প্রায় ৯ বছর ধরে বাংলাদেশে আশ্রিত ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার আকুল অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক বাহিনীর ভয়াবহ দমন-পীড়ন ও গণহত্যার মুখে প্রায় ৮ লাখ রোহিঙ্গা নতুন করে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। বর্তমানে তারা কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ এবং নোয়াখালীর ভাসানচর মিলিয়ে মোট ৩৪টি ক্যাম্পে বসবাস করছেন। তবে জাতিসংঘ স্বীকৃত এই নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা এবং মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা না মেলায় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে থমকে আছে। এমন পরিস্থিতিতে আগামী ১৯ নভেম্বর আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) চূড়ান্ত রায়কে ঘিরে রোহিঙ্গা শিবিরের বাসিন্দাদের মধ্যে এক নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে দায়ের করা এ মামলার সিদ্ধান্ত তাদের দীর্ঘদিনের ন্যায়বিচারের দাবিকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কতখানি জোরদার করবে, সেদিকেই এখন পূর্ণ দৃষ্টি রাখছেন রোহিঙ্গা নেতারা। তাদের প্রবল প্রত্যাশা—আদালতের ঐতিহাসিক এই রায় মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের আদি বাসস্থান ও নাগরিক অধিকারের দাবিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেবে, দেশটির ওপর শক্তিশালী বৈশ্বিক চাপ সৃষ্টি করবে এবং শেষ পর্যন্ত একটি নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পথ সুগম করবে।
নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরের পিস প্যালেসে আগামী ১৯ নভেম্বর (বৃহস্পতিবার) স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় প্রকাশ্যে আদালতের রায় পাঠ করবেন আইসিজের সভাপতি বিচারক ইওয়াসাওয়া ইউজি। ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর গাম্বিয়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ১৯৪৮ সালের ‘গণহত্যা সনদের’ নবম অনুচ্ছেদ লঙ্ঘনের অভিযোগে এই ঐতিহাসিক মামলাটি দায়ের করে। মামলায় মিয়ানমারের আন্তর্জাতিক দায় নির্ধারণ, গণহত্যার বেআইনি কার্যক্রম বন্ধ, ক্ষতিগ্রস্ত রোহিঙ্গাদের ক্ষতিপূরণ দান এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ না ঘটানোর নিশ্চয়তা চাওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০২০ সালের ২৩ জানুয়ারি আইসিজে মিয়ানমারকে গণহত্যার যেকোনো পদক্ষেপ রোধ ও মামলার আলামত সংরক্ষণে অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ দেন। মিয়ানমার আদালতের বিচারিক এখতিয়ার নিয়ে প্রাথমিক আপত্তি তুললেও ২০২২ সালের ২২ জুলাই আইসিজে তা সরাসরি খারিজ করে মামলাটি বিচারযোগ্য হিসেবে বহাল রাখেন এবং উভয় পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় নথিপত্র গ্রহণের মাধ্যমে শুনানির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন।
এই মামলাটির আন্তর্জাতিক গুরুত্বের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো ১১টি দেশের সরাসরি আইনি হস্তক্ষেপ বা সম্পৃক্ততা। গণহত্যা সনদের ৬৩ অনুচ্ছেদের অধীনে কানাডা, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস ও যুক্তরাজ্য যৌথভাবে মামলায় হস্তক্ষেপের ঘোষণা দেয়। এছাড়া মালদ্বীপ, স্লোভেনিয়া, কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র, বেলজিয়াম ও আয়ারল্যান্ডও এই আইনি প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের আবেদন জানিয়েছিল, যা আদালতের ২০২৪ ও ২০২৫ সালের আদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়। বৈশ্বিক অঙ্গনের এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে রোহিঙ্গা গণহত্যা ও সনদ ব্যাখ্যার বিষয়টিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সুগভীর স্বার্থ জড়িয়ে রয়েছে, যা ভবিষ্যতে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরানোর জোর কূটনৈতিক দাবি হিসেবে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে।
দীর্ঘ এক দশক ধরে ন্যায়বিচারের আশায় থাকা রোহিঙ্গাদের সংগঠন ‘ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা’ (ইউসিআর)-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সৈয়দ উল্লাহ এবং বর্তমান সভাপতি কিন মং জানান, আদালতের সম্ভাব্য এই সিদ্ধান্ত তাদের ওপর ঘটে যাওয়া বর্বরতার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করবে এবং নিজ ভিটায় ফেরার দাবিকে সুসংগঠিত করবে। আশ্রয় প্রদান করায় বাংলাদেশের সরকার ও সাধারণ মানুষের প্রতি আজীবন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তারা বলেন, তারা বাংলাদেশে স্থায়ী হতে চান না, অধিকার নিয়ে অবিলম্বে নিজেদের মাতৃভূমিতে ফিরতে চান। তবে একই সাথে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের ভেটো ক্ষমতা এবং বিভিন্ন ভৌগোলিক-রাজনৈতিক জটিলতার কারণে রায় বাস্তবায়নে কিছুটা সময় লাগতে পারে বলেও তারা আশঙ্কা করছেন। তা সত্ত্বেও গাম্বিয়া ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এই উদ্যোগের ফলে মিয়ানমারের অত্যাচারী চক্র বিচারের মুখোমুখি হবে বলে তারা দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনকে এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান হিসেবে বিবেচনা করে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক কূটনৈতিক উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছে। গত ২৭ আগস্ট ওআইসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরিষদের সম্মেলনের সাইডলাইনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির গাম্বিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল ও বিচারমন্ত্রী দাউদা এ জালোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আইসিজে-তে মামলার অগ্রগতি এবং যৌথ সমন্বিত কূটনৈতিক ব্যবস্থার ওপর জোর দেন। অন্যদিকে, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান উল্লেখ করেছেন যে, আইসিজে-র এই রায় সরাসরি হয়তো রাতারাতি প্রত্যাবাসন শুরু করবে না, তবে তা নৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে এক অবিনশ্বর দলিল হিসেবে কাজ করবে। মিয়ানমার দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের ‘বহিরাগত’ হিসেবে যে মিথ্যা অপপ্রচার চালিয়ে আসছে, আদালতের এই রায় তার ভিত্তি সম্পূর্ণ উপড়ে ফেলবে এবং সংঘাতময় রাখাইন পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের নিজেদের ঘরে ফেরার যৌক্তিক দাবিকে অনেক বেশি শক্তিশালী করে তুলবে।





















