ঢাকা ০৯:৪৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬

স্মার্টফোনের বাজারে অস্থিরতা: এনইআইআর বাস্তবায়ন ও চিপ সংকটের অজুহাতে লাগামহীন দাম

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৬:৩১:৪৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৮ বার পড়া হয়েছে

দেশের মোবাইল হ্যান্ডসেট বাজারে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা চরম আকার ধারণ করেছে। ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্ট্রার (এনইআইআর) বা অবৈধ হ্যান্ডসেট বন্ধের প্রযুক্তি কার্যকর করা নিয়ে আমদানিকারক ও খুচরা বিক্রেতাদের পাল্টাপাল্টি অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক বাজারে যন্ত্রাংশের দাম বাড়ার অজুহাতে স্মার্টফোনের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

বাজার সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এনইআইআর বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ার পরপরই ‘মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’ (এমআইওবি) ভুক্ত ব্র্যান্ডগুলো তাদের হ্যান্ডসেটের দাম কয়েক দফায় বাড়িয়েছে। এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য বিটিআরসিকে ৪৬ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছে এমআইওবি। বিটিআরসি জানিয়েছে, সরকারি বাজেট না থাকায় রাষ্ট্রের স্বার্থে তারা এই অনুদান গ্রহণ করেছে। তবে সাধারণ ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, একটি নির্দিষ্ট আমদানিকারক গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতেই এই ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, এনইআইআর বাতিলের দাবিতে দীর্ঘ ২০ দিন দোকান বন্ধ রাখার পর সম্প্রতি সারা দেশে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলেছেন গ্রে মার্কেটের ব্যবসায়ীরা। উচ্চ আদালতের রুল এবং রাজনৈতিক আশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে তারা দোকান খুললেও বর্তমানে অফিসিয়াল বা ব্র্যান্ডের হ্যান্ডসেট বিক্রি বন্ধ রেখেছেন। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, এনইআইআর পূর্ণাঙ্গ কার্যকর হলে তাদের গুদামে থাকা কোটি কোটি টাকার আন-অফিসিয়াল ফোন অকেজো হয়ে পড়বে, যা এই খাতকে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলবে। তারা আগামী ১৫ মার্চ পর্যন্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার ঘোষণা দিয়েছেন।

ব্র্যান্ডের মোবাইল ব্যবসায়ীদের দাবি, হঠাৎ করে নয় বরং বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণেই দাম সমন্বয় করা হয়েছে। ২০২৫ সাল থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে মেমোরি চিপের দাম প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এআই-ভিত্তিক ডেটা সেন্টার ও ক্লাউড অবকাঠামোয় মেমোরি চিপের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় স্মার্টফোন শিল্পের জন্য সরবরাহ সীমিত হয়ে পড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ বিশ্ববাজারে। বর্তমানে দেশের বাজারে বিভিন্ন মডেলের স্মার্টফোনের দাম গড়ে ১০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।

রাজধানীর বিভিন্ন বিপণিবিতান ঘুরে দেখা গেছে, নিম্ন ও মধ্যম সারির প্রায় সব ব্র্যান্ডের ফোনের দাম বেড়েছে ১ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। শাওমি, স্যামসাং, ভিভো, রিয়েলমি ও ইনফিনিক্সের মতো জনপ্রিয় ব্র্যান্ডগুলোর বিভিন্ন মডেলের দাম গত ডিসেম্বরের তুলনায় এখন অনেক বেশি। উদাহরণস্বরূপ, ১০ হাজার টাকার ফোন এখন ১৩ হাজার টাকায় এবং ২৮ হাজার টাকার ফোন ৩৩ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। স্যামসাংয়ের অন্তত দুই ডজন মডেলের দাম বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে।

সাধারণ ক্রেতাদের মতে, স্মার্টফোন এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং শিক্ষা, ফ্রিল্যান্সিং ও ডিজিটাল লেনদেনের অপরিহার্য মাধ্যম। এই অবস্থায় কৃত্রিম সংকট বা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দাম বাড়ানো হলে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য বাধাগ্রস্ত হবে। খুচরা বিক্রেতাদের অভিযোগ, মাত্র ১৭টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে এবং এনইআইআর ব্যবস্থাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তারা একচেটিয়া মুনাফা লুটছে।

সার্বিক বিষয়ে আমদানিকারক সমিতির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও যন্ত্রাংশের সংকটের কারণেই দাম বেড়েছে। তবে খুচরা ব্যবসায়ীরা এই যুক্তি মানতে নারাজ। তাদের দাবি, এনইআইআর পূর্ণাঙ্গ চালুর আগে সব পক্ষের স্বার্থ রক্ষা না করলে এই খাতে অস্থিরতা আরও বাড়বে। সব মিলিয়ে একদিকে প্রযুক্তিগত কড়াকড়ি আর অন্যদিকে মূল্যবৃদ্ধি—এই দুইয়ের চাপে পড়ে দেশের স্মার্টফোন বাজার এখন গভীর সংকটে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন সমাপ্ত: ২৫ কার্যদিবসে রেকর্ড ৯৪ বিল পাস

স্মার্টফোনের বাজারে অস্থিরতা: এনইআইআর বাস্তবায়ন ও চিপ সংকটের অজুহাতে লাগামহীন দাম

আপডেট সময় : ০৬:৩১:৪৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬

দেশের মোবাইল হ্যান্ডসেট বাজারে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা চরম আকার ধারণ করেছে। ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্ট্রার (এনইআইআর) বা অবৈধ হ্যান্ডসেট বন্ধের প্রযুক্তি কার্যকর করা নিয়ে আমদানিকারক ও খুচরা বিক্রেতাদের পাল্টাপাল্টি অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক বাজারে যন্ত্রাংশের দাম বাড়ার অজুহাতে স্মার্টফোনের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

বাজার সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এনইআইআর বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ার পরপরই ‘মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’ (এমআইওবি) ভুক্ত ব্র্যান্ডগুলো তাদের হ্যান্ডসেটের দাম কয়েক দফায় বাড়িয়েছে। এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য বিটিআরসিকে ৪৬ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছে এমআইওবি। বিটিআরসি জানিয়েছে, সরকারি বাজেট না থাকায় রাষ্ট্রের স্বার্থে তারা এই অনুদান গ্রহণ করেছে। তবে সাধারণ ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, একটি নির্দিষ্ট আমদানিকারক গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতেই এই ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, এনইআইআর বাতিলের দাবিতে দীর্ঘ ২০ দিন দোকান বন্ধ রাখার পর সম্প্রতি সারা দেশে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলেছেন গ্রে মার্কেটের ব্যবসায়ীরা। উচ্চ আদালতের রুল এবং রাজনৈতিক আশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে তারা দোকান খুললেও বর্তমানে অফিসিয়াল বা ব্র্যান্ডের হ্যান্ডসেট বিক্রি বন্ধ রেখেছেন। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, এনইআইআর পূর্ণাঙ্গ কার্যকর হলে তাদের গুদামে থাকা কোটি কোটি টাকার আন-অফিসিয়াল ফোন অকেজো হয়ে পড়বে, যা এই খাতকে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলবে। তারা আগামী ১৫ মার্চ পর্যন্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার ঘোষণা দিয়েছেন।

ব্র্যান্ডের মোবাইল ব্যবসায়ীদের দাবি, হঠাৎ করে নয় বরং বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণেই দাম সমন্বয় করা হয়েছে। ২০২৫ সাল থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে মেমোরি চিপের দাম প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এআই-ভিত্তিক ডেটা সেন্টার ও ক্লাউড অবকাঠামোয় মেমোরি চিপের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় স্মার্টফোন শিল্পের জন্য সরবরাহ সীমিত হয়ে পড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ বিশ্ববাজারে। বর্তমানে দেশের বাজারে বিভিন্ন মডেলের স্মার্টফোনের দাম গড়ে ১০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।

রাজধানীর বিভিন্ন বিপণিবিতান ঘুরে দেখা গেছে, নিম্ন ও মধ্যম সারির প্রায় সব ব্র্যান্ডের ফোনের দাম বেড়েছে ১ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। শাওমি, স্যামসাং, ভিভো, রিয়েলমি ও ইনফিনিক্সের মতো জনপ্রিয় ব্র্যান্ডগুলোর বিভিন্ন মডেলের দাম গত ডিসেম্বরের তুলনায় এখন অনেক বেশি। উদাহরণস্বরূপ, ১০ হাজার টাকার ফোন এখন ১৩ হাজার টাকায় এবং ২৮ হাজার টাকার ফোন ৩৩ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। স্যামসাংয়ের অন্তত দুই ডজন মডেলের দাম বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে।

সাধারণ ক্রেতাদের মতে, স্মার্টফোন এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং শিক্ষা, ফ্রিল্যান্সিং ও ডিজিটাল লেনদেনের অপরিহার্য মাধ্যম। এই অবস্থায় কৃত্রিম সংকট বা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দাম বাড়ানো হলে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য বাধাগ্রস্ত হবে। খুচরা বিক্রেতাদের অভিযোগ, মাত্র ১৭টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে এবং এনইআইআর ব্যবস্থাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তারা একচেটিয়া মুনাফা লুটছে।

সার্বিক বিষয়ে আমদানিকারক সমিতির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও যন্ত্রাংশের সংকটের কারণেই দাম বেড়েছে। তবে খুচরা ব্যবসায়ীরা এই যুক্তি মানতে নারাজ। তাদের দাবি, এনইআইআর পূর্ণাঙ্গ চালুর আগে সব পক্ষের স্বার্থ রক্ষা না করলে এই খাতে অস্থিরতা আরও বাড়বে। সব মিলিয়ে একদিকে প্রযুক্তিগত কড়াকড়ি আর অন্যদিকে মূল্যবৃদ্ধি—এই দুইয়ের চাপে পড়ে দেশের স্মার্টফোন বাজার এখন গভীর সংকটে।