দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার রক্ষাকবচ হিসেবে বিবেচিত ‘পদ্মা ব্যারাজ’ নির্মাণ প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। প্রায় ৫০ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ের এই বিশাল প্রকল্পটি দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রস্তুত করা হলেও শেষ মুহূর্তে তা জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উত্থাপন করা হয়নি। অজ্ঞাত কারণে প্রকল্পটি তালিকা থেকে বাদ পড়ায় জনমনে নানা প্রশ্ন ও সংশয় দেখা দিয়েছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে বিপর্যস্ত দেশের ২৬টি জেলার ১২৩টি উপজেলায় পানির প্রবাহ স্বাভাবিক করা এবং কৃষিজমির উর্বরতা ফেরানোই ছিল এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। সব ধরনের কারিগরি ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও প্রকল্পটি একনেক সভায় না ওঠায় হতাশ হয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনই এখন সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। ফলে এই মেগা প্রকল্পের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
নদী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতি উপেক্ষা করে অভিন্ন নদীগুলো থেকে ভারতের পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। বিশেষ করে ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মায় পানির প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ায় এই অঞ্চলের ৩৭ শতাংশ এলাকা মরুপ্রক্রিয়ার দিকে ধাবিত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি প্রকল্প নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯ ৬০-এর দশকে ভারত যখন গঙ্গা থেকে পানি প্রত্যাহার শুরু করে, তখনই এই ব্যারাজ নির্মাণের প্রাথমিক পরিকল্পনা করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০০০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও প্রকৌশল নকশা প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু ২০১৬ সালে যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকে ভারতের পক্ষ থেকে এই প্রকল্পের বিষয়ে তীব্র আপত্তি তোলা হয়। এরপর ২০১৮ সালে প্রকল্পটি এক প্রকার হিমাগারে চলে যায়। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের পানিসম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রকল্পটি পুনরায় প্রাণ ফিরে পায় এবং তিনি এটি বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেন।
মন্ত্রণালয়ের নথিপত্র অনুযায়ী, ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা বাঁধ চালুর আগে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মায় পানির প্রবাহ ছিল প্রায় ১৫০০ কিউসেক, যা বর্তমানে আশঙ্কাজনকভাবে কমে ১৭০ কিউসেকে নেমে এসেছে। এর ফলে গড়াই, মধুমতি, কপোতাক্ষসহ অসংখ্য শাখা নদী ভরাট হয়ে গেছে এবং সুন্দরবনের ইকোসিস্টেম হুমকির মুখে পড়েছে। লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে সুপেয় পানির সংকট এবং বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে গেছে।
প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পে মূল ব্যারাজের পাশাপাশি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ, গড়াই-মধুমতি নদী ড্রেজিং এবং শাখা নদীগুলোর পুনঃখননের পরিকল্পনা রয়েছে। এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বর্ষা মৌসুমের শেষে প্রায় ২.৯০ বিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হতো, যা দিয়ে শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাব পূরণ করা যেত।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের আপত্তির কারণেই কি প্রকল্পটি আবারও থমকে গেল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটির মতে, পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে কূটনৈতিক চাপের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণভাবে পানির আধার তৈরি করা বাংলাদেশের জন্য জরুরি।
পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার জানিয়েছেন, প্রকল্পটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কারিগরি কমিটিও এর পক্ষে ইতিবাচক মত দিয়েছে। তবে সময়ের স্বল্পতা এবং সরকারের বর্তমান রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের কারণে এটি একনেকে তোলা সম্ভব হয়নি। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কোনো সভা হলে সেখানে এটি উত্থাপনের ক্ষীণ সম্ভাবনা থাকলেও মূলত নির্বাচিত সরকারের সময়েই এটি অগ্রাধিকার পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রিপোর্টারের নাম 
























