ঢাকা ০৯:৪৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ও গণভোট: প্রচারে সরব জামায়াত-এনসিপি, তৃণমূল পর্যায়ে বিভ্রান্তিতে বিএনপি

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:৫৬:১১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৭ বার পড়া হয়েছে

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একই দিনে জুলাই বিপ্লবের চেতনা ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের লক্ষ্য বাস্তবায়নে আয়োজিত হবে ঐতিহাসিক গণভোট। তবে নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘনিয়ে এলেও প্রচারের মাঠে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ভিন্ন চিত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সংসদ নির্বাচন নিয়ে দলগুলোর ব্যাপক তৎপরতা থাকলেও গণভোটের প্রশ্নে অনেক দলই এখনো অনেকটা নীরব। বিশেষ করে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ের পক্ষে বিএনপির আনুষ্ঠানিক সমর্থন থাকলেও প্রচারের ক্ষেত্রে দলটির তৃণমূল পর্যায়ে চরম বিভ্রান্তি বিরাজ করছে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) ১১ দলীয় জোট গণভোটের পক্ষে দেশজুড়ে জোরদার প্রচারণা চালাচ্ছে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিলেও কেন্দ্র থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা না পাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীদের পক্ষে ভোট চাইতে গিয়ে ভোটারদের গণভোট সংক্রান্ত প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের। অনেক ক্ষেত্রে প্রার্থীরা কেবল দলীয় প্রতীক ‘ধানের শীষ’-এর প্রচার চালালেও গণভোটের বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছেন। দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কেউ কেউ জানিয়েছেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর চূড়ান্ত রূপরেখা ও সংস্কারের কিছু বিষয়ে তাদের দ্বিমত থাকায় প্রচারের ক্ষেত্রে তারা কিছুটা কৌশলী অবস্থানে রয়েছেন। তবে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ শীর্ষ নেতারা বিভিন্ন সময়ে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ দেওয়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরলেও মাঠ পর্যায়ে এর কোনো সমন্বিত প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।

বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রচারণায়। প্রতিটি নির্বাচনী জনসভা ও গণসংযোগে তারা সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার জন্য ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করছে। জোটের প্রার্থীরা তাদের পোস্টার ও লিফলেটে গণভোটের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তুলে ধরছেন। জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান তার প্রতিটি বক্তব্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটকে বিপ্লবের বিজয় হিসেবে অভিহিত করছেন। একইভাবে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সারা দেশে ‘গণভোটের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর’ নিয়োগ করে এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছে। তাদের মতে, জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে এই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়া অপরিহার্য।

এদিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও গণভোটের পক্ষে জনসচেতনতা তৈরিতে ব্যাপক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিশেষ করে তথ্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রচারপত্র বিলি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে ভোটারদের সচেতন করছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিজেও ভিডিও বার্তার মাধ্যমে দেশবাসীকে সংস্কারের পক্ষে রায় দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

উল্লেখ্য, গত ১১ ডিসেম্বর সংসদ নির্বাচনের তফশিলের সাথেই গণভোটের ঘোষণা দেওয়া হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে দীর্ঘ আলোচনার পর প্রণীত ‘জুলাই জাতীয় সনদ, ২০২৫’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই এই গণভোটের আয়োজন। তবে বড় দলগুলোর প্রচারণায় এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব না পাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, রাজনৈতিক দলগুলো যদি গণভোটের বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিয়ে ভোটারদের উদ্বুদ্ধ না করে, তবে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে অনাগ্রহ তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে, বিগত সরকারের সহযোগী হিসেবে পরিচিত জাতীয় পার্টি (জাপা) ও আরও কিছু ছোট দল গণভোটে ‘না’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে ‘না’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। ফলে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে একদিকে যেমন ক্ষমতার পালাবদলের লড়াই হবে, অন্যদিকে গণভোটের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে দেশের ভবিষ্যৎ সংস্কার ও রাষ্ট্রকাঠামোর গতিপথ। সব মিলিয়ে ভোটের মাঠ এখন বহুমুখী রাজনৈতিক মেরুকরণে উত্তপ্ত।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন সমাপ্ত: ২৫ কার্যদিবসে রেকর্ড ৯৪ বিল পাস

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ও গণভোট: প্রচারে সরব জামায়াত-এনসিপি, তৃণমূল পর্যায়ে বিভ্রান্তিতে বিএনপি

আপডেট সময় : ০৮:৫৬:১১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একই দিনে জুলাই বিপ্লবের চেতনা ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের লক্ষ্য বাস্তবায়নে আয়োজিত হবে ঐতিহাসিক গণভোট। তবে নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘনিয়ে এলেও প্রচারের মাঠে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ভিন্ন চিত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সংসদ নির্বাচন নিয়ে দলগুলোর ব্যাপক তৎপরতা থাকলেও গণভোটের প্রশ্নে অনেক দলই এখনো অনেকটা নীরব। বিশেষ করে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ের পক্ষে বিএনপির আনুষ্ঠানিক সমর্থন থাকলেও প্রচারের ক্ষেত্রে দলটির তৃণমূল পর্যায়ে চরম বিভ্রান্তি বিরাজ করছে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) ১১ দলীয় জোট গণভোটের পক্ষে দেশজুড়ে জোরদার প্রচারণা চালাচ্ছে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিলেও কেন্দ্র থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা না পাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীদের পক্ষে ভোট চাইতে গিয়ে ভোটারদের গণভোট সংক্রান্ত প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের। অনেক ক্ষেত্রে প্রার্থীরা কেবল দলীয় প্রতীক ‘ধানের শীষ’-এর প্রচার চালালেও গণভোটের বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছেন। দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কেউ কেউ জানিয়েছেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর চূড়ান্ত রূপরেখা ও সংস্কারের কিছু বিষয়ে তাদের দ্বিমত থাকায় প্রচারের ক্ষেত্রে তারা কিছুটা কৌশলী অবস্থানে রয়েছেন। তবে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ শীর্ষ নেতারা বিভিন্ন সময়ে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ দেওয়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরলেও মাঠ পর্যায়ে এর কোনো সমন্বিত প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।

বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রচারণায়। প্রতিটি নির্বাচনী জনসভা ও গণসংযোগে তারা সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার জন্য ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করছে। জোটের প্রার্থীরা তাদের পোস্টার ও লিফলেটে গণভোটের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তুলে ধরছেন। জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান তার প্রতিটি বক্তব্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটকে বিপ্লবের বিজয় হিসেবে অভিহিত করছেন। একইভাবে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সারা দেশে ‘গণভোটের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর’ নিয়োগ করে এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছে। তাদের মতে, জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে এই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়া অপরিহার্য।

এদিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও গণভোটের পক্ষে জনসচেতনতা তৈরিতে ব্যাপক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিশেষ করে তথ্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রচারপত্র বিলি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে ভোটারদের সচেতন করছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিজেও ভিডিও বার্তার মাধ্যমে দেশবাসীকে সংস্কারের পক্ষে রায় দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

উল্লেখ্য, গত ১১ ডিসেম্বর সংসদ নির্বাচনের তফশিলের সাথেই গণভোটের ঘোষণা দেওয়া হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে দীর্ঘ আলোচনার পর প্রণীত ‘জুলাই জাতীয় সনদ, ২০২৫’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই এই গণভোটের আয়োজন। তবে বড় দলগুলোর প্রচারণায় এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব না পাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, রাজনৈতিক দলগুলো যদি গণভোটের বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিয়ে ভোটারদের উদ্বুদ্ধ না করে, তবে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে অনাগ্রহ তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে, বিগত সরকারের সহযোগী হিসেবে পরিচিত জাতীয় পার্টি (জাপা) ও আরও কিছু ছোট দল গণভোটে ‘না’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে ‘না’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। ফলে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে একদিকে যেমন ক্ষমতার পালাবদলের লড়াই হবে, অন্যদিকে গণভোটের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে দেশের ভবিষ্যৎ সংস্কার ও রাষ্ট্রকাঠামোর গতিপথ। সব মিলিয়ে ভোটের মাঠ এখন বহুমুখী রাজনৈতিক মেরুকরণে উত্তপ্ত।