জীবাশ্ম জ্বালানির বর্তমান ব্যবহার অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যা চরম উষ্ণতার শিকার হবে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত এক যুগান্তকারী গবেষণা এমনই এক উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এনেছে। যুক্তরাজ্যের মর্যাদাপূর্ণ বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার সাসটেইনেবিলিটি’-তে প্রকাশিত এই গবেষণায় বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উষ্ণতা বৃদ্ধির এই ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম উষ্ণতম অঞ্চল হিসেবে পরিগণিত হতে পারে।
গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় ২৩ শতাংশ মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সৃষ্ট অতিরিক্ত উষ্ণতার প্রভাব অনুভব করেছিল। কিন্তু ২০৫০ সাল নাগাদ এই সংখ্যা ৪১ শতাংশে উন্নীত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর ফলে প্রায় ৩৭৯ কোটি মানুষ চরম উষ্ণতার ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।
শিল্প-পূর্ব যুগের তাপমাত্রার চেয়ে বৈশ্বিক তাপমাত্রা দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে। পরিবেশ বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, অপরিকল্পিতভাবে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও কয়লার ব্যবহার আগামী ২৫ বছরের মধ্যেই এই তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করতে পারে। ২০১০ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৫৪ কোটি মানুষ অতিরিক্ত উষ্ণতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এই শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এই সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গবেষণা প্রকল্পটির প্রধান, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং সায়েন্সের সহযোগী অধ্যাপক ড. জিসাস লিজানা, জাতীয় গড় তাপমাত্রা এবং মানুষের বাস্তব জীবনযাত্রার মধ্যে স্পষ্ট বৈসাদৃশ্য তুলে ধরেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ভারত, নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোতে বসবাসকারী বিপুল জনগোষ্ঠী চরম উষ্ণতার মধ্যে জীবনধারণের মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছেন।
ড. লিজানা আরও ব্যাখ্যা করেন যে, এই দেশগুলোর কিছু অঞ্চলে হয়তো স্থানীয়ভাবে তাপমাত্রা কিছুটা কম থাকতে পারে, কিন্তু জনবহুল অঞ্চলগুলোর বেশিরভাগেই জলবায়ু পরিমাপের একক ‘কুলিং ডিগ্রি ডে’ (সিডিডি) তিন হাজার ছাড়িয়ে যাবে। সিডিডি হলো এমন একটি পরিমাপক যা কোনো স্থানের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা স্বাভাবিক ও নিরাপদ রাখতে প্রয়োজনীয় শক্তি ব্যয়ের হিসাব দেয়। সিডিডি বৃদ্ধির এই প্রবণতা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রসহ বিভিন্ন শীতলীকরণ সরঞ্জামের চাহিদা বৃদ্ধির ইঙ্গিত বহন করে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে যে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে তীব্র শৈত্যপ্রবাহের ঘটনাগুলো উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে। ‘প্রচণ্ড শীতল’ অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের হার ১৪ শতাংশ থেকে কমে সাত শতাংশে নেমে আসবে। এর বিপরীতে, মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্র, নাইজেরিয়া, দক্ষিণ সুদান, লাওস এবং ব্রাজিলের মতো দেশগুলোতে শীতলীকরণ সরঞ্জামের প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি বাড়বে। অন্যদিকে, কানাডা, রাশিয়া, ফিনল্যান্ড, সুইডেন এবং নরওয়ের মতো দেশগুলোতে ঘরের অভ্যন্তরে উষ্ণতা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা আরও কমবে।
ড. লিজানা জোর দিয়ে বলেন, “আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে যে, ১.৫ ডিগ্রি তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে শীতলীকরণ ও উষ্ণীকরণের উপযোগিতার ক্ষেত্রে বিপুল পরিবর্তন সাধিত হবে। এর ফলে আমাদের আগে থেকেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।” এই গবেষণা বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
রিপোর্টারের নাম 
























