চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলায় নিহত হয়েছেন র্যাব-৭ এর উপ-সহকারী পরিচালক (ডিএডি) আব্দুল মোতালেব। গত সোমবার বিকেলে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। সন্ত্রাসীদের নির্মম নির্যাতনে তার মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় আরও তিন র্যাব সদস্য গুরুতর আহত হয়ে চট্টগ্রামের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন। প্রিয়জন হারানোর বেদনায় শোকস্তব্ধ পরিবার ও সহকর্মীদের মাঝে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
জানা যায়, সোমবার বিকেলে সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে যায় র্যাবের একটি দল। সেসময় ওঁত পেতে থাকা সন্ত্রাসীরা অতর্কিত হামলা চালায়। হামলায় ডিএডি আব্দুল মোতালেব গুরুতর আহত হন। সন্ত্রাসীরা তাকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করে বলে অভিযোগ উঠেছে। তার শরীরে আঘাতের একাধিক চিহ্ন পাওয়া গেছে, যা দেখে নির্যাতনের ভয়াবহতা স্পষ্ট। আহত অপর তিন র্যাব সদস্যকে দ্রুত সিএমএইচে ভর্তি করা হয়।
নিহত আব্দুল মোতালেবের মরদেহ মঙ্গলবার সকালে সিএমএইচ থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের মর্গে আনা হয় ময়নাতদন্তের জন্য। ময়নাতদন্ত শেষে তার মরদেহ পতেঙ্গা র্যাব কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় র্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) এ কে এম শহিদুর রহমান, র্যাব-৭ এর অধিনায়ক মোহাম্মদ হাফিজুল্লাহ, সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজ, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুবুল হকসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পরে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে কুমিল্লার সদর উপজেলার কালীর বাজার ইউনিয়নের অলিপুর গ্রামের নিজ বাড়িতে দাফন করা হয়।
জানাজার আগে যখন আব্দুল মোতালেবের কফিন খোলা জায়গায় রাখা হয়, তখন এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। সাত বছর বয়সি ছোট মেয়ে ইসরাত জাহান মুনতাহা বাবার কফিনের দিকে তাকিয়ে ছিল নির্বাক দৃষ্টিতে, যেন তার অবুঝ মন বুঝতে পারছিল না কেন বাবা তাকে কোলে তুলে নিচ্ছেন না। জানাজা শুরুর ঠিক আগে সে কফিনের কাছে এসে ছোট্ট হাতে ছুঁয়ে ফিসফিস করে বলে ওঠে, “বাবা… তুমি আমাদের রেখে চলে গেলে কেন?” ১২ বছর বয়সি বড় মেয়ে শামীমা জান্নাত বাবার কফিন ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলে, “বাবা, তুমি স্কুলে নিয়ে যাবে বলেছিলে… উঠো বাবা, প্লিজ উঠো…” দুই বোনের এই কান্না ও নির্বাক বেদনা পুরো পরিবেশকে ভারী করে তোলে। র্যাব সদস্যদের অনেকেই তখন মাথা নিচু করে চোখ মুছছিলেন, কেউ কেউ নীরবে মুনতাহার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন।
কফিনের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন ১৮ বছর বয়সি ছেলে মেহেদি হাসান ভুইয়া, যিনি ঢাকার তেজগাঁও কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র। বাবার এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা তার চোখে ছায়া ফেলে। মেহেদি বলেন, “বাবা সব সময় ঠিকমতো পড়াশোনা করতে বলতেন। এখন আমি কীভাবে চলব? সংসারটা দাঁড় করানোর জন্য আমারই কিছু করতে হবে। আমি এখন একটা চাকরি চাই।” আব্দুল মোতালেবের স্ত্রী শামসুন্নাহার বেগমও শোকে বিহ্বল হয়ে পড়েন। কাঁপা কণ্ঠে তিনি বলেন, “ওকে যে কীভাবে মেরেছে, পা বাঁকা করে দিয়েছে। আঙুলগুলো ঝুলে আছে। মাথা-মুখ দেখে মনে হয় লোহার রড দিয়ে মারা হয়েছে। কোনো মানুষকে এত মারে? কী অপরাধ ছিল তার? দেশপ্রেমই কি তার বড় অপরাধ ছিল? আমার স্বামী সম্পদ বলতে কিছুই রেখে যাননি। বেতনের টাকায় সংসার চালাতাম। এই বছরই তার চাকরি শেষ হতো…! ওর মৃত্যুর পর আমরা সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে গেলাম।” তিনি সরকারের কাছে ন্যায়বিচার ও ছেলের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ চেয়েছেন।
সহকর্মী র্যাব সদস্যরা আব্দুল মোতালেবকে একজন দায়িত্বশীল ও নির্ভীক কর্মকর্তা হিসেবে স্মরণ করেন। চট্টগ্রাম র্যাবের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার ও গণমাধ্যম শাখার সিনিয়র সহকারী পরিচালক এ আর এম মোজাফফর হোসেন বলেন, “আব্দুল মোতালেব অপারেশনে সবসময় সামনের লাইনে থাকতেন। তিনি দেশকে ভালোবাসতেন এবং ঝুঁকি নিতে দ্বিধা করতেন না।” তার মৃত্যুতে র্যাব বাহিনীতে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
রিপোর্টারের নাম 





















