রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) বিস্তীর্ণ সবুজ ক্যাম্পাসে চলতে চলতে কেউ হয়তো টেরই পায় না, এই নির্জনতার ভেতরে লুকিয়ে আছে রক্তাক্ত ইতিহাস। যে ইতিহাস আজও মাটি, ঘাস আর বাতাস বয়ে বেড়ায়। যেখানে আছে রক্তের গন্ধ, আতঙ্কের প্রতিধ্বনি ও আর্তনাদের নীরব চিৎকার। এটাই রাবির বধ্যভূমির ইতিহাস।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে প্রধান টার্গেট করে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বহু নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থানে চলেছিল গণহত্যা, আর রাতের আঁধারে লাশ পুঁতে রাখা হয় ক্যাম্পাসজুড়ে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ শামসুজ্জোহা হল থেকে একটু পূর্বদিকে হাঁটলে দেখা যাবে, ইটের তৈরি একটি লাল স্তম্ভ। ১৯৭১ সালে রাজশাহীসহ পাশ্ববর্তী বিভিন্ন এলাকা থেকে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, তরুণ-তরুণী ও মধ্যবয়সী নারী-পুরুষকে ধরে এনে কঠোর নির্যাতন করতো হানাদার বাহিনী। শত শত নিরাপরাধ মানুষকে নির্মমভাবে নির্যাতন ও হত্যার পর জীবিত কিংবা মৃত অবস্থায় বধ্যভূমিতে গণকবর দেওয়া হতো।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শহীদ শামসুজ্জোহা হলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর একটি ক্যাম্প ছিল। টানা ৯ মাস ক্যান্টনমেন্ট হিসেবে এই হলকে ব্যবহার করেছিল তারা। হলের করিডোর ও কক্ষে হাত-পা বেঁধে ঝুলিয়ে রেখে বেধড়ক পেটানো হতো মুক্তিকামি বাঙালিদের।
১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর একে একে সন্ধান মিলতে থাকে গণকবর বা বধ্যভূমির। এমন খবর শুনে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে এসে স্বজনহারা মানুষরা পচা, গলিত, অর্ধগলিত বিকৃত দেহাবশেষ খুঁজে বের করেন। কেউবা পরনের জামা, হাতের ঘড়ি-আংটি, শারীরিক গড়ন বা বৈশিষ্ট্য দেখে খোঁজার চেষ্টা করেছেন প্রিয়জনদের। স্বাধীনতার পর রাবির বধ্যভূমির এই স্মতিস্তম্ভ স্থাপনের জন্য মাটি খুঁড়তেই পাওয়া গিয়েছিল অসংখ্য শরীরের অঙ্গ ও মাথার খুলি। আজও সেগুলো রাবির শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত আছে।
২০০০ সালে রাবির তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক এম. সাইদুর রহমান খান এই বধ্যভূমির স্মৃতিফলকের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ২০০২ সালে তৎকালীন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. রেদোয়ান আহমেদ নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন। বধ্যভূমির সমতল ভূমি থেকে ৪২ ফুট উঁচু এবং ৬ স্তর বিশিষ্ট একটি স্তম্ভ দাঁড়িয়ে আছে এখন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভ
রাবির দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী শ্রাবন্তী আজাদ রিমু বলেন, ‘রাবিতে পড়তে এসে জানতে পারলাম আমাদের ক্যাম্পাসেই কত ভয়াবহ ইতিহাস লুকিয়ে আছে। জুবেরী ভবনের পাশের বধ্যভূমি বা মধ্য মাঠের গণকবর। এসব জায়গা দেখে বুঝি স্বাধীনতা কত বড় ত্যাগের বিনিময়ে এসেছে। প্রতিদিন যার ওপর দিয়ে হাঁটি, সেখানেই একসময় শিক্ষক-শিক্ষার্থীকে হত্যা করা হয়েছিল, ভাবতেই খুব কষ্ট লাগে। আমি মনে করি প্রতিটি শিক্ষার্থীর এসব ইতিহাস জানা জরুরি, কারণ এগুলো আমাদের দেশপ্রেম আর দায়িত্ববোধ আরও বাড়ায়।’
২১ বছর ধরে বধ্যভূমির পরিচর্যা করে আসা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী মনসুর আলী বলেন, ‘২০০৪ সালে এপ্রিল মাসে ঢুকছি। তারপর থেকে এখানেই কাজ করছি ছয় থেকে সাত মাস হলো স্থায়ী হয়েছি। শুক্রবার শনিবার ছুটি থাকে। সকাল সাড়ে ৭টায় আসি ২টা পর্যন্ত ফুল গাছের দেখাশোনা করি। ফুলের গাছ লাগাই, পানি দিই। নিচে পরিষ্কার করি। পাশে বসার জায়গাগুলো পরিষ্কার করি। আজকে গণকবরের ভেতরে পরিষ্কার করছি। আমরা খুব ভালো লাগে আমি মুক্তিযুদ্ধের একটা স্তম্ভের যত্ন করার সুযোগ পেয়েছি। আমি এই স্তম্ভকে সব থেকে বেশি যত্নে রাখার চেষ্টা করি সবসময়।’
মনসুর আলী আরও বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় খুব ছোট ছিলাম। এখন বধ্যভূমির দেখভালের সুযোগ পাওয়ায় ভালো লাগে। দর্শনার্থী আসেন বধ্যভূমি দেখতে। অনেকে এর ইতিহাস জানতে চায়। আমি যতটুকু জানি তাদের বলি।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭২ সালের ২৩ এপ্রিল আবিষ্কৃত একটি গণকবরের ওপর স্মৃতিস্তম্ভটি নির্মাণ করা হয়। সেসময় মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম এবং স্থানীয় কন্ট্রাক্টর জেবর মিয়া গণকবরটি খনন করেন। মৃত্যুকূপ থেকে বেরিয়ে আসে হাজারো মানুষের মাথার খুলি ও কঙ্কাল।
মুক্তিযুদ্ধের সময় শহীদ শামসুজ্জোহা হল ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর ঘাঁটি। ৯ মাস ধরে পাকিস্তানি বাহিনী এবং রাজাকার ও আল-বদররা বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী কাটাখালি, মাসকাটা দীঘি, চৌদ্দপাই, শ্যামপুর, ডাশমারী, তালাইমারী, রানীনগর ও কাজলার কয়েক হাজার নারী-পুরুষকে এখানে ধরে এনে হত্যা করেছিল। তাদের হাত থেকে রেহাই পাননি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ছাত্র, কর্মচারী এবং তাদের পরিবারের সদস্যরাও। এই হলের পেছনে এক বর্গমাইল এলাকাজুড়ে ছিল বধ্যভূমি। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন কাজলা এলাকা এবং রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় পাওয়া যায় আরও কয়েকটি গণকবর। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বধ্যভূমি শুধু একটি প্রত্নস্থল নয়, এটি জাতির কাছে স্বাধীনতার মূল্য মনে করিয়ে দেওয়া এক নীরব পাঠশালা।
রিপোর্টারের নাম 
























