ঢাকা ১০:২০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে বিতর্কিত বই নির্বাচন: সাবেক পরিচালকের বিরুদ্ধে জুলাই অভ্যুত্থানবিরোধী অবস্থানের অভিযোগ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:৫৯:২৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৮ বার পড়া হয়েছে

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালকের পদ থেকে আফসানা বেগমকে অব্যাহতি দেওয়াকে কেন্দ্র করে সংস্কৃতি অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ দেশের খ্যাতিমান লেখক ও সাহিত্যিকরা অভিযোগ করছেন, একটি চিহ্নিত মহল এই অব্যাহতিকে ঘিরে অহেতুক বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করছে। তাঁদের মতে, গত দেড় বছরে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে জুলাই অভ্যুত্থানের নীতির প্রতিফলন হয়নি; বরং সাবেক শাসকগোষ্ঠীর বন্দনা এবং বাঙালি চেতনার বয়ান আরও জোরদার করার চেষ্টা হয়েছে।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ব্যাপক অনিয়ম ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জুলাই অভ্যুত্থানবিরোধী অবস্থান স্পষ্ট করায় সম্প্রতি জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক আফসানা বেগমের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করে সরকার। একই দিনে প্রখ্যাত সাহিত্যিক, কবি ও প্রবন্ধকার সাখাওয়াত টিপুকে এ পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। আফসানা বেগমের নিয়োগ বাতিলের পর সাবেক সরকারের সুবিধাভোগী ও বামপন্থি বুদ্ধিজীবী হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিরা অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মাধ্যমে বিষোদগার করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর উদ্যোগে জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে বিভিন্ন কার্যক্রমকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তারা।

মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান, যা সারা দেশে বই পাঠের কার্যক্রমকে উৎসাহিত করে। সরকার নিজ উদ্যোগে বই কিনে বিভিন্ন বেসরকারি লাইব্রেরিতে অনুদান হিসেবে পাঠায়। ‘বই নির্বাচন কমিটি’ নামে একটি কমিটির মাধ্যমে এই কাজ সমন্বয় করা হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অনুদানের জন্য বই নির্বাচন কমিটি কর্তৃক নির্বাচিত চূড়ান্ত তালিকা পর্যালোচনা করলে সাবেক পরিচালক আফসানা বেগমের নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেটের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, এই কমিটিতে মোশাহিদা সুলতানা (ঋতু) এবং আহমাদ মোস্তফা কামাল সদস্য হিসেবে ছিলেন। মোশাহিদার একটি এবং কামালের তিনটি বই ক্রয় তালিকায় স্থান পেয়েছে। কমিটির সদস্য হয়ে নিজেদের বই নিজে তালিকাভুক্ত করা প্রচলিত রীতি ও নৈতিকতাবিরোধী। এছাড়া, পুরোনো বাঙালি জাতীয়তাবাদের বয়ান উৎপাদনকারী বই রাখা হয়েছে কেনার তালিকায়। বাঙালি জাতীয়তাবাদ নিয়ে জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর বইও তালিকায় স্থান পেয়েছে। এমনকি দীর্ঘদিন ধরে সাবেক শাসকগোষ্ঠীর ধারক ও বাহক হিসেবে পরিচিত কবি নির্মলেন্দু গুণ, সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন, ইমতিয়ার শামীম, অদিতি ফালগুনী, কুমার চক্রবর্তী, স্বকৃত নোমান, মোজাফফর হোসেনদের একাধিক বই রাখা হয়েছে। এদের কারো কারো চার-পাঁচটি বইও কেনার তালিকায় স্থান পেয়েছে।

কর্মকর্তারা আরও জানান, জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষে সক্রিয়ভাবে অবস্থান নেওয়া ব্রাত্য রাইসু, রিফাত হাসান, পিনাকী ভট্টাচার্য, রক মনু, মাহবুব মোর্শেদ, গাজী তানজিয়া, সালাহ উদ্দিন শুভ্র, রোবায়েত হাসান, ইমরুল হাসান, এহসান মাহমুদ, তুহিন খান, মীর হুজাইফা মাহমুদ, মৃদুল মাহবুব, এহসান মাহমুদ ও মাহমুদুর রহমানের মতো অনেকের বই বাদ পড়েছে। তালিকায় শাপলা ট্র‍্যাজেডি নিয়ে কোনো বই নেই, অথচ এ বিষয়ে অন্তত দশটি বই প্রকাশিত হয়েছে। পিলখানা ট্র্যাজেডি নিয়েও বই প্রকাশিত হয়েছে, কিন্তু ‘সাজ্জাদ-আফসানা’ সিন্ডিকেটের কাছে এসব বই গুরুত্ব পায়নি।

তারা আরও বলেন, এবারের বইয়ের তালিকায় মালেকা বেগম, সাজ্জাদ শরিফ, দন্তস্য রওশন ও জাহিদ রেজা নূরের একাধিক বই রয়েছে। অথচ ফরহাদ মজহারের বই আছে মাত্র একটি। তবে বদরুদ্দীন উমর, ফরহাদ মজহার, সলিমুল্লাহ খান, ফাহাম আব্দুস সালামের বই উপদেষ্টার বিশেষ অনুরোধে রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে, আনু মুহাম্মদের বই রয়েছে অন্তত চারটি এবং আজফার হোসেন ও কল্লোল মোস্তফার একাধিক বইও তালিকায় স্থান পেয়েছে।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, আফসানা বেগমের বিশেষ সিন্ডিকেটের পছন্দের কিছু প্রকাশককে বিশেষ সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ওই সব প্রকাশকের নিজস্ব বয়ান অনুযায়ী বই নির্বাচন করা হয়েছে। পুরোনো আমলের ‘ভোলগা থেকে গঙ্গা’র মতো বইও রাখা হয়েছে তালিকায়। অথচ সাবেক সরকারের ১৫ বছরের দুঃশাসনের সমালোচনা করে লেখা কোনো বই যেমন তালিকায় নাই, তেমনি ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত শেখ মুজিবের শাসনামল ও বাকশালের সমালোচনা করে লেখা বইও রাখা হয়নি। প্রহসনের নির্বাচন নিয়ে মাহবুব তালুকদারের বইটি জমা দিলেও তা প্রত্যাখ্যান করা হয়। সাংবাদিক মাহফুজুল্লাহ ও মাহবুবুল্লাহর লেখা বই জমা দিলেও তালিকায় সেগুলো রাখা হয়নি বলেও জানান মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। একজন কর্মকর্তা জানান, বাছাই করা বইয়ের তালিকায় জিয়াউর রহমানের ওপর লেখা বইও কৌশলে বাদ দেওয়া হয়েছে।

সূত্র আরও জানায়, বই বাছাইয়ের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারে থাকা ২০ ভাগের নিয়মটিও বাতিলের প্রস্তাব করেছিলেন সাবেক পরিচালক আফসানা বেগম। এর মাধ্যমে তিনি মূলত মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারকে চ্যালেঞ্জ করেছেন।

আফসানা বেগমের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল ও তার ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়ে জানতে চাইলে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মফিদুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া ও বাতিল করার বিষয়টি সরকারের একটি রুটিন কাজ। আইন মেনেই আফসানা বেগমের নিয়োগ বাতিল হয়েছে। এটি নিয়ে এর চেয়ে বেশি কিছু বলার নেই। আমরা সবাই সরকারের নীতি বাস্তবায়ন করি। দায়িত্বে থেকে সরকারের নীতির বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার এখতিয়ার কারো নেই। তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকারের ভিত্তি হচ্ছে দেশের জনগণ। একটি সফল অভ্যুত্থানের পর জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এ সরকারকে দায়িত্ব দিয়েছে জুলাই অভ্যুত্থানের আলোকে গৃহীত নীতি বাস্তবায়ন করতে। আফসানা বেগম এটা জেনে ও বুঝেই নিয়োগপত্র গ্রহণ করেছেন। অথচ তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই এ নীতিকে অবজ্ঞা করেছেন। আফসানা বেগমের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিলের পর তিনিসহ কেউ কেউ বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে জনগণকে ভুল বার্তা দিচ্ছেন বলেও মন্তব্য করেন এই সচিব।

এসব অভিযোগের বিষয়ে আফসানা বেগম গণমাধ্যমকে বলেন, আমাদের যে নীতিমালা ছিল তার বাইরে একচুলও আমরা এদিক-ওদিক যাইনি। সুতরাং এখানে কোনো অনিয়ম ছিল—তা কেউ বের করতে পারবে না—তা আমি নিশ্চিত। তিনি বলেন, বই সিলেকশন কমিটির আমি একজন সদস্য। এখানে মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি ছাড়াও গণগ্রন্থাগার, বাংলা একাডেমি, আর্কাইভ, কপিরাইট—এসব প্রতিষ্ঠান থেকে একজন করে পরিচালক ছিলেন। দুজন কথা সাহিত্যিক, দুজন অধ্যাপক ছিলেন—যেখানে এত লোক ছিল। তারা কেউ চায়নি নীতিমালার বাইরে যেতে।

আফসানা বেগম জানান, নীতিমালা অনুযায়ী প্রকাশকদের কাছ থেকে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে একটি তালিকা চাওয়া হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তালিকা নিয়ে কথা ওঠে। সে সময় গ্রন্থকেন্দ্রের বিজ্ঞপ্তিতে ছিল, ৫০টি বই যে কোনো সময়ের যে কোনো প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান দিতে পারে। সেখানে তারা (প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান) যে বই দেবেন, সেগুলোর ভেতর থেকে বই নির্বাচন কমিটিকে বই নির্বাচন করতে হবে। যদি কোনো প্রতিষ্ঠান তার তালিকায় কোনো নির্দিষ্ট লেখকের বই না দিয়ে থাকে, তাহলে সে বই নেওয়ার কোনো এখতিয়ার ওই কমিটির নেই। তিনি আরও জানান, এই কমিটি বইয়ের তালিকা শুধু সুপারিশ করে। বই অনুমোদন করেন মন্ত্রণালয়। তালিকা থেকে বই কেটে দেওয়ার এখতিয়ার তাদেরই। সে সময় যাদের বই নেওয়া নিয়ে কথা উঠেছিল, তাদের বই সচিব কেন কেটে দেননি—এই প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, তাহলে যে বইগুলো নিয়ে বিতর্ক, সেগুলোর দায়টা অনুমোদনকারীদের ওপরই যাবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন সমাপ্ত: ২৫ কার্যদিবসে রেকর্ড ৯৪ বিল পাস

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে বিতর্কিত বই নির্বাচন: সাবেক পরিচালকের বিরুদ্ধে জুলাই অভ্যুত্থানবিরোধী অবস্থানের অভিযোগ

আপডেট সময় : ০৮:৫৯:২৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালকের পদ থেকে আফসানা বেগমকে অব্যাহতি দেওয়াকে কেন্দ্র করে সংস্কৃতি অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ দেশের খ্যাতিমান লেখক ও সাহিত্যিকরা অভিযোগ করছেন, একটি চিহ্নিত মহল এই অব্যাহতিকে ঘিরে অহেতুক বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করছে। তাঁদের মতে, গত দেড় বছরে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে জুলাই অভ্যুত্থানের নীতির প্রতিফলন হয়নি; বরং সাবেক শাসকগোষ্ঠীর বন্দনা এবং বাঙালি চেতনার বয়ান আরও জোরদার করার চেষ্টা হয়েছে।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ব্যাপক অনিয়ম ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জুলাই অভ্যুত্থানবিরোধী অবস্থান স্পষ্ট করায় সম্প্রতি জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক আফসানা বেগমের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করে সরকার। একই দিনে প্রখ্যাত সাহিত্যিক, কবি ও প্রবন্ধকার সাখাওয়াত টিপুকে এ পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। আফসানা বেগমের নিয়োগ বাতিলের পর সাবেক সরকারের সুবিধাভোগী ও বামপন্থি বুদ্ধিজীবী হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিরা অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মাধ্যমে বিষোদগার করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর উদ্যোগে জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে বিভিন্ন কার্যক্রমকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তারা।

মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান, যা সারা দেশে বই পাঠের কার্যক্রমকে উৎসাহিত করে। সরকার নিজ উদ্যোগে বই কিনে বিভিন্ন বেসরকারি লাইব্রেরিতে অনুদান হিসেবে পাঠায়। ‘বই নির্বাচন কমিটি’ নামে একটি কমিটির মাধ্যমে এই কাজ সমন্বয় করা হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অনুদানের জন্য বই নির্বাচন কমিটি কর্তৃক নির্বাচিত চূড়ান্ত তালিকা পর্যালোচনা করলে সাবেক পরিচালক আফসানা বেগমের নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেটের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, এই কমিটিতে মোশাহিদা সুলতানা (ঋতু) এবং আহমাদ মোস্তফা কামাল সদস্য হিসেবে ছিলেন। মোশাহিদার একটি এবং কামালের তিনটি বই ক্রয় তালিকায় স্থান পেয়েছে। কমিটির সদস্য হয়ে নিজেদের বই নিজে তালিকাভুক্ত করা প্রচলিত রীতি ও নৈতিকতাবিরোধী। এছাড়া, পুরোনো বাঙালি জাতীয়তাবাদের বয়ান উৎপাদনকারী বই রাখা হয়েছে কেনার তালিকায়। বাঙালি জাতীয়তাবাদ নিয়ে জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর বইও তালিকায় স্থান পেয়েছে। এমনকি দীর্ঘদিন ধরে সাবেক শাসকগোষ্ঠীর ধারক ও বাহক হিসেবে পরিচিত কবি নির্মলেন্দু গুণ, সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন, ইমতিয়ার শামীম, অদিতি ফালগুনী, কুমার চক্রবর্তী, স্বকৃত নোমান, মোজাফফর হোসেনদের একাধিক বই রাখা হয়েছে। এদের কারো কারো চার-পাঁচটি বইও কেনার তালিকায় স্থান পেয়েছে।

কর্মকর্তারা আরও জানান, জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষে সক্রিয়ভাবে অবস্থান নেওয়া ব্রাত্য রাইসু, রিফাত হাসান, পিনাকী ভট্টাচার্য, রক মনু, মাহবুব মোর্শেদ, গাজী তানজিয়া, সালাহ উদ্দিন শুভ্র, রোবায়েত হাসান, ইমরুল হাসান, এহসান মাহমুদ, তুহিন খান, মীর হুজাইফা মাহমুদ, মৃদুল মাহবুব, এহসান মাহমুদ ও মাহমুদুর রহমানের মতো অনেকের বই বাদ পড়েছে। তালিকায় শাপলা ট্র‍্যাজেডি নিয়ে কোনো বই নেই, অথচ এ বিষয়ে অন্তত দশটি বই প্রকাশিত হয়েছে। পিলখানা ট্র্যাজেডি নিয়েও বই প্রকাশিত হয়েছে, কিন্তু ‘সাজ্জাদ-আফসানা’ সিন্ডিকেটের কাছে এসব বই গুরুত্ব পায়নি।

তারা আরও বলেন, এবারের বইয়ের তালিকায় মালেকা বেগম, সাজ্জাদ শরিফ, দন্তস্য রওশন ও জাহিদ রেজা নূরের একাধিক বই রয়েছে। অথচ ফরহাদ মজহারের বই আছে মাত্র একটি। তবে বদরুদ্দীন উমর, ফরহাদ মজহার, সলিমুল্লাহ খান, ফাহাম আব্দুস সালামের বই উপদেষ্টার বিশেষ অনুরোধে রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে, আনু মুহাম্মদের বই রয়েছে অন্তত চারটি এবং আজফার হোসেন ও কল্লোল মোস্তফার একাধিক বইও তালিকায় স্থান পেয়েছে।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, আফসানা বেগমের বিশেষ সিন্ডিকেটের পছন্দের কিছু প্রকাশককে বিশেষ সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ওই সব প্রকাশকের নিজস্ব বয়ান অনুযায়ী বই নির্বাচন করা হয়েছে। পুরোনো আমলের ‘ভোলগা থেকে গঙ্গা’র মতো বইও রাখা হয়েছে তালিকায়। অথচ সাবেক সরকারের ১৫ বছরের দুঃশাসনের সমালোচনা করে লেখা কোনো বই যেমন তালিকায় নাই, তেমনি ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত শেখ মুজিবের শাসনামল ও বাকশালের সমালোচনা করে লেখা বইও রাখা হয়নি। প্রহসনের নির্বাচন নিয়ে মাহবুব তালুকদারের বইটি জমা দিলেও তা প্রত্যাখ্যান করা হয়। সাংবাদিক মাহফুজুল্লাহ ও মাহবুবুল্লাহর লেখা বই জমা দিলেও তালিকায় সেগুলো রাখা হয়নি বলেও জানান মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। একজন কর্মকর্তা জানান, বাছাই করা বইয়ের তালিকায় জিয়াউর রহমানের ওপর লেখা বইও কৌশলে বাদ দেওয়া হয়েছে।

সূত্র আরও জানায়, বই বাছাইয়ের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারে থাকা ২০ ভাগের নিয়মটিও বাতিলের প্রস্তাব করেছিলেন সাবেক পরিচালক আফসানা বেগম। এর মাধ্যমে তিনি মূলত মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারকে চ্যালেঞ্জ করেছেন।

আফসানা বেগমের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল ও তার ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়ে জানতে চাইলে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মফিদুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া ও বাতিল করার বিষয়টি সরকারের একটি রুটিন কাজ। আইন মেনেই আফসানা বেগমের নিয়োগ বাতিল হয়েছে। এটি নিয়ে এর চেয়ে বেশি কিছু বলার নেই। আমরা সবাই সরকারের নীতি বাস্তবায়ন করি। দায়িত্বে থেকে সরকারের নীতির বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার এখতিয়ার কারো নেই। তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকারের ভিত্তি হচ্ছে দেশের জনগণ। একটি সফল অভ্যুত্থানের পর জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এ সরকারকে দায়িত্ব দিয়েছে জুলাই অভ্যুত্থানের আলোকে গৃহীত নীতি বাস্তবায়ন করতে। আফসানা বেগম এটা জেনে ও বুঝেই নিয়োগপত্র গ্রহণ করেছেন। অথচ তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই এ নীতিকে অবজ্ঞা করেছেন। আফসানা বেগমের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিলের পর তিনিসহ কেউ কেউ বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে জনগণকে ভুল বার্তা দিচ্ছেন বলেও মন্তব্য করেন এই সচিব।

এসব অভিযোগের বিষয়ে আফসানা বেগম গণমাধ্যমকে বলেন, আমাদের যে নীতিমালা ছিল তার বাইরে একচুলও আমরা এদিক-ওদিক যাইনি। সুতরাং এখানে কোনো অনিয়ম ছিল—তা কেউ বের করতে পারবে না—তা আমি নিশ্চিত। তিনি বলেন, বই সিলেকশন কমিটির আমি একজন সদস্য। এখানে মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি ছাড়াও গণগ্রন্থাগার, বাংলা একাডেমি, আর্কাইভ, কপিরাইট—এসব প্রতিষ্ঠান থেকে একজন করে পরিচালক ছিলেন। দুজন কথা সাহিত্যিক, দুজন অধ্যাপক ছিলেন—যেখানে এত লোক ছিল। তারা কেউ চায়নি নীতিমালার বাইরে যেতে।

আফসানা বেগম জানান, নীতিমালা অনুযায়ী প্রকাশকদের কাছ থেকে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে একটি তালিকা চাওয়া হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তালিকা নিয়ে কথা ওঠে। সে সময় গ্রন্থকেন্দ্রের বিজ্ঞপ্তিতে ছিল, ৫০টি বই যে কোনো সময়ের যে কোনো প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান দিতে পারে। সেখানে তারা (প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান) যে বই দেবেন, সেগুলোর ভেতর থেকে বই নির্বাচন কমিটিকে বই নির্বাচন করতে হবে। যদি কোনো প্রতিষ্ঠান তার তালিকায় কোনো নির্দিষ্ট লেখকের বই না দিয়ে থাকে, তাহলে সে বই নেওয়ার কোনো এখতিয়ার ওই কমিটির নেই। তিনি আরও জানান, এই কমিটি বইয়ের তালিকা শুধু সুপারিশ করে। বই অনুমোদন করেন মন্ত্রণালয়। তালিকা থেকে বই কেটে দেওয়ার এখতিয়ার তাদেরই। সে সময় যাদের বই নেওয়া নিয়ে কথা উঠেছিল, তাদের বই সচিব কেন কেটে দেননি—এই প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, তাহলে যে বইগুলো নিয়ে বিতর্ক, সেগুলোর দায়টা অনুমোদনকারীদের ওপরই যাবে।