জাতীয় শিক্ষাক্রমে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়টিকে আবশ্যিক বা বাধ্যতামূলক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার দীর্ঘ ১৩ বছর পার হয়ে গেলেও দেশের অধিকাংশ কলেজে এখনো এই বিষয়ের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষকের পদই সৃষ্টি করা হয়নি। কোথাও কোথাও কাগজে-কলমে পদ থাকলেও বছরের পর বছর ধরে শিক্ষক নেই। ফলে বাধ্য হয়ে পদার্থবিজ্ঞান, প্রাণিবিদ্যা, গণিত কিংবা অন্যান্য বিষয়ের শিক্ষকদের দিয়ে কোনোমতে চালানো হচ্ছে আইসিটির পাঠদান। চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলে ইংরেজির পাশাপাশি আইসিটি বিষয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়ার কারণে সামগ্রিক পাসের হারে যে বড় ধরনের পতন ঘটেছে, তার পেছনে এই শিক্ষক সংকট ও ব্যবহারিক শিক্ষার তীব্র ঘাটতিকেই দায়ী করছেন শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুততম সময়ে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগের জোর তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ‘বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৫’ প্রতিবেদনের বিশদ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের মোট ৪ হাজার ৯৩৬টি কলেজে শিক্ষকের সংখ্যা ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪২২ জন। অথচ এত বিশাল শিক্ষকবাহিনীর মধ্যে আইসিটি বিষয়ের শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ৫ হাজার ৬৫৪ জন। এর মধ্যে ৪ হাজার ২৩২টি বেসরকারি কলেজে আইসিটি শিক্ষক আছেন ৫ হাজার ৪৩ জন এবং দেশের ৭০৪টি সরকারি কলেজে এই সংখ্যা মাত্র ৬১১ জন। এর ভেতরেও সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র হলো, সারা দেশের স্বতন্ত্র ৫৪টি সরকারি উচ্চমাধ্যমিক কলেজের জন্য আইসিটি শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ২৯ জন।
আইসিটি বিষয়ের অনুমোদিত শিক্ষকের তীব্র সংকটের কারণে সরকারি কলেজগুলোতে বিকল্প ব্যবস্থায় পদার্থবিজ্ঞান, প্রাণিবিদ্যা, গণিতসহ বিভিন্ন অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ের শিক্ষকেরা আইসিটির নিয়মিত ক্লাস নিচ্ছেন। আবার কোথাও কোথাও নিয়মিত পদ খালি থাকায় অতিথি শিক্ষক, খণ্ডকালীন শিক্ষক কিংবা কোনো রকমে কম্পিউটার প্রোগ্রামারদের দিয়ে দায়সারাভাবে পাঠদান চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অথচ প্রশাসনিক সংস্কারসংক্রান্ত এনাম কমিটির সুস্পষ্ট সুপারিশ রয়েছে যে, সরকারি কলেজগুলোতে ডিগ্রি ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে যেকোনো একটি বিষয়ে মানসম্মত শিক্ষার জন্য অন্তত চারজন শিক্ষকের পদ থাকা বাধ্যতামূলক।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) তথ্যসূত্র অনুযায়ী, ২০১৩ সালে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে আইসিটি বিষয়টিকে বাধ্যতামূলক হিসেবে পাঠ্যসূচিতে যুক্ত করা হয়। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টি চালুর সিদ্ধান্তের সঙ্গে সংগতি রেখে প্রয়োজনীয় শিক্ষক পদ সৃষ্টি এবং দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়ার মধ্যে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় রক্ষা করা যায়নি। পরবর্তীতে ২০১৬ সালে সরকারি কলেজগুলোর জন্য আইসিটি প্রভাষকের ২৫৫টি বিসিএস ক্যাডার পদ সৃষ্টি করা হয় এবং পরে আরও ১৮টি নতুন পদ যুক্ত হয়ে ক্যাডার পদের সংখ্যা দাঁড়ায় মাত্র ২৭৩টিতে। এরপর ২০২১ সালে ৩৮তম বিসিএসের মাধ্যমে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ১৪৫ জন আইসিটি প্রভাষক সরকারি কলেজে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান করেন। পরবর্তী সময়ে ৪৫তম, ৪৬তম, ৪৭তম ও ৪৯তম বিসিএসের মাধ্যমে আরও ১০৩ জন আইসিটি প্রভাষককে নিয়োগের জন্য পিএসসি থেকে সুপারিশ করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল।
শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি দেশের কলেজগুলোতে আধুনিক কম্পিউটার ল্যাব ও নিয়মিত ব্যবহারিক শিক্ষার সুযোগের মারাত্মক ঘাটতি বিদ্যমান। ব্যানবেইসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের ৪ হাজার ৯৩৬টি কলেজের মধ্যে মাত্র ৬৫ দশমিক ৬০ শতাংশ কলেজে নিজস্ব কম্পিউটার ল্যাব রয়েছে; অর্থাৎ এক-তৃতীয়াংশের বেশি কলেজে কোনো ল্যাব সুবিধাই নেই। সরকারের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের বিশেষ প্রকল্পের আওতায় স্থাপিত ডিজিটাল ল্যাব রয়েছে মাত্র ৪৩ দশমিক ৯ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে। যদিও নথিপত্র অনুযায়ী ৯৬ দশমিক ১৫ শতাংশ কলেজে কোনো না কোনোভাবে কম্পিউটার সুবিধা এবং ৯১ দশমিক ৯৬ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে ইন্টারনেট সংযোগের কথা বলা হয়, বাস্তবে পাঠদানে নিয়মিত কম্পিউটার ব্যবহার করে মাত্র ৫১ দশমিক ৯০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান। আর শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের কাজে সক্রিয় ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারে মাত্র ৬৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ কলেজ।
শিক্ষাবিদদের মতে, আইসিটির মতো সম্পূর্ণ প্রায়োগিক বিষয়ে প্রোগ্রামিং কোডিং, ডাটাবেজ, তথ্যপ্রযুক্তি ও কম্পিউটারের নানা আধুনিক কার্যক্রম হাতে-কলমে শেখা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু দেশের বিপুলসংখ্যক কলেজে কম্পিউটার ল্যাব না থাকা এবং পাঠদানে প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার শিক্ষার্থীদের ভেতরে গোড়াতেই মারাত্মক শিখন ঘাটতি তৈরি করছে।
ঢাকা সিটি কলেজের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক মো. জাহাঙ্গীর আলম সুমন এ বিষয়ে জানান, আইসিটি শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে হলে বিষয়ভিত্তিক দক্ষ ও নিয়মিত প্রশিক্ষিত শিক্ষকের বিকল্প নেই। কিন্তু দেশের বহু প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় সংখ্যক আইসিটি শিক্ষক তো নেই-ই, বরং অন্য বিষয়ের শিক্ষকদের দিয়ে পড়ানো হচ্ছে। তাছাড়া শিক্ষকদের আধুনিক প্রযুক্তি ও ব্যবহারিক প্রয়োগের ওপর নিয়মিত প্রশিক্ষণেরও চরম অভাব রয়েছে, যা শিক্ষার গুণগত মানকে সরাসরি ধ্বংস করছে। তিনি প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অনতিবিলম্বে যোগ্য আইসিটি শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, আধুনিক ল্যাব প্রতিষ্ঠা এবং শহর ও গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত বৈষম্য দূর করার জোর দাবি জানান।
আইসিটি বিষয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ফেল করার পেছনে শিক্ষক সংকটকে সরাসরি দায়ী করেছেন ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক সৈয়দ আখতারুজ্জামান। তিনি স্বীকার করে বলেন, বহু প্রতিষ্ঠানে আইসিটি শিক্ষক না থাকায় অন্য বিষয়ের শিক্ষকদের দিয়ে ক্লাস নেওয়া হয়েছে, যার ফলে শিক্ষার্থীদের পাঠ্যসূচির জটিল বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে বোঝার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
এদিকে সামগ্রিক এই বিপর্যয়কর পরিস্থিতির মুখে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, ইংরেজি ও আইসিটি বিষয়ে ফলাফলের এই ধারাবাহিক অবনতি ঠেকাতে সরকার দ্রুত বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করতে যাচ্ছে। একই সঙ্গে শিক্ষক সংকট নিরসন ও পাঠদানের ক্ষেত্রে কোথায় কোথায় দুর্বলতা রয়েছে, তা নিবিড়ভাবে চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


























