ঢাকা ০২:২৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬

রাবিপ্রবিতে ভিসি ও পিডির প্রকাশ্য বিরোধ: বরখাস্ত ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগে প্রশাসনিক স্থবিরতা

রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবিপ্রবি) উপাচার্য এবং পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তরের উপ-পরিচালকের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বিরোধ এখন চরম রূপ নিয়েছে। উপাচার্য ড. আতিয়ার রহমান ও প্রকল্প পরিচালক (পিডি) আব্দুল গফুরের এই প্রকাশ্য দ্বন্দ্বের জেরে ইতিমধ্যে পিডিকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। নজিরবিহীনভাবে তার দপ্তর সিলগালা করা এবং ব্যবহৃত সরকারি গাড়িটি ‘হারিয়ে গেছে’ মর্মে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে তা জব্দ করার মতো ঘটনাও ঘটেছে। এই পাল্টাপাল্টি উত্তেজনায় বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রশাসনিক শৃঙ্খলায় বড় ধরনের ধস নেমেছে।

ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ৭ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত একটি শোকসভাকে কেন্দ্র করে। প্রত্যক্ষদর্শী ও বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ওই অনুষ্ঠানে উপাচার্য ড. আতিয়ার রহমান ও আব্দুল গফুরের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে উপাচার্য সাউন্ড সিস্টেমে জনৈক সাংবাদিকের সঙ্গে আব্দুল গফুরের একটি ব্যক্তিগত ফোনালাপ বাজিয়ে শোনালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের কারণে একপর্যায়ে অনুষ্ঠানটি পণ্ড হয়ে যায়।

এই ঘটনার রেশ ধরে ওই রাতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষরিত এক আদেশে আব্দুল গফুরকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। আদেশে রিজেন্ট বোর্ডের দোহাই দিয়ে তার বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা পরিপন্থী কর্মকাণ্ড, আইসিটি সংক্রান্ত অপরাধ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ আনা হয়। বরখাস্তের পাশাপাশি তাকে ক্যাম্পাসে প্রবেশেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে উপাচার্য নিজেই উন্নয়ন ও ওয়ার্কস দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।

প্রশাসনিক এই পদক্ষেপের পাশাপাশি আব্দুল গফুরের ব্যবহৃত সরকারি গাড়িটি নিয়ে নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে গাড়িটি হারিয়ে গেছে বলে থানায় জিডি করা হলে পুলিশ সেটি পিডির বাসভবন থেকে জব্দ করে। এই ঘটনায় পিডি আব্দুল গফুরও থানায় পাল্টা অভিযোগ দায়ের করেছেন।

বর্তমানে এই বিরোধের বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় পর্যন্ত গড়িয়েছে। উভয় পক্ষই একে অন্যের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন। উপাচার্য ড. আতিয়ার রহমানের দাবি, আব্দুল গফুর একজন দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা এবং তার নিয়োগ প্রক্রিয়ায়ও অসংগতি রয়েছে। যোগ্যতার অভাব থাকা সত্ত্বেও তিনি প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন এবং রিজেন্ট বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, আব্দুল গফুর তার বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, তিনি ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার শিকার। তার মতে, মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে নিয়োগপ্রাপ্ত একজন প্রকল্প পরিচালককে বরখাস্ত করার এখতিয়ার উপাচার্যের নেই। তিনি উপাচার্যের বিরুদ্ধে নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শ অনুসরণের অভিযোগ তুলেছেন। কোনো কারণ দর্শানোর নোটিশ ছাড়াই তাকে বরখাস্ত করাকে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ দুই কর্মকর্তার এমন নজিরবিহীন বিরোধে সাধারণ শিক্ষক, কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম অস্বস্তি বিরাজ করছে। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছেন, প্রশাসনের এই অভ্যন্তরীণ কোন্দলের নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি শিক্ষা কার্যক্রম ও ক্যাম্পাসের শৃঙ্খলার ওপর পড়ছে। দ্রুত এই সংকটের সমাধান না হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক পরিবেশ আরও অবনতির দিকে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

সফরে ইবাদত: মুসাফিরের জন্য নামাজ ও রোজার শরয়ী বিধান

রাবিপ্রবিতে ভিসি ও পিডির প্রকাশ্য বিরোধ: বরখাস্ত ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগে প্রশাসনিক স্থবিরতা

আপডেট সময় : ০৩:২০:০৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬

রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবিপ্রবি) উপাচার্য এবং পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তরের উপ-পরিচালকের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বিরোধ এখন চরম রূপ নিয়েছে। উপাচার্য ড. আতিয়ার রহমান ও প্রকল্প পরিচালক (পিডি) আব্দুল গফুরের এই প্রকাশ্য দ্বন্দ্বের জেরে ইতিমধ্যে পিডিকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। নজিরবিহীনভাবে তার দপ্তর সিলগালা করা এবং ব্যবহৃত সরকারি গাড়িটি ‘হারিয়ে গেছে’ মর্মে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে তা জব্দ করার মতো ঘটনাও ঘটেছে। এই পাল্টাপাল্টি উত্তেজনায় বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রশাসনিক শৃঙ্খলায় বড় ধরনের ধস নেমেছে।

ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ৭ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত একটি শোকসভাকে কেন্দ্র করে। প্রত্যক্ষদর্শী ও বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ওই অনুষ্ঠানে উপাচার্য ড. আতিয়ার রহমান ও আব্দুল গফুরের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে উপাচার্য সাউন্ড সিস্টেমে জনৈক সাংবাদিকের সঙ্গে আব্দুল গফুরের একটি ব্যক্তিগত ফোনালাপ বাজিয়ে শোনালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের কারণে একপর্যায়ে অনুষ্ঠানটি পণ্ড হয়ে যায়।

এই ঘটনার রেশ ধরে ওই রাতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষরিত এক আদেশে আব্দুল গফুরকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। আদেশে রিজেন্ট বোর্ডের দোহাই দিয়ে তার বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা পরিপন্থী কর্মকাণ্ড, আইসিটি সংক্রান্ত অপরাধ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ আনা হয়। বরখাস্তের পাশাপাশি তাকে ক্যাম্পাসে প্রবেশেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে উপাচার্য নিজেই উন্নয়ন ও ওয়ার্কস দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।

প্রশাসনিক এই পদক্ষেপের পাশাপাশি আব্দুল গফুরের ব্যবহৃত সরকারি গাড়িটি নিয়ে নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে গাড়িটি হারিয়ে গেছে বলে থানায় জিডি করা হলে পুলিশ সেটি পিডির বাসভবন থেকে জব্দ করে। এই ঘটনায় পিডি আব্দুল গফুরও থানায় পাল্টা অভিযোগ দায়ের করেছেন।

বর্তমানে এই বিরোধের বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় পর্যন্ত গড়িয়েছে। উভয় পক্ষই একে অন্যের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন। উপাচার্য ড. আতিয়ার রহমানের দাবি, আব্দুল গফুর একজন দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা এবং তার নিয়োগ প্রক্রিয়ায়ও অসংগতি রয়েছে। যোগ্যতার অভাব থাকা সত্ত্বেও তিনি প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন এবং রিজেন্ট বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, আব্দুল গফুর তার বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, তিনি ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার শিকার। তার মতে, মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে নিয়োগপ্রাপ্ত একজন প্রকল্প পরিচালককে বরখাস্ত করার এখতিয়ার উপাচার্যের নেই। তিনি উপাচার্যের বিরুদ্ধে নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শ অনুসরণের অভিযোগ তুলেছেন। কোনো কারণ দর্শানোর নোটিশ ছাড়াই তাকে বরখাস্ত করাকে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ দুই কর্মকর্তার এমন নজিরবিহীন বিরোধে সাধারণ শিক্ষক, কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম অস্বস্তি বিরাজ করছে। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছেন, প্রশাসনের এই অভ্যন্তরীণ কোন্দলের নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি শিক্ষা কার্যক্রম ও ক্যাম্পাসের শৃঙ্খলার ওপর পড়ছে। দ্রুত এই সংকটের সমাধান না হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক পরিবেশ আরও অবনতির দিকে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।