নাটোরের লালপুর উপজেলার নান্দরায়পুর গ্রামের জান্নাতুল ফেরদৌস ফারিহা মনি প্রতিকূলতাকে জয় করে জাতীয় ফুটবলে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। দারিদ্র্য, সামাজিক বাধা এবং নানা সমালোচনাকে পেছনে ফেলে তিনি ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ আয়োজিত জাতীয় অনূর্ধ্ব-১৪ মেয়েদের ফুটবল প্রতিযোগিতায় ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট নির্বাচিত হয়ে লালপুরের জন্য এক বিরল সম্মান বয়ে এনেছেন।
ফারিহার এই অর্জন সহজ ছিল না। ভোরের আলো ফোটার আগেই কুয়াশাচ্ছন্ন কাঁচা মাটির পথ ধরে সাইকেল চালিয়ে অনুশীলনে যাওয়া, সংসারের কাজে সহায়তা করা এবং সমাজের ‘মেয়ে হয়ে ফুটবল খেলবে কেন?’ এমন সব কটূক্তিকে তিনি সাহসিকতার সঙ্গে মোকাবিলা করেছেন। তার চোখে ছিল কেবল দেশের হয়ে খেলার স্বপ্ন।
রাজশাহী বিভাগের হয়ে খেলার সময় ফারিহা দলের প্রধান শক্তি ছিলেন। বরিশাল বিভাগের বিপক্ষে ৫-০ গোলের জয়ে তিনি একাই ৪টি গোল করেন। সেমিফাইনালে খুলনা বিভাগের বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানে জয়লাভের ম্যাচেও তিনি ১টি গোল করেন। দুই ম্যাচে দলের মোট ৭ গোলের মধ্যে ৫টিই আসে তার অসাধারণ নৈপুণ্যে। যদিও ফাইনালে শিরোপা জয় অধরা থেকে যায়, কিন্তু টুর্নামেন্ট জুড়ে তার অনবদ্য পারফরম্যান্স বিচারকদের মুগ্ধ করে এবং তাকে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সম্মান এনে দেয়।
গতকাল সোমবার ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী চ্যাম্পিয়ন ও রানারআপ দলের খেলোয়াড়দের হাতে পুরস্কার তুলে দেন। হাজার হাজার দর্শকের করতালির মধ্যে লালপুরের এই সংগ্রামী কিশোরী ফারিহা ‘ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট’ সম্মাননা গ্রহণ করেন।
এই সম্মাননা অর্জনের পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ ও কঠিন সংগ্রামের ইতিহাস। ফারিহার বাবা মুকুল মণ্ডল বাকপ্রতিবন্ধী এবং মা আজেলা বেগম এলজিইডির দিনমজুর হিসেবে কাজ করে পাঁচ সদস্যের পরিবার চালান। অভাবের সংসারে ভালো মানের বুট, অনুশীলনের খরচ বা যাতায়াতের ভাড়া জোগাড় করা ছিল অত্যন্ত কঠিন। তবুও দারিদ্র্য তার স্বপ্নকে কখনো ম্লান করতে পারেনি।
সংসারের প্রয়োজনে তিনি ভাইয়ের সঙ্গে মাঠে কাজ করেছেন এবং পচা পানিতে নেমে পাট ধুয়েছেন। দিনের পরিশ্রমের পর ক্লান্ত শরীর নিয়েই প্রতিদিন প্রায় আট কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে লালপুরের ‘নর্থ বেঙ্গল ফুটবল একাডেমিতে’ অনুশীলনে যেতেন। অর্থকষ্টের চেয়েও বড় বাধা ছিল সমাজের একপেশে মানসিকতা, যেখানে ‘মেয়ে হয়ে হাফপ্যান্ট পরে খেলতে হবে’ এমন ধরনের মন্তব্য তাকে প্রতিনিয়ত শুনতে হয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 


















