ঢাকা ১১:৪৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

ব্যাংকিং খাতে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে খেলাপি ঋণ: তিন মাসে ৩১ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অর্থনীতির জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন ছাড় দিলেও খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হয়েছে। গত তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) দেশের ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ৪৪টিতেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে, যার সম্মিলিত পরিমাণ ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, একসঙ্গে এতগুলো ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি এর আগে কখনো দেখা যায়নি।

কর্মকর্তারা জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যবসা-বাণিজ্য চাপের মধ্যে থাকায় ঋণ আদায় কমে গেছে। এছাড়াও, ডিসেম্বর প্রান্তিকে অনেক ব্যাংক খেলাপি ঋণের পরিমাণ কম দেখিয়েছিল, যা পরবর্তীকালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে উদঘাটিত হয়েছে। এসব কারণে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ মাস শেষে ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। এর বিপরীতে, গত ডিসেম্বর মাস শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল পাঁচ লাখ ৫৭ হাজার ২৭১ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। অর্থাৎ, মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ২ শতাংশীয় পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ছয়টি সরকারি ব্যাংকের মধ্যে চারটিতেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে। মার্চ মাস শেষে এসব ব্যাংকের সম্মিলিত খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৪৯ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা বা মোট ঋণের ৪৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ। ডিসেম্বর শেষে এই পরিমাণ ছিল এক লাখ ৪৬ হাজার ১০৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ, তিন মাসে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে তিন হাজার ৬৭৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল ৭২ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা (৭৪.০৭ শতাংশ), যা মার্চে ২ হাজার ৪৫৮ কোটি টাকা বেড়ে ৭৪ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকায় (৭৩.৯৪ শতাংশ) দাঁড়িয়েছে। এছাড়া, রূপালী ব্যাংকের ৬৮৮ কোটি টাকা, অগ্রণী ব্যাংকের ২৮৪ কোটি টাকা এবং বেসিক ব্যাংকের ১১ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

বেসরকারি ব্যাংক খাতেও খেলাপি ঋণের চিত্র উদ্বেগজনক। চলতি বছরের মার্চ শেষে ৪৩টি বেসরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ চার লাখ ১৬ হাজার ৪৮২ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ১১ শতাংশ। ডিসেম্বর শেষে এই পরিমাণ ছিল তিন লাখ ৮৯ হাজার ৫৭৯ কোটি টাকা বা ২৮ দশমিক ২৫ শতাংশ। এর অর্থ হলো, গত তিন মাসে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২৬ হাজার ৯০৩ কোটি টাকা। বেসরকারি খাতের ৪৩টি ব্যাংকের মধ্যে ৩৪টিতেই খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

সৌদি আরবের নতুন প্যাকেজ ভিসা: বাংলাদেশসহ ৭ দেশের পর্যটকদের জন্য সুবর্ণ সুযোগ

ব্যাংকিং খাতে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে খেলাপি ঋণ: তিন মাসে ৩১ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি

আপডেট সময় : ১০:৫৯:০৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৭ জুন ২০২৬

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অর্থনীতির জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন ছাড় দিলেও খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হয়েছে। গত তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) দেশের ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ৪৪টিতেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে, যার সম্মিলিত পরিমাণ ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, একসঙ্গে এতগুলো ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি এর আগে কখনো দেখা যায়নি।

কর্মকর্তারা জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যবসা-বাণিজ্য চাপের মধ্যে থাকায় ঋণ আদায় কমে গেছে। এছাড়াও, ডিসেম্বর প্রান্তিকে অনেক ব্যাংক খেলাপি ঋণের পরিমাণ কম দেখিয়েছিল, যা পরবর্তীকালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে উদঘাটিত হয়েছে। এসব কারণে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ মাস শেষে ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। এর বিপরীতে, গত ডিসেম্বর মাস শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল পাঁচ লাখ ৫৭ হাজার ২৭১ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। অর্থাৎ, মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ২ শতাংশীয় পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ছয়টি সরকারি ব্যাংকের মধ্যে চারটিতেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে। মার্চ মাস শেষে এসব ব্যাংকের সম্মিলিত খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৪৯ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা বা মোট ঋণের ৪৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ। ডিসেম্বর শেষে এই পরিমাণ ছিল এক লাখ ৪৬ হাজার ১০৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ, তিন মাসে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে তিন হাজার ৬৭৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল ৭২ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা (৭৪.০৭ শতাংশ), যা মার্চে ২ হাজার ৪৫৮ কোটি টাকা বেড়ে ৭৪ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকায় (৭৩.৯৪ শতাংশ) দাঁড়িয়েছে। এছাড়া, রূপালী ব্যাংকের ৬৮৮ কোটি টাকা, অগ্রণী ব্যাংকের ২৮৪ কোটি টাকা এবং বেসিক ব্যাংকের ১১ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

বেসরকারি ব্যাংক খাতেও খেলাপি ঋণের চিত্র উদ্বেগজনক। চলতি বছরের মার্চ শেষে ৪৩টি বেসরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ চার লাখ ১৬ হাজার ৪৮২ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ১১ শতাংশ। ডিসেম্বর শেষে এই পরিমাণ ছিল তিন লাখ ৮৯ হাজার ৫৭৯ কোটি টাকা বা ২৮ দশমিক ২৫ শতাংশ। এর অর্থ হলো, গত তিন মাসে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২৬ হাজার ৯০৩ কোটি টাকা। বেসরকারি খাতের ৪৩টি ব্যাংকের মধ্যে ৩৪টিতেই খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।