ঢাকা ১০:১৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬

নির্বাচনি প্রচারে এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার: নীতিমালা না থাকায় বাড়ছে অস্থিরতা ও ডিজিটাল ঝুঁকি

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০২:৪০:২৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৭ বার পড়া হয়েছে

দেশের আসন্ন সাধারণ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) প্রযুক্তির অপব্যবহার আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআই ব্যবহার করে তৈরি করা বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর ভিডিও ও কন্টেন্ট ছড়িয়ে দিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের জড়িয়ে তৈরি করা এসব ‘ডিপফেক’ ভিডিও সামাজিক স্থিতিশীলতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সম্প্রতি ‘আপা ফিরবে’ নামক একটি ফেসবুক পেজে এআই প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি একটি ভিডিও আপলোড করা হয়। সেখানে দেখা যায়, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেনের সঙ্গে বৈঠক করছেন। ওই ভিডিওতে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করকেও উপস্থিত থাকতে দেখা যায়। ভিডিওটিতে দাবি করা হয়, বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন স্থগিত করতে যুক্তরাষ্ট্র উদ্যোগ নিচ্ছে। তবে ফ্যাক্ট চেকিং বা তথ্য যাচাইয়ে দেখা গেছে, ভিডিওটি সম্পূর্ণ ভুয়া এবং প্রযুক্তির কারসাজিতে তৈরি। জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াতে একটি বিশেষ চক্র পরিকল্পিতভাবে এটি ছড়িয়েছে।

তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল ভিডিও নয়, বরং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের লোগো ব্যবহার করে ভুয়া ‘ফটোকার্ড’ তৈরি করেও অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। সাধারণ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের পক্ষে এসব নকল কন্টেন্ট চেনা কঠিন হয়ে পড়ছে, যা দ্রুত গুজব ছড়াতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। দেশের প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর বড় একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় হওয়ায় এই ঝুঁকির মাত্রা আরও বেড়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, অসাধু চক্রগুলো মূলধারার বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের সংবাদ পাঠকদের ভিডিও এডিট করে তাতে কৃত্রিম কণ্ঠস্বর জুড়ে দিচ্ছে। এসব ভিডিওতে নির্বাচন স্থগিত বা বাতিলের মতো স্পর্শকাতর তথ্য প্রচার করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এআই চরিত্রগুলো সাধারণ ভোটারের বেশ ধরে নির্দিষ্ট প্রতীকের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে কিংবা রাজনৈতিক নেতাদের নামে কুরুচিপূর্ণ ও মানহানিকর বক্তব্য ছড়াচ্ছে।

এ বিষয়ে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক জানান, এ ধরনের ভুয়া ভিডিওর কারণে সাধারণ মানুষ সঠিক তথ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং সমাজে অস্থিরতা বাড়ছে। তিনি মনে করেন, বিটিআরসি এবং পুলিশের সিআইডি’র মতো সংস্থাগুলোর দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

এদিকে, এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে দেশে এখনও কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এ সংক্রান্ত নীতিমালার উদ্যোগ নিলেও তা এখনো চূড়ান্ত রূপ পায়নি। ইউনেস্কোর কারিগরি সহায়তায় নীতিমালা তৈরির কথা থাকলেও এর বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আইসিটি মন্ত্রণালয় বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। তবে এই মুহূর্তে এআই সংক্রান্ত জটিলতা মোকাবিলায় পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ জনবলের অভাব রয়েছে।

ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজনীতি, দুর্যোগ এবং আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে এআই-নির্মিত অপতথ্যের বিস্তার গত কয়েক মাসে বহুগুণ বেড়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলোর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে এআই-জেনারেটেড ছবি ও ভিডিওর ব্যবহার সবচেয়ে বেশি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাইবার মাধ্যমে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার যেকোনো অপচেষ্টা রুখতে তারা তৎপর রয়েছেন। তবে ভুয়া ভিডিওর মাধ্যমে প্রতারণা বা ক্ষতির শিকার হলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ পেলে ভিডিওর ফরেনসিক পরীক্ষা শেষে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন সমাপ্ত: ২৫ কার্যদিবসে রেকর্ড ৯৪ বিল পাস

নির্বাচনি প্রচারে এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার: নীতিমালা না থাকায় বাড়ছে অস্থিরতা ও ডিজিটাল ঝুঁকি

আপডেট সময় : ০২:৪০:২৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬

দেশের আসন্ন সাধারণ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) প্রযুক্তির অপব্যবহার আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআই ব্যবহার করে তৈরি করা বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর ভিডিও ও কন্টেন্ট ছড়িয়ে দিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের জড়িয়ে তৈরি করা এসব ‘ডিপফেক’ ভিডিও সামাজিক স্থিতিশীলতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সম্প্রতি ‘আপা ফিরবে’ নামক একটি ফেসবুক পেজে এআই প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি একটি ভিডিও আপলোড করা হয়। সেখানে দেখা যায়, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেনের সঙ্গে বৈঠক করছেন। ওই ভিডিওতে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করকেও উপস্থিত থাকতে দেখা যায়। ভিডিওটিতে দাবি করা হয়, বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন স্থগিত করতে যুক্তরাষ্ট্র উদ্যোগ নিচ্ছে। তবে ফ্যাক্ট চেকিং বা তথ্য যাচাইয়ে দেখা গেছে, ভিডিওটি সম্পূর্ণ ভুয়া এবং প্রযুক্তির কারসাজিতে তৈরি। জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াতে একটি বিশেষ চক্র পরিকল্পিতভাবে এটি ছড়িয়েছে।

তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল ভিডিও নয়, বরং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের লোগো ব্যবহার করে ভুয়া ‘ফটোকার্ড’ তৈরি করেও অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। সাধারণ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের পক্ষে এসব নকল কন্টেন্ট চেনা কঠিন হয়ে পড়ছে, যা দ্রুত গুজব ছড়াতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। দেশের প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর বড় একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় হওয়ায় এই ঝুঁকির মাত্রা আরও বেড়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, অসাধু চক্রগুলো মূলধারার বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের সংবাদ পাঠকদের ভিডিও এডিট করে তাতে কৃত্রিম কণ্ঠস্বর জুড়ে দিচ্ছে। এসব ভিডিওতে নির্বাচন স্থগিত বা বাতিলের মতো স্পর্শকাতর তথ্য প্রচার করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এআই চরিত্রগুলো সাধারণ ভোটারের বেশ ধরে নির্দিষ্ট প্রতীকের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে কিংবা রাজনৈতিক নেতাদের নামে কুরুচিপূর্ণ ও মানহানিকর বক্তব্য ছড়াচ্ছে।

এ বিষয়ে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক জানান, এ ধরনের ভুয়া ভিডিওর কারণে সাধারণ মানুষ সঠিক তথ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং সমাজে অস্থিরতা বাড়ছে। তিনি মনে করেন, বিটিআরসি এবং পুলিশের সিআইডি’র মতো সংস্থাগুলোর দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

এদিকে, এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে দেশে এখনও কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এ সংক্রান্ত নীতিমালার উদ্যোগ নিলেও তা এখনো চূড়ান্ত রূপ পায়নি। ইউনেস্কোর কারিগরি সহায়তায় নীতিমালা তৈরির কথা থাকলেও এর বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আইসিটি মন্ত্রণালয় বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। তবে এই মুহূর্তে এআই সংক্রান্ত জটিলতা মোকাবিলায় পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ জনবলের অভাব রয়েছে।

ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজনীতি, দুর্যোগ এবং আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে এআই-নির্মিত অপতথ্যের বিস্তার গত কয়েক মাসে বহুগুণ বেড়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলোর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে এআই-জেনারেটেড ছবি ও ভিডিওর ব্যবহার সবচেয়ে বেশি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাইবার মাধ্যমে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার যেকোনো অপচেষ্টা রুখতে তারা তৎপর রয়েছেন। তবে ভুয়া ভিডিওর মাধ্যমে প্রতারণা বা ক্ষতির শিকার হলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ পেলে ভিডিওর ফরেনসিক পরীক্ষা শেষে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।