষায় সশস্ত্র প্রতিরোধের পথ বেছে নিতে বাধ্য হন। ১৮৩১ সালের অক্টোবর মাসে তিনি শিষ্য মুইজউদ্দীনের নারিকেলবেড়িয়া গ্রামের বাড়িটিকে তার কার্যকেন্দ্র হিসেবে নির্বাচন করেন। এ সময় মিসকিন শাহ নামক এক ফকির তার দলে যোগ দেন। ধীরে ধীরে তিতুমীরের অনুসারীরা নারিকেলবেড়িয়ায় সমবেত হতে শুরু করে এবং সেখানে তারা বাঁশের তৈরি এক মজবুত ঘাঁটি (‘তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা’ নামে পরিচিত) নির্মাণ করে। যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় রসদও সংগ্রহ করা হয়। তাদের লক্ষ্য ছিল জমিদারদের অন্যায়-অত্যাচারের অবসান ঘটিয়ে নিজেদের একটি সুদৃঢ় অবস্থান তৈরি করা।
একপর্যায়ে তিতুমীরের অনুসারীরা পুড়া গ্রামে প্রবেশ করে তা দখল করে নেয় এবং নিজেদের দেশের প্রকৃত অধিকারী বলে ঘোষণা করে। তার বিশ্বস্ত সহচর গোলাম মাসুমকে সৈন্যাধ্যক্ষ নিযুক্ত করা হয়। গোলাম মাসুমের নেতৃত্বে বিদ্রোহী বাহিনী লাউঘাটাসহ আরও কয়েকটি গ্রামে আক্রমণ চালিয়ে দখল প্রতিষ্ঠা করে। অল্প সময়ের মধ্যেই চব্বিশ পরগনা ও নদীয়া জেলার বহু গ্রামে তিতুমীরের প্রভাব ও আধিপত্য বিস্তৃত হয়।
তিতুমীরের এই উত্থান ব্রিটিশ প্রশাসনকে ভাবিয়ে তোলে। বারাসতের যুগ্ম ম্যাজিস্ট্রেট আলেকজান্ডার ১২৫ জন সশস্ত্র সৈন্য নিয়ে তিতুমীরের সামরিক কেন্দ্র নারিকেলবেড়িয়ার দিকে অগ্রসর হন। সেখানে সংঘটিত এক সংঘর্ষে আলেকজান্ডারের বাহিনী পরাজিত হয়; তাদের অন্তত ১৫ জন নিহত এবং বহু সৈন্য আহত হয়। বসিরহাটের দারোগা আহত অবস্থায় বন্দি হন। এই সাফল্যের পর তিতুমীরের মুক্তিবাহিনী বারগুড়িয়ার একটি নীলকুঠিসহ অন্য একটি নীলকুঠিতে আক্রমণ চালিয়ে লুট করে। বিদ্রোহ ক্রমেই বিস্তৃত ও সংঘবদ্ধ রূপ নিতে থাকে। ১৭ নভেম্বর কৃষ্ণনগরের ম্যাজিস্ট্রেট প্রায় ৩০০ সৈন্য নিয়ে নারিকেলবেড়িয়ায় আক্রমণ করেন, কিন্তু তিতুমীরের মুক্তিবাহিনী এই বাহিনীকেও পরাজিত করে পিছু হটতে বাধ্য করে। পরপর এই ব্যর্থতা ব্রিটিশ প্রশাসনকে বিষয়টিকে গুরুতর হুমকি হিসেবে বিবেচনা করতে বাধ্য করে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার আলেকজান্ডার ও মেজর স্কটের নেতৃত্বে পদাতিক, অশ্বারোহী ও বন্দুকধারী সৈন্যদের সমন্বয়ে এক বিশাল সামরিক বাহিনী তিতুমীরের বিরুদ্ধে প্রেরণ করে। ১৮৩১ সালের ১৯ নভেম্বর নারিকেলবেড়িয়ায় এক তুমুল ও চূড়ান্ত যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে তিতুমীরের অনুচরবাহিনী পরাজিত হয়। ইংরেজ সৈন্যরা নিহত বিদ্রোহীদের দেহ পুড়িয়ে দেয়। তিতুমীর ও তার অনুসারীদের বাড়িঘর লুণ্ঠন এবং সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। তিতুমীরের প্রধান সহচর গোলাম মাসুমকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এছাড়া ১১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ১২৮ জনকে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। বীর তিতুমীর এই অসম যুদ্ধে শহীদ হন।
সমসাময়িক সরকারি নথি থেকে জানা যায়, তিতুমীরের আন্দোলন প্রথম দিকে মূলত স্থানীয় সমস্যাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল। বারাসত ও নদীয়া অঞ্চলের কৃষক ও তাঁতিরা ছিল এই আন্দোলনের প্রধান অংশগ্রহণকারী। শুরুতে এর সঙ্গে প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক লক্ষ্য জড়িত ছিল না বলেই প্রতীয়মান হয়। তবে পরবর্তী সময়ে ধারণা জন্ম নেয়, ব্রিটিশ শাসন উৎখাত করে মুসলিম শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠাই তিতুমীরের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য ছিল। ঐতিহাসিক ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টারও তিতুমীরের আন্দোলনের মধ্যে রাজনৈতিক অভিপ্রায়ের উপস্থিতি লক্ষ করেছিলেন। প্রাথমিক পর্যায়ে মুসলমান সমাজের ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কার সাধনই ছিল তিতুমীরের লক্ষ্য। এই সংস্কার প্রচেষ্টার ফলে মুসলমান কৃষকসমাজ ক্রমে সংঘবদ্ধ হয়ে ওঠে। তাদের এই সংগঠিত অবস্থান জমিদারদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করে এবং তারা তিতুমীরের অনুসারীদের ওপর নানা ধরনের নিপীড়ন শুরু করে। এরই পরিণতিতে সংস্কারমূলক উদ্যোগ ধীরে ধীরে প্রজা-আন্দোলনে রূপ নেয়। তিতুমীরের নেতৃত্বে প্রজারা জমিদারদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়। এই সংগ্রামে তারা উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে এবং স্থানীয় বহু জমিদারের অধীনস্থ গ্রাম তাদের নিয়ন্ত্রণে আসে। এই সাফল্য তাদের আত্মবিশ্বাস ও সাহস বহুগুণে বাড়িয়ে দেয় এবং তাদের মনে বৃহত্তর আকাঙ্ক্ষার সঞ্চার ঘটে। পরবর্তীকালে তিতুমীর নিজের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে এক ধরনের স্বাধীন শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। ফলে তার প্রজা-আন্দোলন কেবল একটি সীমিত প্রতিবাদে আবদ্ধ থাকেনি, তা এক গণবিদ্রোহে রূপ নেয়। কৃষক ও তাঁতিরা জমিদার এবং নীলকরদের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। অত্যাচার, অবিচার ও অপমানের বিরুদ্ধে এবং এক শক্তিশালী শাসনযন্ত্রের মোকাবিলায় এই সংগ্রামের মাধ্যমে প্রজারা নিজেদের আত্মসম্মান ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রয়াস চালায়। তিতুমীর তাই কেবল একজন সংস্কারক নন, তিনি ছিলেন কৃষক বিদ্রোহের মহানায়ক এবং ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের এক অমর পথিকৃৎ।
রিপোর্টারের নাম 
























