বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত পারমাণবিক সমঝোতা স্মারকটি (এমওইউ) মূল বিষয়বস্তু হলো—দুই দেশের সংশ্লিষ্ট সরকারি দফতর, পারমাণবিক নিয়ন্ত্রণ সংস্থা, বিশেষজ্ঞ ও অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বেসামরিক পারমাণবিক প্রযুক্তি খাতসহ কৌশলগত সহযোগিতার নতুন পথ অনুসরণের আইনি সুযোগ তৈরি করা।
এই দ্বিপক্ষীয় স্মারকটির বদৌলতে পারমাণবিক প্রযুক্তিতে উন্নত মানবসম্পদ ও নীতি নির্ধারণ, বিশ্বমানের নিরাপত্তা প্রোটোকল বাস্তবায়ন এবং সুদূর ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পরমাণু জ্বালানি ও প্রযুক্তি আমদানির ক্ষেত্র উন্মোচিত হবে।
তবে গত ২৫ সেপ্টেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে স্বাক্ষরিত এই দ্বিপক্ষীয় চুক্তিটি কোনো পক্ষের ওপরই আইনি বাধ্যবাধকতা চাপিয়ে দেয় না। এটি আইনি বাধ্যতামূলক কোনো চুক্তি না হওয়ায় কেবল এই স্মারকের ভিত্তিতেই সরাসরি পারমাণবিক উপাদান বা ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করা সম্ভব নয়।
মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের দেওয়া বিবরণ অনুযায়ী, এই ধরনের সাধারণ সমঝোতা স্মারকসমূহ মূলত কোনো নির্দিষ্ট দেশের সাথে পারমাণবিক সরঞ্জাম ও উপাদান আদান-প্রদানের পূর্বশর্ত বা নিয়মকানুন নির্ধারণ করার কাঠামোগত ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
তাহলে এই সমঝোতা স্মারকে প্রকৃতপক্ষে কী রয়েছে? সহজ ভাষায়, পারমাণবিক শক্তিকে কীভাবে বেসামরিক ও শান্তিকাজে ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়ে দুই দেশের সরকারি-বেসরকারি দফতর ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আলোচনার একটি আইনি ও রাজনৈতিক দুয়ার খুলে দিয়েছে এই সমঝোতা। এটি মূলত বিখ্যাত ‘১২৩ চুক্তি’ (123 Agreement) সম্পাদন করার প্রাথমিক পদক্ষেপ।
পাঁচ পৃষ্ঠার এই বিশেষ নথিতে কৌশলগত ও প্রযুক্তিগত আগ্রহের দিকসমূহ এবং পারমাণবিক সুরক্ষার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড তুলে ধরা হয়েছে।
নথির ‘কৌশলগত বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা’ শিরোনামের সূচনায় বলা হয়েছে, অংশগ্রহণকারী দেশ দুটির জ্বালানি নিরাপত্তা বিধান এবং তাদের পারস্পরিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সুদৃঢ় করতে পারমাণবিক শক্তি বিশেষ অবদান রাখতে পারে। স্মারকে দুই দেশেরই সরকারি ও বেসরকারি খাতের কর্মকর্তাদের মধ্যকার পারস্পরিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
স্মারকের প্রস্তাবনায় ১৯৮১ সালে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার সংক্রান্ত দ্বিপক্ষীয় চুক্তিটির’ কথা স্মরণ করা হয়েছে, যা ১৯৫৪ সালের মার্কিন অ্যাটমিক এনার্জি অ্যাক্টের ‘১২৩ ধারা’ অনুযায়ী সম্পাদিত একটি চুক্তি ছিল। পরবর্তীতে ওই চুক্তিটির নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হয়ে যায়।
উল্লেখ্য, ১৯৫৪ সালের মার্কিন অ্যাটমিক এনার্জি অ্যাক্টের ১২৩ ধারাটি পারমাণবিক উপাদানের সুরক্ষা ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার বিধিনিষেধ নিশ্চিত করে। এর অধীনে হস্তান্তরিত পরমাণু প্রযুক্তি ‘কোনো ধরনের বিস্ফোরক, অস্ত্র বা সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার’ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
ক্ষুদ্র রিঅ্যাক্টর ও বাণিজ্যিক দিক সমঝোতা স্মারকের প্রথম দফায় জাতীয় ও সাইবার নিরাপত্তা বিধান, সরকারি সংস্থা ও পরমাণু নিয়ন্ত্রকদের মধ্যে সমন্বয়, বিধিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং সর্বোচ্চ স্তরের সুরক্ষা নীতি মেনে চলার মতো অগ্রাধিকার বিষয়গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে।
এর সার্বিক লক্ষ্য হলো—ভবিষ্যতে বাংলাদেশে মার্কিন কোম্পানিগুলোর ছোট-বড় রিঅ্যাক্টর নির্মাণ বা ইউরেনিয়াম বিক্রির উপযোগী স্থানীয় পরিবেশ, আইনি অবকাঠামো ও প্রোটোকল নিশ্চিত করা।
প্রথম ধারার দুটি বিশেষ উপধারায় মার্কিন আগ্রহের দুটি প্রধান দিক উন্মোচিত হয়েছে:
১. নতুন প্রযুক্তির সংযোজন: এতে ‘স্মল মডুলার রিঅ্যাক্টর (SMR)’ বা উন্নত প্রযুক্তির ছোট পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে সহযোগিতার কথা রয়েছে। ছোট আকৃতির এই রিঅ্যাক্টরগুলো তৈরি করা সহজ, কম জায়গা নেয় এবং সর্বোচ্চ ৩০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। এর সাথে সম্পর্কিত ‘অর্থায়ন’ (সম্ভাব্য মার্কিন ঋণসুবিধা), ‘স্থানীয়করণ’ (স্থানীয়ভাবে পারমাণবিক স্থাপনা পরিচালনা ও টেকনিশিয়ান তৈরির সক্ষমতা) এবং ‘পারমাণবিক দায়বদ্ধতা’ (কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে আইনি ও আর্থিক ক্ষতিপূরণের বাধ্যবাধকতা) সংক্রান্ত জটিল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার আগ্রহ প্রকাশ পেয়েছে।
২. প্রযুক্তি ও সেবার সুযোগ: এতে মার্কিন বেসামরিক পরমাণু প্রযুক্তি, জ্বালানি ও সরঞ্জাম ক্রয়ের আলোচনার সুযোগের কথা বলা হয়েছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে এর প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এই চুক্তি করার ফলে কি রাশিয়ার সহায়তায় নির্মিত পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইউরেনিয়াম কিনতে হবে? সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো—‘না’। এই স্মারকের কারণে রূপপুর প্রকল্পের বিদ্যমান নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসবে না।
নথির দ্বিতীয় ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, এই স্মারক আন্তর্জাতিক বা দেশীয় আইনের আওতায় কোনো বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করে না। তদুপরি, প্রধানমন্ত্রী তথ্য উপদেষ্টাও নিশ্চিত করেছেন যে, এই নথির কারণে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ ও পরিচালনায় কোনো ধরনের নেতিবাচক বা বাধ্যবাধকতামূলক প্রভাব পড়বে না।
এছাড়া, পঞ্চম দফায় উল্লেখ করা হয়েছে, এই চুক্তিটি সই করার কারণে দুই দেশের কোনো পক্ষকেই অন্যান্য দেশের সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাথে একই ধরনের পরমাণু কার্যক্রমে অংশ নিতে বাধা দেবে না। অর্থাৎ বাংলাদেশ অন্যান্য দেশের সাথেও পারমাণবিক সহযোগিতা বজায় রাখতে স্বাধীন।
ফিলিপাইন ও অন্যান্য দেশের নজির ২০২২ সালে ফিলিপাইনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটির কাঠামোর সাথে বাংলাদেশের চুক্তিটির বেশ মিল রয়েছে। ফিলিপাইনের চুক্তিটির ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালে উভয় দেশ ‘১২৩ চুক্তি’ সম্পাদন করে এবং ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তা বাস্তবায়িত হয়। তবে বাংলাদেশের স্মারকে উভয় দেশ চাইলে বেসামরিক পারমাণবিক খাতের অন্যান্য বহুমুখী ক্ষেত্রে সহযোগিতার পরিধি বাড়াতে পারবে।
মেয়াদ ও গোপনীয়তার বিশেষ শর্ত এই সমঝোতা স্মারকের প্রাথমিক মেয়াদ ৫ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। কোনো পক্ষ যদি ৬ মাস আগে লিখিত নোটিশ দিয়ে এটি বাতিল না করে, তবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরবর্তী ৫ বছরের জন্য মেয়াদ বাড়তে থাকবে।
নথিতে একটি স্পর্শকাতর গোপনীয়তার ধারা যুক্ত রয়েছে। আইনগত ভিন্নতা না থাকলে, এক পক্ষের লিখিত সম্মতি ছাড়া অপর পক্ষ কোনো তৃতীয় পক্ষ বা দেশের কাছে এই সমঝোতা স্মারকের কোনো ধারা বা এর বাস্তবায়নের নথিপত্র প্রকাশ করতে পারবে না।
উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র এই বিশেষ ‘পারমাণবিক সমঝোতা স্মারক (NCAU)’ কর্মসূচিটি চালু করেছিল। ২০২১ সালে জাতিসংঘের প্রকাশিত তথ্যমতে, বুলগেরিয়া, ঘানা, পোল্যান্ড, রোমানিয়া এবং স্লোভেনিয়ার মতো দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এই একই ধরনের স্মারক স্বাক্ষর করেছে।























