মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন
ঢাকা ০৩:৫০ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬

জুলাই বিপ্লবের দুই বছর: রক্তের ঋণ এবং অসম্পূর্ণ কাঠামোগত পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ

দুই বছর আগে, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে এ দেশের তরুণ-তরুণীরা রাজপথে দাঁড়িয়েছিল খালি হাতে, বুক পেতে দিয়েছিল বুলেটের সামনে। আবু সাঈদ দুহাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়েছিলেন; মুগ্ধ পানির বোতল হাতে বলছিলেন, ‘পানি লাগবে, পানি?’ সেই জুলাইয়ে অন্তত ১ হাজার ৪০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন; ২০ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছিলেন—কেউ চোখ হারিয়েছেন, কেউ পা, কেউ মেরুদণ্ড। তাঁদের কেউ শহীদ হওয়ার জন্য ঘর থেকে বের হননি। তাঁরা বের হয়েছিলেন একটি সহজ এবং প্রায় লাজুক দাবি নিয়ে—এই রাষ্ট্রটা যেন মানুষের হয়; যেন ভোট দেওয়া যায়, কথা বলা যায়, চাকরির পরীক্ষায় মেধার মূল্য থাকে, ব্যাংকের টাকা লুট না হয়, কেউ গুম না হয়।

জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে এসে তাই প্রশ্নটা এড়ানোর উপায় নেই—‘যে দাবির জন্য এত রক্ত, সেই দাবি কি পূরণ হয়েছে?’ নির্মোহ উত্তরটা হলো, ‘না।’ ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে, কাঠামোর বদল হয়নি। মুখ পাল্টেছে, বন্দোবস্ত পাল্টায়নি। আর ঠিক এখানে দাঁড়িয়েই এই লেখা, শোকগাথা হিসেবে নয়, খতিয়ান হিসেবে; হতাশার দলিল হিসেবে নয়, আগামীর করণীয় রূপরেখা হিসেবে। কারণ শহীদের ঋণ শোধ হয় না অশ্রুতে; শোধ হয় কাঠামো বদলে।

জুলাই বিপ্লবের পর সংস্কারের যে মহাযজ্ঞের প্রতিশ্রুতি এসেছিল, তার পরিণতি কী দাঁড়িয়েছে, সেই হিসাবটা আগে নেওয়া দরকার। কমিশনের পর কমিশন হয়েছে, সুপারিশের স্তূপ জমেছে, ১৩৩টি অধ্যাদেশ হয়েছে। কিন্তু নির্বাচিত সংসদে ঝরে গেছে ঠিক সেই অধ্যাদেশগুলো, যেগুলো ছিল অভ্যুত্থানের মর্মবস্তু, যেমন—গুম থেকে সুরক্ষার আইন, মানবাধিকার সুরক্ষার আইন, স্বাধীন উচ্চ আদালত ও স্বাধীন বিচারক নিয়োগের আইন। যেগুলো টিকে গেছে, তার অনেকগুলোর ভেতর থেকেও মৌলিক দাঁতগুলো তুলে ফেলা হয়েছে, নজরদারি নিয়ন্ত্রণসহ বাকি আইনগুলোর মান নামিয়ে দেওয়া হয়েছে এমন স্তরে, যেখানে সেগুলো আর ক্ষমতাকে জবাবদিহি করতে পারে না।

এটি কি নিছক গাফিলতি? না। সংস্কার মানেই বিদ্যমান বন্দোবস্তে কারো না কারো স্বার্থে আঘাত। যে অধ্যাদেশ গুম বন্ধ করবে—সেটা আটকাবে তারাই, নজরদারি ও বলপ্রয়োগের ক্ষমতা যাদের পুঁজি। যে আইন বিচারক নিয়োগ স্বাধীন করবে—সেটা আটকাবে তারাই, আদালতকে পকেটে রাখা যাদের সুরক্ষার অংশ। সংস্কার তাই কেউ ধারণ করে না, সংস্কারে হাত দিলেই চাঁদাবাজ, ব্যবসায়ী, টেন্ডারবাজ, কনসালট্যান্ট-ভেন্ডর চক্র, প্রশাসনের একাংশ, এমনকি সাংবাদিকদের একাংশও শত্রু হয়ে ওঠে। দুর্নীতি থামানো কঠিন হয়ে পড়ে যখন স্বার্থান্বেষী মহল এর বিরুদ্ধে সক্রিয় থাকে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের সন্ত্রাস বরদাশত করা হবে না: মামুনুল হক

জুলাই বিপ্লবের দুই বছর: রক্তের ঋণ এবং অসম্পূর্ণ কাঠামোগত পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ

আপডেট সময় : ০২:০১:৫৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬

দুই বছর আগে, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে এ দেশের তরুণ-তরুণীরা রাজপথে দাঁড়িয়েছিল খালি হাতে, বুক পেতে দিয়েছিল বুলেটের সামনে। আবু সাঈদ দুহাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়েছিলেন; মুগ্ধ পানির বোতল হাতে বলছিলেন, ‘পানি লাগবে, পানি?’ সেই জুলাইয়ে অন্তত ১ হাজার ৪০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন; ২০ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছিলেন—কেউ চোখ হারিয়েছেন, কেউ পা, কেউ মেরুদণ্ড। তাঁদের কেউ শহীদ হওয়ার জন্য ঘর থেকে বের হননি। তাঁরা বের হয়েছিলেন একটি সহজ এবং প্রায় লাজুক দাবি নিয়ে—এই রাষ্ট্রটা যেন মানুষের হয়; যেন ভোট দেওয়া যায়, কথা বলা যায়, চাকরির পরীক্ষায় মেধার মূল্য থাকে, ব্যাংকের টাকা লুট না হয়, কেউ গুম না হয়।

জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে এসে তাই প্রশ্নটা এড়ানোর উপায় নেই—‘যে দাবির জন্য এত রক্ত, সেই দাবি কি পূরণ হয়েছে?’ নির্মোহ উত্তরটা হলো, ‘না।’ ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে, কাঠামোর বদল হয়নি। মুখ পাল্টেছে, বন্দোবস্ত পাল্টায়নি। আর ঠিক এখানে দাঁড়িয়েই এই লেখা, শোকগাথা হিসেবে নয়, খতিয়ান হিসেবে; হতাশার দলিল হিসেবে নয়, আগামীর করণীয় রূপরেখা হিসেবে। কারণ শহীদের ঋণ শোধ হয় না অশ্রুতে; শোধ হয় কাঠামো বদলে।

জুলাই বিপ্লবের পর সংস্কারের যে মহাযজ্ঞের প্রতিশ্রুতি এসেছিল, তার পরিণতি কী দাঁড়িয়েছে, সেই হিসাবটা আগে নেওয়া দরকার। কমিশনের পর কমিশন হয়েছে, সুপারিশের স্তূপ জমেছে, ১৩৩টি অধ্যাদেশ হয়েছে। কিন্তু নির্বাচিত সংসদে ঝরে গেছে ঠিক সেই অধ্যাদেশগুলো, যেগুলো ছিল অভ্যুত্থানের মর্মবস্তু, যেমন—গুম থেকে সুরক্ষার আইন, মানবাধিকার সুরক্ষার আইন, স্বাধীন উচ্চ আদালত ও স্বাধীন বিচারক নিয়োগের আইন। যেগুলো টিকে গেছে, তার অনেকগুলোর ভেতর থেকেও মৌলিক দাঁতগুলো তুলে ফেলা হয়েছে, নজরদারি নিয়ন্ত্রণসহ বাকি আইনগুলোর মান নামিয়ে দেওয়া হয়েছে এমন স্তরে, যেখানে সেগুলো আর ক্ষমতাকে জবাবদিহি করতে পারে না।

এটি কি নিছক গাফিলতি? না। সংস্কার মানেই বিদ্যমান বন্দোবস্তে কারো না কারো স্বার্থে আঘাত। যে অধ্যাদেশ গুম বন্ধ করবে—সেটা আটকাবে তারাই, নজরদারি ও বলপ্রয়োগের ক্ষমতা যাদের পুঁজি। যে আইন বিচারক নিয়োগ স্বাধীন করবে—সেটা আটকাবে তারাই, আদালতকে পকেটে রাখা যাদের সুরক্ষার অংশ। সংস্কার তাই কেউ ধারণ করে না, সংস্কারে হাত দিলেই চাঁদাবাজ, ব্যবসায়ী, টেন্ডারবাজ, কনসালট্যান্ট-ভেন্ডর চক্র, প্রশাসনের একাংশ, এমনকি সাংবাদিকদের একাংশও শত্রু হয়ে ওঠে। দুর্নীতি থামানো কঠিন হয়ে পড়ে যখন স্বার্থান্বেষী মহল এর বিরুদ্ধে সক্রিয় থাকে।