আওয়ামী লীগ সরকারের গত সাড়ে ১৫ বছরে দেশের বিদ্যুৎ খাতে নজিরবিহীন ও পরিকল্পিত লুটপাটের চিত্র উঠে এসেছে। এই মহালুটপাটের মাধ্যমে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে এ সংক্রান্ত গঠিত জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি। এই অনিয়মের সঙ্গে সরাসরি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুসহ উচ্চপদস্থ ১১ কর্মকর্তার জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিলেছে। বিশেষ করে ভারতের আদানি গ্রুপের সঙ্গে সম্পাদিত ‘অসম’ চুক্তির ফলে আগামী ২৫ বছরে বাংলাদেশের অতিরিক্ত ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা লোকসান হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গতকাল রবিবার রাজধানীর বিদ্যুৎ ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ খাতের চুক্তিগুলো পর্যালোচনার জন্য গঠিত জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যান বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী এই তদন্ত প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিগত সরকারের আমলে বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ৫০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে শিল্প খাতে। কমিটির তদন্তে শেখ হাসিনা ও নসরুল হামিদের ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়ার নথিপত্র পাওয়া গেছে, যা ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানো হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০০৯ সালে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) বার্ষিক লোকসান ছিল মাত্র ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। কিন্তু পরবর্তী ৯ বছরে সেই লোকসান অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার কোটি টাকায়। ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন’-এর সুযোগ নিয়ে কোনো ধরনের দরপত্র ছাড়াই অস্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতাহীন চুক্তির মাধ্যমে এই খাতে লুটপাটের ক্ষেত্র তৈরি করা হয়েছিল। বর্তমান সংকট কাটিয়ে উঠতে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম প্রায় ৮৬ শতাংশ বাড়ানো প্রয়োজন হতে পারে বলে কমিটি আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদনে আদানির সঙ্গে করা চুক্তিটিকে বিশ্বের অন্যতম ‘আত্মঘাতী’ চুক্তি হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। জানানো হয়েছে, ভারতের গ্রিড থেকে যেখানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ৪ দশমিক ৪৬ সেন্টে পাওয়া যেত, সেখানে আদানির কাছ থেকে শুরুতে ৮ দশমিক ৬১ সেন্ট এবং পরবর্তীতে ১৪ দশমিক ৮৭ সেন্ট পর্যন্ত দরে বিদ্যুৎ কেনা হয়েছে। এই চুক্তির মাধ্যমে প্রতি বছর বাংলাদেশকে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা বাড়তি পরিশোধ করতে হচ্ছে। এছাড়া আদানির বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য কয়লা আমদানির প্রক্রিয়াটিকেও চরম রহস্যজনক বলা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার কয়লা ভারতীয় রেলপথ ব্যবহার করে পরিবহনের যাবতীয় ব্যয়ভার বাংলাদেশের জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
হাসিনা ও নসরুল হামিদ ছাড়াও যে ১১ কর্মকর্তার ব্যাংক হিসাবে অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক মুখ্য সচিব আহমেদ কায়কাউস, সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. আলাউদ্দিন, সাবেক যুগ্ম সচিব শেখ ফায়জুল আমিন, পিডিবির সাবেক চেয়ারম্যান খালেদ মাহমুদ ও মো. মাহবুবুর রহমান এবং পাওয়ার সেলের সাবেক পরিচালক মো. আমজাদ হোসেনসহ আরও বেশ কয়েকজন পদস্থ কর্মকর্তা। তাদের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে প্রায় ৪ মিলিয়ন ডলার লেনদেনের তথ্য মিলেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গত দেড় দশকে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা চার গুণ বাড়লেও বেসরকারি খাতে বিল পরিশোধের হার বেড়েছে ১১ গুণ। বিশেষ করে বিদ্যুৎ কেন্দ্র বসিয়ে রেখে টাকা দেওয়ার প্রথা বা ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ প্রদানের হার ২০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে জাতীয় গ্রিডের বিশাল একটি অংশ অব্যবহৃত থাকলেও তার জন্য বিপিডিবিকে বছরে প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার দণ্ড দিতে হচ্ছে। আদানির পাশাপাশি সামিট, এস আলম গ্রুপের এসএস পাওয়ার এবং রিলায়েন্সের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও এই লুটপাটের প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
জাতীয় কমিটি এই আর্থিক রক্তক্ষরণ বন্ধে বেশকিছু সুপারিশ পেশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া চুক্তিগুলো দ্রুত বাতিল করা, উচ্চব্যয়ী চুক্তিগুলো পুনরায় আলোচনার মাধ্যমে সংশোধন করা এবং ভবিষ্যতে যেকোনো বিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র বাধ্যতামূলক করা। তবে আদানির মতো বড় চুক্তিগুলো চ্যালেঞ্জ করলে সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি বা লোডশেডিং হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে। জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক বিপর্যয় এড়াতে জনগণকে এই সাময়িক কষ্ট সহ্য করার মানসিক প্রস্তুতি রাখার আহ্বান জানিয়েছে কমিটি। সংবাদ সম্মেলনে বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন এবং অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খানসহ কমিটির অন্যান্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
রিপোর্টারের নাম 






















