দেশের কোটি কোটি মোবাইল ব্যবহারকারী প্রতিনিয়ত ভুয়া বা স্প্যাম কলের শিকার হচ্ছেন, যা মুহূর্তেই আর্থিক বিপর্যয় ডেকে আনছে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, যদিও বাংলাদেশে ভুয়া কলের আর্থিক ক্ষতির সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান অপ্রতুল, এর ভয়াবহতা চরম আকার ধারণ করেছে। সংগঠিত অপরাধী চক্র, অবৈধ ভিওআইপি ব্যবহারকারী এবং অনিয়ন্ত্রিত টেলিমার্কেটিং সংস্থাগুলো মূলত এই প্রতারণার জন্য দায়ী, যা বিশেষ করে মোবাইল আর্থিক সেবার (এমএফএস) প্রতি জনগণের আস্থাকে তীব্রভাবে আঘাত করছে।
🛡️ সিএনএপি এবং সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা
এই সংকট মোকাবিলায় বিশ্বজুড়ে কার্যকর সমাধান হিসেবে কলিং নেম প্রেজেন্টেশন (সিএনএপি) প্রযুক্তি ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সিএনএপি এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে কলারের নম্বর নয়, বরং তার কেওয়াইসি যাচাইকৃত বৈধ নাম রিসিভারের স্ক্রিনে প্রদর্শিত হয়। এর ফলে কল স্পুফিং করলেও প্রতারক তার আসল পরিচয় লুকাতে পারে না। প্রতিবেশী দেশ ভারতও এই সেবা বাধ্যতামূলক করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। সিএনএপি-এর পরিপূরক প্রযুক্তি হিসেবে STIR/SHAKEN ফ্রেমওয়ার্ক (যা কলের বৈধতা নিশ্চিত করে) এবং এআই ও মেশিন লার্নিং মডেল (যা অস্বাভাবিক কল প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করে স্প্যাম ব্লক করে) চালু করার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
📝 বিটিআরসি’র প্রতি কৌশলগত সুপারিশমালা
নাগরিকদের অর্থ ও আস্থার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিটিআরসিকে অবিলম্বে সিএনএপি চালুর জন্য দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে এবং নিম্নলিখিত বহুমাত্রিক কৌশলগুলো গ্রহণ করতে সুপারিশ করা হয়েছে:
- নীতিগত সংস্কার ও কঠোরতা: সিএনএপি-কে সকল গ্রাহকের জন্য ডিফল্ট এবং বিনামূল্যে নিরাপত্তা পরিষেবা হিসেবে চালু করতে হবে। স্পুফিংয়ের বিরুদ্ধে সাইবার নিরাপত্তা আইনে জরিমানা বৃদ্ধি ও আইনি কঠোরতা আনতে হবে। প্রতারণামূলক কল রিপোর্ট করার জন্য একটি কেন্দ্রীয় জাতীয় গ্রাহক অভিযোগ ও প্রতিরোধ রেজিস্ট্রি (এনসিপিআর) প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
- প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান: প্রতারণার রিপোর্ট পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অপরাধীর অবস্থান দ্রুত শনাক্ত করার জন্য উন্নত কল ট্রেসিং প্রোটোকল স্থাপন করতে হবে। স্পুফিং নির্মূল করতে STIR/SHAKEN ফ্রেমওয়ার্ক চালুর রোডম্যাপ তৈরি এবং কেন্দ্রীয় এআই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে রিয়েল-টাইমে স্প্যাম নম্বর ব্লক করার নির্দেশ দিতে হবে। অপরাধমূলক কাজে ব্যবহৃত সিমগুলোর ওপর কঠোর নিরীক্ষা প্রয়োজন।
- সাংগঠনিক বাস্তবায়ন ও জ্ঞান বিনিময়: সিএনএপি চালুর জন্য প্রথমে একটি পাইলট প্রজেক্ট শুরু করা যেতে পারে। প্রযুক্তিগত জ্ঞান বিনিময়ের জন্য ভারতসহ অন্যান্য দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা যেতে পারে।
- নাগরিক অধিকার ও প্রতিকার: নিয়ন্ত্রক ব্যর্থতার কারণে প্রতারিত গ্রাহককে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য একটি সাইবার প্রতারণা ক্ষতিপূরণ ফান্ড প্রতিষ্ঠা করা এবং মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ফাস্ট-ট্র্যাক ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করা জরুরি।
- জনসচেতনতা সৃষ্টি: ‘ওটিপি নয়, আপনার পিন আপনার টাকা’ এই ধরনের সহজ বার্তা নিয়মিত প্রচার করতে হবে এবং প্রতারিত হলে তাৎক্ষণিক ব্যাংক/এমএফএস সেবাদাতাকে অবহিত করে লেনদেন স্থগিত করার জন্য নাগরিকদের সচেতন করতে হবে।
সুপারিশ করা হয়েছে যে, ডিজিটাল রূপান্তরের পথে নাগরিকের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে অবশ্যই মোবাইল অপারেটরদের বাণিজ্যিক সুবিধার চেয়ে নাগরিকদের বৃহত্তর স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে।
রিপোর্টারের নাম 

























