আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজধানীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-১২ আসনে বইছে ভিন্নধর্মী এক নির্বাচনী হাওয়া। এই আসনের রাজনৈতিক লড়াই এখন এক চমকপ্রদ মোড় নিয়েছে, যেখানে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন একই নামের তিন প্রার্থী। রাজনৈতিক বিশ্লেষক থেকে শুরু করে সাধারণ ভোটার—সবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন ‘তিন সাইফুল’। দলীয় আদর্শ, বিদ্রোহী অবস্থান আর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার এই ত্রিমুখী লড়াইয়ে শেষ হাসি কে হাসবেন, তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
তেজগাঁও, শিল্পাঞ্চল, হাতিরঝিল, শেরেবাংলা নগর ও রমনা থানার আংশিক এলাকা নিয়ে গঠিত এই আসনটি রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। দেশের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র কারওয়ান বাজার, জাতীয় সংসদ ভবন এলাকা এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয় এই আসনের অন্তর্ভুক্ত। মোট ৩ লাখ ২৮ হাজার ৮৩০ জন ভোটারের এই আসনে মোট ১৫ জন প্রার্থী থাকলেও জনমনে আলোচনার শীর্ষে রয়েছেন তিন সাইফুল। তারা হলেন—বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, জামায়াতে ইসলামীর সাইফুল আলম খান মিলন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে থাকা বিএনপির সাবেক নেতা সাইফুল আলম নীরব।
বিএনপি-জোট সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে ‘কোদাল’ প্রতীক নিয়ে লড়ছেন বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার এবং পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির অধিকারী এই নেতা ১৯৬৯ সালের আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত রাজপথের প্রতিটি লড়াইয়ে সক্রিয় ছিলেন। তিনি মূলত সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি নির্মূল, নাগরিক সেবা নিশ্চিত এবং কিশোর গ্যাং দমনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন। সাইফুল হকের বিশ্বাস, দীর্ঘদিনের নীতিবান রাজনীতি এবং জোটের সমর্থন তাকে বড় ব্যবধানে জয়ী করবে।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন ভোটের মাঠে রয়েছেন ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীক নিয়ে। ছাত্র শিবিরের সাবেক এই কেন্দ্রীয় সভাপতি তার দীর্ঘ সাংগঠনিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তরুণ ও সাধারণ ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা করছেন। তার নির্বাচনী অঙ্গীকারের মধ্যে রয়েছে মাদক ও চাঁদাবাজমুক্ত সমাজ গঠন, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং হাতিরঝিলের পরিবেশগত উন্নয়ন। তিনি রাজনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রেখে একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন।
এই আসনের লড়াইয়ে সবচেয়ে আলোচিত ও ভিন্নমাত্রা যোগ করেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল আলম নীরব। যুবদলের সাবেক এই সভাপতি ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ‘ফুটবল’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অবতীর্ণ হয়েছেন। শুরুতে বিএনপি তাকে মনোনয়ন দিলেও কৌশলগত কারণে জোটের প্রার্থীকে সমর্থন জানানোয় তিনি বাদ পড়েন। তবে দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েও স্থানীয় জনপ্রিয়তা ও ‘এলাকার সন্তান’ পরিচয়ে তিনি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। গত ৪০ বছর ধরে এলাকার মানুষের সাথে নিবিড় সম্পর্কের ওপর ভরসা করে তিনি মাদক ও কিশোর গ্যাংমুক্ত সমাজ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
ঢাকা-১২ আসনের এই নির্বাচনি লড়াই কেবল নামের মিলের কারণে নয়, বরং আদর্শিক অবস্থান ও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার এক কঠিন পরীক্ষা। একদিকে জোটের রাজনৈতিক সমীকরণ, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক ভিত্তি এবং স্থানীয় প্রভাব—সব মিলিয়ে এই ত্রিমুখী লড়াইয়ে ভোটাররা শেষ পর্যন্ত কাকে বেছে নেন, তা দেখতে মুখিয়ে আছে পুরো দেশ। নাগরিক সংকট সমাধান আর নিরাপদ ঢাকা গড়ার এই দৌড়ে ‘তিন সাইফুলের’ ভাগ্য নির্ধারণ হবে ভোটের মাঠেই।
রিপোর্টারের নাম 






















