মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে, কিন্তু বাংলাদেশের সীমান্তের ওপার থেকে ধেয়ে আসা সংকটের মেঘ কাটেনি; বরং তা আরও ঘন ও কালো হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আমরা জেনে এসেছি, মিয়ানমারের জান্তা সরকার ও তাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিপি)-এর প্রত্যক্ষ মদদে বাংলাদেশে মাদক পাচার হতো। সাম্প্রতিক সময়ে রাখাইনের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘আরাকান আর্মি’র হাতে চলে যাওয়ার পর আশা করা হয়েছিল, হয়তো সীমান্তে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে তার ঠিক উল্টো। যুদ্ধের দামামায় বৈধ বাণিজ্য যখন অচল, তখন অন্ধকার জগতে শুরু হয়েছে এক নতুন ও আত্মঘাতী কৌশল—যার নাম ‘পণ্য বিনিময় প্রথা’ বা বার্টার ট্রেড। এই প্রথা বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক ভয়াবহ অশনিসংকেত।
অর্থনীতির দ্বিমুখী রক্তক্ষরণ:
সীমান্তে বর্তমানে যে সিন্ডিকেট সক্রিয়, তারা ডলার বা স্বর্ণের বিনিময়ে নয়, বরং পণ্যের বিনিময়ে মাদক আনছে। বিষয়টি গভীরভাবে বিশ্লেষণের দাবি রাখে। বাংলাদেশ থেকে পাচার হচ্ছে ইউরিয়া সার, ভোজ্যতেল, জ্বালানি তেল, চিনি, আটা, ময়দা এমনকি রড-সিমেন্টের মতো নির্মাণসামগ্রী। এর বিনিময়ে এ দেশে ঢুকছে মরণনেশা ইয়াবা ও আইস (ক্রিস্টাল মেথ)।
এখানে বাংলাদেশের ক্ষতি দ্বিমুখী। প্রথমত, আমাদের কৃষকের জন্য জনগণের করের টাকায় ভর্তুকি দেওয়া সার ও দেশের জ্বালানি তেল পাচার হয়ে যাচ্ছে ভিনদেশে। অর্থাৎ, আমরা পরোক্ষভাবে মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠীর রসদ ও যুদ্ধের খরচ জোগাচ্ছি। দ্বিতীয়ত, আমাদের কষ্টার্জিত সম্পদের বিনিময়ে আমরা ফেরত পাচ্ছি বিষ, যা আমাদের যুবসমাজ ও কর্মক্ষম জনসংখ্যাকে ধ্বংস করছে। অর্থনীতির ভাষায় একে কেবল চোরাচালান বলা যায় না, এটি জাতীয় সম্পদের চরম অপচয় এবং সামাজিক কাঠামোর ওপর আঘাত।
আরাকান আর্মি:
নতুন বোতলে পুরনো মদ? গোয়েন্দা তথ্য ও বিজিবির সাম্প্রতিক অভিযানের পরিসংখ্যান বলছে, আরাকান আর্মি তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় অর্থের জোগান নিশ্চিত করতে মাদকের উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থাকে ‘রাষ্ট্রীয় আয়ের’ মতো ব্যবহার করছে। গত বেশ কিছু অভিযানে বিজিবির প্রায় ৫ লাখ ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনা প্রমাণ করে, সীমান্তে নজরদারি থাকলেও পাচারকারীরা বেপরোয়া। আরাকান আর্মি একদিকে খাদ্য ও রসদ সংকটে ভুগছে, অন্যদিকে তাদের হাতে রয়েছে মাদকের বিশাল ভাণ্ডার। ফলে বাংলাদেশের অসাধু ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগসাজশে তারা গড়ে তুলেছে এই ভয়ংকর বিনিময় ব্যবস্থা। এটি প্রমাণ করে, মিয়ানমারে যারাই ক্ষমতায় থাকুক—জান্তা কিংবা বিদ্রোহী—মাদকের স্বার্থে তাদের চরিত্র অভিন্ন।
রোহিঙ্গা ক্যাম্প:
নিরাপত্তার ‘টাইম বোমা’ সীমান্তের এই চোরাচালান কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ নয়, এটি দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো এখন আর কেবল মানবিক আশ্রয়ের কেন্দ্র নয়; এগুলো পরিণত হয়েছে চোরাচালানের ট্রানজিট পয়েন্ট ও সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে। অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় এবং আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে ক্যাম্পগুলো অশান্ত হয়ে উঠছে। চলতি বছরে ক্যাম্পে হত্যা, অপহরণ ও মাদকের মামলার পরিসংখ্যান উদ্বেগজনক। স্থানীয় ১০টি সক্রিয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এবং আরসা ও আরাকান সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের মতো সংগঠনগুলোর তৎপরতা কক্সবাজার অঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ক্যাম্পের ভেতরে বসে যারা মাদকের ডিল করছে, তাদের সঙ্গে সীমান্তের ওপারের সরাসরি যোগাযোগ থাকার বিষয়টি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
আমাদের করণীয়:
বিজিবি ও কোস্টগার্ডের রাত-দিন পরিশ্রম ও টহল সত্ত্বেও ২৭১ কিলোমিটার দীর্ঘ দুর্গম সীমান্ত পুরোপুরি নিশ্ছিদ্র করা কঠিন। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে গতানুগতিক ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
১. পণ্যের উৎস বন্ধ করা: সীমান্ত দিয়ে সার, জ্বালানি বা খাদ্যপণ্য যাতে কোনোভাবেই পাচার হতে না পারে, সে জন্য চেকপোস্টগুলোতে তল্লাশি জোরদার করতে হবে। দেশের অভ্যন্তরে কারা এসব পণ্য সীমান্তে জড়ো করছে, সেই ‘ঘরের শত্রু’ সিন্ডিকেটগুলোকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
২. গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি: রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি আরও বাড়ানো প্রয়োজন। সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর অর্থের উৎস (মাদক) বন্ধ করতে না পারলে তাদের অস্ত্রবাজি থামানো যাবে না।
৩. কূটনৈতিক ও কৌশলগত চাপ: আরাকান আর্মির সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক বা কৌশলগত বার্তা বিনিময়ের মাধ্যমে এটি স্পষ্ট করতে হবে যে, বাংলাদেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে কোনো বাণিজ্যিক সম্পর্ক বা প্রতিবেশীসুলভ আচরণ আশা করা যায় না।
৪. জনসম্পৃক্ততা: স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও জনগণকে সম্পৃক্ত করে মাদকবিরোধী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। সীমান্ত এলাকার মানুষ সচেতন না হলে কেবল বন্দুক দিয়ে এই স্রোত ঠেকানো সম্ভব নয়।
মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। কিন্তু সেই যুদ্ধের রসদ জোগাতে গিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি রক্তশূন্য হবে এবং যুবসমাজ মাদকে বুঁদ হয়ে থাকবে—তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। সরকারের নীতিনির্ধারকদের এখনই এই ‘বিনিময় বাণিজ্যের’ শিকড় উপড়ে ফেলতে কঠোরতম সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সময়ক্ষেপণের আর কোনো সুযোগ নেই।
রিপোর্টারের নাম 
























