ঢাকা ১০:১০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড: শঙ্কায় জনপদ, উদ্বেগে দেশ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা নির্বাচনী পরিবেশকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ২০২৫ সালজুড়ে দেশে প্রতিদিন গড়ে ১১ জন মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে রাজনৈতিক সহিংসতার বলি হয়েছেন অন্তত ১০২ জন। বিশেষ করে গত কয়েক মাসে ঢাকার মিরপুর, তেজগাঁও এবং বিজয়নগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পরিচিত রাজনৈতিক নেতাদের টার্গেট করে হত্যার ঘটনাগুলো জনমনে আতঙ্ক ও ব্যাপক নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে।

অপরাধ বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডগুলোকে স্রেফ ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ হিসেবে দেখার সরকারি প্রবণতা অপরাধীদের দায়মুক্তির সুযোগ করে দিচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃশ্যমান তৎপরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

গত বছরের ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর বিজয়নগরে ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর আহ্বায়ক শরীফ ওসমান বিন হাদিকে গুলি করার ঘটনাটি ছিল ২০২৫ সালের অন্যতম আলোচিত হত্যাকাণ্ড। চিকিৎসাধীন অবস্থায় সিঙ্গাপুরে তার মৃত্যুর পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ দেখা দেয়। পুলিশ এই ঘটনায় আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক এক ওয়ার্ড কাউন্সিলরের নির্দেশে ১৭ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিলেও ইনকিলাব মঞ্চ একে ‘রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্র’ আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছে। একইভাবে ৭ জানুয়ারি তেজগাঁওয়ে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আজিজুর রহমান মুসাব্বিরকে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি করে হত্যা এবং ১৭ নভেম্বর মিরপুরে বিএনপি নেতা গোলাম কিবরিয়াকে হত্যার ঘটনাগুলো পরিকল্পিত ‘টার্গেট কিলিং’ হিসেবেই প্রতীয়মান হচ্ছে।

আইন ও সালিস কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা অন্তত ৩৫৩টি বেড়েছে। পুলিশ সদরদপ্তর জানিয়েছে, বাহিনীগুলোর দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অস্থিরতা এবং তথ্যভিত্তিক নজরদারির অভাব অপরাধীদের উৎসাহিত করছে। সাবেক ডিআইজি খান সাঈদ হাসান মনে করেন, পুলিশ বাহিনীর ভেতরের অস্থিরতা কাটিয়ে উঠে যদি কার কার ওপর হামলা হতে পারে—সেই ঝুঁকি পর্যালোচনা করে দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে নির্বাচনের আগে সহিংসতা আরও চরম আকার ধারণ করতে পারে।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে আরও সচেতন ও সহনশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে এই রাজনৈতিক রক্তপাত বন্ধ করা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন প্রতিটি দলের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে কর্মীদের সংযত রাখার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি। অন্যথায়, ২০২৫ সালের এই রক্তাক্ত পরিসংখ্যান গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করার মাধ্যমে রাষ্ট্রকে গভীর সংকটে ফেলতে পারে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জিতলে ‘রাতের ভোট’ হবে ইতিহাস: আলী রিয়াজ

নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড: শঙ্কায় জনপদ, উদ্বেগে দেশ

আপডেট সময় : ০২:১৩:৩৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা নির্বাচনী পরিবেশকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ২০২৫ সালজুড়ে দেশে প্রতিদিন গড়ে ১১ জন মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে রাজনৈতিক সহিংসতার বলি হয়েছেন অন্তত ১০২ জন। বিশেষ করে গত কয়েক মাসে ঢাকার মিরপুর, তেজগাঁও এবং বিজয়নগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পরিচিত রাজনৈতিক নেতাদের টার্গেট করে হত্যার ঘটনাগুলো জনমনে আতঙ্ক ও ব্যাপক নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে।

অপরাধ বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডগুলোকে স্রেফ ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ হিসেবে দেখার সরকারি প্রবণতা অপরাধীদের দায়মুক্তির সুযোগ করে দিচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃশ্যমান তৎপরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

গত বছরের ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর বিজয়নগরে ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর আহ্বায়ক শরীফ ওসমান বিন হাদিকে গুলি করার ঘটনাটি ছিল ২০২৫ সালের অন্যতম আলোচিত হত্যাকাণ্ড। চিকিৎসাধীন অবস্থায় সিঙ্গাপুরে তার মৃত্যুর পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ দেখা দেয়। পুলিশ এই ঘটনায় আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক এক ওয়ার্ড কাউন্সিলরের নির্দেশে ১৭ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিলেও ইনকিলাব মঞ্চ একে ‘রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্র’ আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছে। একইভাবে ৭ জানুয়ারি তেজগাঁওয়ে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আজিজুর রহমান মুসাব্বিরকে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি করে হত্যা এবং ১৭ নভেম্বর মিরপুরে বিএনপি নেতা গোলাম কিবরিয়াকে হত্যার ঘটনাগুলো পরিকল্পিত ‘টার্গেট কিলিং’ হিসেবেই প্রতীয়মান হচ্ছে।

আইন ও সালিস কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা অন্তত ৩৫৩টি বেড়েছে। পুলিশ সদরদপ্তর জানিয়েছে, বাহিনীগুলোর দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অস্থিরতা এবং তথ্যভিত্তিক নজরদারির অভাব অপরাধীদের উৎসাহিত করছে। সাবেক ডিআইজি খান সাঈদ হাসান মনে করেন, পুলিশ বাহিনীর ভেতরের অস্থিরতা কাটিয়ে উঠে যদি কার কার ওপর হামলা হতে পারে—সেই ঝুঁকি পর্যালোচনা করে দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে নির্বাচনের আগে সহিংসতা আরও চরম আকার ধারণ করতে পারে।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে আরও সচেতন ও সহনশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে এই রাজনৈতিক রক্তপাত বন্ধ করা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন প্রতিটি দলের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে কর্মীদের সংযত রাখার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি। অন্যথায়, ২০২৫ সালের এই রক্তাক্ত পরিসংখ্যান গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করার মাধ্যমে রাষ্ট্রকে গভীর সংকটে ফেলতে পারে।