সোমালিয়ার উপকূলে পালাউয়ের পতাকাবাহী একটি বাণিজ্যিক তেলবাহী ট্যাংকারের পাঁচজন বিদেশি নাবিককে নির্মমভাবে হত্যা করেছে সোমালি জলদস্যুরা। দেশটির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার বরাতে জানা যায়, অপহৃত তেল ট্যাংকার ‘এমটি অনার ২৫’ (MT Honor 25)-এ সংঘটিত এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়। তবে নিরাপত্তা বাহিনীর সমন্বিত উদ্ধার অভিযান শুরু হওয়ার পূর্বেই জাহাজের ভেতরে এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সোমালি জলদস্যুদের হাতে কোনো জাহাজের নাবিকদের প্রাণ হারানোর ঘটনা এটিই প্রথম। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সোমালিয়ার কৌশলগত উপকূলীয় সমুদ্রসীমায় জলদস্যুতার প্রবণতা আবারও আশঙ্কাজনকভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধাবস্থার কারণে আন্তর্জাতিক নজরদারি ভিন্ন খাতে চলে যাওয়া এই জলদস্যুতা পুনরুজ্জীবিত হওয়ার পেছনে আংশিকভাবে ভূমিকা রেখেছে।
এর আগে গত ২১ এপ্রিল সোমালিয়ার উপকূলীয় জলসীমা থেকে ১৮ হাজার ৫০০ ব্যারেল তেলবাহী এই ট্যাংকার ‘এমটি অনার ২৫’ ছিনতাই করেছিল জলদস্যুরা।
সোমালিয়ার আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল পুন্টল্যান্ডের (Puntland) তথ্য মন্ত্রণালয় এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছে যে, তাদের নিরাপত্তা বাহিনীর সফল সামরিক অভিযানের মাধ্যমে জাহাজটিকে জলদস্যুদের কবল থেকে মুক্ত করা সম্ভব হয়েছে এবং এ সময় ১৬ জন সন্দেহভাজন জলদস্যুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তবে মন্ত্রণালয় অত্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করে জানিয়েছে, অভিযান শুরু করার আগেই জলদস্যুরা জাহাজের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার প্রক্রিয়ায় পাঁচজন নিরীহ নাবিককে গুলি করে হত্যা করে। নিহতদের মধ্যে তিনজন পাকিস্তানি, একজন মিয়ানমারের এবং অপর একজন ভারতীয় নাগরিক।
এছাড়া এই হামলায় জাহাজের আরও চারজন নাবিক গুরুতর আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে তিনজন পাকিস্তানি এবং একজন ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন।
পুন্টল্যান্ডের বিশেষায়িত সামুদ্রিক পুলিশ বাহিনী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া জাহাজটি বর্তমানে পুরোপুরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত ‘নিরাপদ’ অবস্থায় রয়েছে। একই সাথে এই চাঞ্চল্যকর ছিনতাইয়ের ঘটনার সঙ্গে নেপথ্যে যুক্ত থাকা চক্রের অন্যান্য সদস্যদের দ্রুত খুঁজে বের করতে বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
উল্লেখ্য, সামুদ্রিক পুলিশ গত সপ্তাহেই আরেকটি বড় সামরিক অভিযান চালিয়ে জলদস্যুদের কবলে থাকা ‘সিবু ওয়ান’ নামের আরেকটি বাণিজ্যিক ট্যাংকার উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা ওই ট্যাংকারটি গত আগস্ট মাসে ছিনতাই করেছিল সোমালি জলদস্যুরা।
সেই অভিযানে ৪১ জন জলদস্যুকে গ্রেপ্তার করেছিল স্থানীয় নৌ পুলিশ। তবে অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, পরবর্তীতে আটককৃতদের কারাগারে হস্তান্তরের প্রক্রিয়ার সময় তাদের মধ্যে ২৮ জন জলদস্যু পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। পুন্টল্যান্ডের একাধিক জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা এই নাটকীয় পলায়নের জন্য স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের ভেতরের দুর্নীতি ও দুর্বলতাকে সরাসরি দায়ী করেছেন।
উপকূলীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল মাস থেকে এ পর্যন্ত সোমালিয়ার উপকূলে বিভিন্ন বাণিজ্যিক জাহাজে অন্তত ১৫টি জলদস্যু হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময়জুড়ে সোমালিয়ার উপকূলে জলদস্যুদের ধারাবাহিক তাণ্ডবে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ততম আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল রুট চরম অনিরাপদ হয়ে পড়েছিল। এর ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে শত শত কোটি ডলারের ক্ষতিসাধিত হয় এবং বিপরীতে নিজেদের অপহৃত জাহাজ ও নাবিকদের মুক্ত করতে বিভিন্ন সংস্থাকে জলদস্যুদের হাতে কোটি কোটি ডলারের মুক্তিপণ তুলে দিতে হয়েছিল।
























