বাংলাদেশে অবস্থান করেই চীনা ভাষা ‘ম্যান্ডারিন’ চর্চা শুরু করেছিলেন গাজীপুরের বাসিন্দা নাজমুল ইশতিয়াক (নাহিদ)। মাত্র ছয় মাসের মধ্যে ভাষাটির প্রাথমিক পর্যায় সম্পন্ন করে ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে একটি চীনা মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। সেখানে চীনা সহকর্মীদের সাথে নিয়মিত কাজের সুবাদে তাঁর ভাষাগত দক্ষতা দ্রুত বিকাশ লাভ করে। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে তিনি পদোন্নতি পান এবং শেষ পর্যন্ত এই বিশেষ ভাষাজ্ঞানই তাঁকে পেশাগত প্রয়োজনে চীনে নিয়ে যায়।
বর্তমানে তিনি চীনের শাওসিং শহরে অবস্থিত ‘শাওশিং বাইবু টেক্সটাইল কোম্পানি লিমিটেড’-এর রিজিয়নাল ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে তাঁর ভাষা শেখার পথচলা শুরুতে এতটা সহজ ছিল না। ২০২২ সালের শুরুর দিকে দেশীয় একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে দুই মাসের প্রাথমিক কোর্স নেন নাজমুল। এরপর প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ করা পাঠ্যবই দেখে নিজেই নিয়মিত অধ্যবসায় চালিয়ে যান। ধাপে ধাপে বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে ছয় মাসের মধ্যেই ভাষাটির ওপর প্রয়োজনীয় দখল নিয়ে আসেন তিনি।
নাজমুল জানান, ২০২২ সালের মাঝামাঝি চাকরি পাওয়ার পর চীনা নাগরিকদের সাথে সার্বক্ষণিক কথোপকথনের সুযোগ পাওয়াটাই তাঁর ভাষা দ্রুত শেখার মূল কারণ হয়ে ওঠে। পদোন্নতি পাওয়ার পর ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি তাঁকে সরাসরি চীনে নিয়ে আসে। বর্তমানে তিনি রিজিয়নাল ম্যানেজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ সামলাচ্ছেন। প্রতিষ্ঠানের মালিক তাঁকে অত্যন্ত আপন করে নিয়েছেন, যার একমাত্র ভিত্তি ছিল এই ম্যান্ডারিন ভাষা। তাঁর মতে, ভাষা না জানলে ক্যারিয়ারে এতটা পথ পাড়ি দেওয়া কখনই সম্ভব হতো না।
নাজমুল ইশতিয়াকের এই অনন্য সাফল্য এখন আর কোনো একক দৃষ্টান্ত নয়। চীনের সাথে বাংলাদেশের শিক্ষা, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, সরাসরি বিনিয়োগ এবং পারস্পরিক যোগাযোগ যত বাড়ছে, ম্যান্ডারিন জানা বাংলাদেশিদের জন্য ততই বিস্তৃত সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হচ্ছে। ভাষা শিখে অনেকে চীনে পেশাগত সাফল্য পাচ্ছেন, অনেকে বৃত্তি নিয়ে উচ্চশিক্ষায় পাড়ি জমাচ্ছেন, আবার কেউ কেউ স্বাধীনভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। এমনকি চীনে বসবাসরত সাধারণ বাংলাদেশিরাও নিজেদের কাজের পরিবেশ সহজ ও স্বাভাবিক রাখতে ম্যান্ডারিন শিখছেন।
চীনের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি দিন দিন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রযুক্তি, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন ফলিত বিষয়ে তাঁরা পড়াশোনা করছেন। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় উৎসাহিত করতে চীনের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকার ছাড়াও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় আকর্ষণীয় শিক্ষাবৃত্তি প্রদান করছে। চীনা দূতাবাসের আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশটির বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ২০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন।
অন্যদিকে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) ২০২৬ সালের হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে ৫১০টিরও বেশি চীনা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সরাসরি তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। চীনা দূতাবাসের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এসব দেশীয় শিল্প ও অবকাঠামো প্রতিষ্ঠানে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ বাংলাদেশির কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয়েছে।
ফলে দুই দেশের পারস্পরিক মেলবন্ধন কেবল আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক বৈঠক কিংবা শ্রেণিকক্ষেই সীমাবদ্ধ নেই। একদিকে যেমন চীনে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে বাংলাদেশেও চীনা কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগের পরিধি বাড়ছে। এই সামগ্রিক বাস্তবতায় সরাসরি সংযোগ স্থাপনের শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ম্যান্ডারিন ভাষা একটি কার্যকর ও প্রভাবশালী দক্ষতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ভাষার বাড়তি সুবিধা
২০২৪ সালে ম্যান্ডারিনের প্রাথমিক পাঠ শেষ করে একই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে চীনে পাড়ি জমান রাজশাহীর তরুণ সাদিকুল ইসলাম। বর্তমানে তিনি দেশটির জিয়াংজি প্রদেশে অবস্থিত পূর্ব চীন প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ECUT) ইলেকট্রনিক ইনফরমেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে তৃতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছেন।
নিজের অভিজ্ঞতার বিবরণ দিয়ে সাদিকুল ইসলাম জানান, চীনে যাওয়ার সার্বিক প্রস্তুতি তিনি বাংলাদেশ থেকেই শুরু করেছিলেন। ২০২৪ সালের মে মাসে ম্যান্ডারিন শেখা শুরু করেন, যার মূল লক্ষ্য ছিল দেশ ছাড়ার আগেই ভাষার একটি প্রাথমিক ভিত গড়ে তোলা। দেশে চার মাস শেখার পর সেপ্টেম্বরে চীনে পৌঁছানোর পর তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন করে চীনা ভাষা শেখার প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ পান।
তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে থাকার সময়ই তিনি এইচএসকে-১ (HSK-1) স্তর সম্পন্ন করেছিলেন। তবে চীনে পৌঁছানোর পর তিনি বুঝতে পারেন, শ্রেণিকক্ষে বই পড়ে ভাষা শেখা এবং স্থানীয় নাগরিকদের সাথে সরাসরি কথা বলার মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে। শুরুর দিকে স্থানীয়দের দ্রুতগতির উচ্চারণের কারণে কিছুটা জড়তা তৈরি হতো। সেই জড়তা কাটিয়ে উঠতে তিনি চীনা সহপাঠীদের সাথে আড্ডা দেওয়া, স্থানীয় দোকানপাটে কেনাকাটা করা কিংবা রেস্তোরাঁয় খাবারের অর্ডার দেওয়ার মতো দৈনন্দিন কাজে সরাসরি ম্যান্ডারিন ব্যবহার শুরু করেন। ভুলত্রুটি সত্ত্বেও নিয়মিত অনুশীলনের কারণে অল্প সময়ে তাঁর আত্মবিশ্বাস ও যোগাযোগ সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
তিনি আরও জানান, চীনে যাওয়ার পর ভাষা ছাড়াও স্থানীয় খাদ্যাভ্যাস, সংস্কৃতি ও জীবনধারা সম্পূর্ণ ভিন্ন মনে হয়েছিল। কিন্তু স্থানীয় সহপাঠীদের আন্তরিক সহযোগিতায় তিনি দ্রুত মানিয়ে নিতে পেরেছেন। এখন তাঁকে আর কোনো দোভাষী বা ডিজিটাল অনুবাদ অ্যাপের ওপর নির্ভর করতে হয় না; কেনাকাটা ও যাতায়াতসহ প্রাত্যহিক সব কাজ তিনি নিজেই স্বাচ্ছন্দ্যে সামলাতে পারছেন। এতে সংস্কৃতির গভীরে প্রবেশ যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি স্থানীয়দের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। তাঁর অভিমত, চীনে দীর্ঘমেয়াদে বসবাস বা উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা থাকলে দেশ থেকেই প্রাথমিক ভাষা শিখে নেওয়া সবচেয়ে ফলপ্রসূ কৌশল।
ভাষাশিক্ষায় সরকারি বৃত্তির সুযোগ
২০২৫ সালে ছয় মাসের ম্যান্ডারিন ভাষা কোর্সে অংশ নিতে চীনে গমন করেন কুমিল্লার তরুণ ফয়সাল আহমেদ। ভাষা কোর্স সফলভাবে সম্পন্ন করার পর বর্তমানে তিনি ‘জিয়াংসু ইনস্টিটিউট অব কমার্স’-এ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিষয়ে ডিপ্লোমা কোর্সে অধ্যয়ন করছেন। ফয়সাল জানান, তিনি প্রতিষ্ঠানটিতে স্কলারশিপের আওতায় পড়াশোনা করছেন। দেশ থেকে ভাষা শিখে আসা কিংবা সরাসরি চীনে এসে প্রাথমিক ভাষা কোর্স করা—উভয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্যই সেখানে সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে নানামুখী সুযোগ-সুবিধা বিদ্যমান।
এইচএসকে-৪ অর্জনে উন্মুক্ত হচ্ছে স্কলারশিপের দ্বার
চীনের ‘গান্নান নরমাল ইউনিভার্সিটি’ থেকে সম্প্রতি কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন বগুড়ার মো. ইনফিতার ইসলাম।
চীনা ভাষার দক্ষতা ও বৃত্তির সুযোগ সম্পর্কে তিনি জানান, প্রচলিত ধারায় চীনা ভাষার মোট ছয়টি দক্ষতার স্তর (HSK-1 থেকে HSK-6) রয়েছে। এর মধ্যে কোনো শিক্ষার্থী যদি HSK-4 স্তর অর্জন করতে পারেন, তবে তাঁর জন্য ডিপ্লোমা, ব্যাচেলর, মাস্টার্স এবং পিএইচডি পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ বৃত্তি পাওয়ার সুযোগ অবারিত হয়ে যায়। এই সরকারি বৃত্তির আওতায় শতভাগ টিউশন ফি ও বিনামূল্যে আবাসনের পাশাপাশি প্রতি মাসে আকর্ষণীয় আর্থিক ভাতা (স্টাইপেন্ড) প্রদান করা হয়। এমনকি কোনো শিক্ষার্থী HSK-3 সম্পন্ন করলেও কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে সমমানের আর্থিক বৃত্তি সুবিধা পেতে পারেন।
ইনফিতার আরও যোগ করেন, ম্যান্ডারিন জানা থাকলে পড়াশোনার পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবন ও ক্যারিয়ার গঠনে বিশেষ সুবিধা পাওয়া যায়। তাই চীনে যাওয়ার পূর্বপরিকল্পনা থাকলে বাংলাদেশ থেকেই ভাষার প্রাথমিক প্রস্তুতি নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
গবেষণাগারে কাজের নির্ভরতা কমায় ম্যান্ডারিন
কেবল সাধারণ শিক্ষার্থীই নয়, চীনে গবেষণায় যুক্ত গবেষকদের কাছেও ম্যান্ডারিন ভাষার ব্যবহারিক গুরুত্ব অপরিসীম। ‘বেইজিং ইউনিভার্সিটি অব কেমিক্যাল টেকনোলজি’ থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে বর্তমানে একই গবেষণাগারে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজিতে পিএইচডি করছেন খুলনার শেখ রায়হান উদ্দিন। গবেষণার পাশাপাশি তিনি একটি বিশেষায়িত একাডেমিতে নিয়মিত ম্যান্ডারিন শিখছেন।
নিজের গবেষণার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে রায়হান জানান, পিএইচডি পর্যায়ের গবেষণাপত্র বা থিসিস আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী ইংরেজিতে রচনা করা হলেও আধুনিক ল্যাবের যন্ত্রপাতি পরিচালনা, ম্যানুয়াল পাঠ, সফটওয়্যার ইন্টারফেস এবং দাপ্তরিক নথিপত্র মূলত চীনা ভাষাতেই তৈরি থাকে। ফলে ভাষা জানা থাকলে সহকর্মীদের ওপর নির্ভর না করে স্বাধীনভাবে গবেষণা চালানো যায় এবং বিজ্ঞানীদের সঙ্গে জটিল তাত্ত্বিক বিষয়ে আলোচনা সহজ হয়।
তিনি আরও বলেন, শীর্ষ ল্যাব থেকে পিএইচডি ডিগ্রির পাশাপাশি ম্যান্ডারিনের সাবলীল দক্ষতা থাকলে গ্লোবাল রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (R&D) সেন্টার ও বহুজাতিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোতে উচ্চপদে কাজের সুযোগ নিশ্চিত হয়। যেহেতু বিশ্ব বাণিজ্য ও আধুনিক ল্যাব সরঞ্জাম উৎপাদনে চীনের একক আধিপত্য রয়েছে, তাই ভাষা জানা থাকলে কোনো তৃতীয় পক্ষের সাহায্য ছাড়াই মূল উৎপাদকদের সাথে সরাসরি কারিগরি বিষয় নিয়ে কথা বলা সম্ভব। এছাড়া বেইজিংয়ের মতো বড় মেগাসিটিতে স্বাধীনভাবে চলাচলের পাশাপাশি স্থানীয় গবেষকদের সাথে গভীর আস্থার সম্পর্ক তৈরিতেও ম্যান্ডারিন বড় ভূমিকা রাখে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের শক্তিশালী হাতিয়ার
চীনে চাকরি কিংবা পড়াশোনার বাইরে বাংলাদেশে অবস্থানরত আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের জন্যও চীনা ভাষার প্রয়োজনীয়তা এখন অত্যন্ত জোরালো। দেশের টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক, বৃহৎ অবকাঠামো ও পণ্য আমদানিতে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংশ্লিষ্টতা ব্যাপক হওয়ায় এই ভাষাগত দক্ষতাকে বাণিজ্যে কাজে লাগানোর ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।
চীন থেকে নিয়মিত বাণিজ্যিক পণ্য আমদানি করেন সুনামগঞ্জের প্রতিষ্ঠান ‘ভাইপার প্লাস’-এর স্বত্বাধিকারী এস এম মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি জানান, চীনা ভাষা আজ আর স্রেফ যোগাযোগের বিষয় নয়, বরং এটি বৈশ্বিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী কৌশলগত সম্পদে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের শিল্পোদ্যোক্তাদের কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির প্রধান উৎসই হলো চীন। ফলে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৩০ কোটি মানুষের এই ভাষায় দক্ষতা থাকলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সরাসরি বাড়তি সুবিধা পাওয়া যায়।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, একজন ব্যবসায়ীর ক্ষেত্রে ম্যান্ডারিন জানার সবচেয়ে বড় লাভ হলো মধ্যস্থতাকারী বা বাণিজ্যিক দোভাষীর ওপর নির্ভরতা পুরোপুরি দূর হওয়া। এতে যেমন গোপন ব্যবসায়িক তথ্য সুরক্ষিত থাকে এবং খরচ কমে, তেমনি চীনের মূল উৎপাদক ও সরবরাহকারীদের সঙ্গে সরাসরি দরকষাকষি করে মানসম্মত পণ্যের সর্বনিম্ন মূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। এছাড়া চীনের স্থানীয় ডিজিটাল বাজার ও ই-কমার্স সাইটগুলো সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করে নতুন পণ্যের ট্রেন্ড আগেভাগেই বুঝে ফেলা যায়।
চীনা বাণিজ্যের মনস্তাত্ত্বিক সংস্কৃতি তুলে ধরে তিনি উল্লেখ করেন, দেশটিতে বাণিজ্যের মূলভিত্তি হলো ‘গুয়াংশি’ (Guangxi), যার অর্থ ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও দীর্ঘমেয়াদি সুসম্পর্ক। একজন বিদেশি ব্যবসায়ী যখন তাদের নিজস্ব ভাষায় কথা বলেন, তখন চীনারা তাকে বিশেষ সমীহ করেন এবং দ্রুত ব্যবসায়িক বোঝাপড়া তৈরি হয়। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা কিংবা বড় বড় কারখানা পরিদর্শনের সময় বিশেষ মূল্যছাড় ও ব্যবসায়িক সুবিধা আদায় করা অনেক সহজ হয়ে ওঠে।
দৈনন্দিন জীবন ও চিকিৎসাসেবার সহজ সমাধান
চীনে অবস্থানরত সাধারণ প্রবাসীদের জন্য দৈনন্দিন জীবনের জটিলতা এড়াতেও ম্যান্ডারিন জানা আবশ্যক। বেইজিংয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত মো. জাহাঙ্গীর আলম পেশাগত ও ব্যক্তিগত প্রয়োজনে একটি একাডেমিতে নিয়মিত ম্যান্ডারিন শিখছেন।
তিনি জানান, ভাষা না জানলে দৈনন্দিন কাজে যেমন ট্যাক্সিচালক, ডেলিভারি কর্মী বা বাড়িওয়ালার সাথে কথা বলতে গিয়ে নানা ভোগান্তিতে পড়তে হয়। সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয় চিকিৎসার ক্ষেত্রে। নিজের শারীরিক সমস্যা, রোগের ধরন বা ব্যথার উপসর্গ চিকিৎসকের কাছে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে না পারলে ভুল চিকিৎসার মারাত্মক ঝুঁকি থেকে যায়।
তিনি আরও যোগ করেন, ম্যান্ডারিন জানা থাকলে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ অত্যন্ত সহজ হয়ে যায়। রাস্তার সাইনবোর্ড বা কম্পিউটারের স্পেসিফিকেশন নিজে নিজেই পড়ে বোঝা যায় এবং কোনো অনুবাদক ছাড়াই চীনের সমৃদ্ধ চলচ্চিত্র, সঙ্গীত, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সরাসরি উপলব্ধি করা সম্ভব হয়।
দেশে প্রাতিষ্ঠানিক ও বেসরকারি উদ্যোগে বাড়ছে ভাষাচর্চা
বর্তমানে বাংলাদেশেও চীনা ভাষা শেখার সুযোগ আগের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের পর সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েও এই কার্যক্রম চালু হয়েছে। এর বাইরে শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজিতে ‘কনফুসিয়াস ক্লাসরুম’ পরিচালিত হচ্ছে। এসব কেন্দ্রে বিভিন্ন মেয়াদের ভাষা কোর্স, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, শিক্ষাবৃত্তি এবং এইচএসকে (HSK) পরীক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন করা হচ্ছে।
পাশাপাশি ব্যক্তিমালিকানাধীন উদ্যোগেও দেশে বহু আধুনিক ভাষা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। রাজধানীর গুলশানে অবস্থিত ‘চাইনিজ পাঠশালা’র পরিচালক আব্দুর রাফি জানান, ২০২২ সালে মাত্র ১০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করা তাঁর প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে পাঁচটি নিয়মিত ব্যাচে প্রায় ১০০ জন শিক্ষার্থী প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।
রাফি উল্লেখ করেন, প্রতিনিয়ত বাণিজ্য, উচ্চশিক্ষা, ভ্রমণ কিংবা জটিল চিকিৎসার প্রয়োজনে বহু মানুষ চীনমুখী হচ্ছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশেও মেগা প্রকল্প ও শিল্প খাতে চীনা বিনিয়োগের প্রসারের কারণে ভাষা জানা জনবলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। চীনারাও বাংলাদেশিদের বেশ গুরুত্বের সাথে মূল্যায়ন করছেন এবং অনেক চীনা নাগরিক এখন বাংলা শিখছেন, যা দুই দেশের সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানকে সমৃদ্ধ করছে।
একইভাবে ‘শেখ চিলড্রেন/চাইনিজ একাডেমি’র পরিচালক রাকিব হাসান জানান, চার বছর আগে মাত্র দুজন শিক্ষার্থী নিয়ে কার্যক্রম শুরু করলেও বর্তমানে তাঁদের প্রতিষ্ঠানে ২০০ শিক্ষার্থী রয়েছে এবং এ পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার শিক্ষার্থী এখান থেকে ম্যান্ডারিন শিখেছেন। তিনি বলেন, চীনে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ভাষা জানা বাধ্যতামূলক হওয়ার পাশাপাশি দেশের তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল ও নির্মাণ খাতে কর্মরত চীনা প্রতিষ্ঠানে ম্যান্ডারিন জানা প্রার্থীদের বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
চার দশকের অভিজ্ঞতায় ম্যান্ডারিনের রূপান্তর
১৯৮০-এর দশকে নিজ উদ্যোগে ম্যান্ডারিন শিখেছিলেন চীন-বিষয়ক লেখক লে. কর্নেল (অব.) মো. শাহাদাত হোসেন। তাঁর জীবনে এই ভাষাটি কেবল একটি বিদেশি জ্ঞান অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা পেশাগত ও জাতীয় দায়িত্ব পালনের এক বিরল সুযোগ এনে দিয়েছিল।
লে. কর্নেল (অব.) শাহাদাত হোসেন স্মৃতিচারণা করে জানান, ১৯৮৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভাষা শেখার উদ্দেশ্যে তিনি চীনে পাড়ি জমিয়েছিলেন। ফিরে তাকালে স্পষ্ট দেখা যায়, সেই ভাষাই তাঁর জীবন ও পরিচিতিকে আমূল বদলে দিয়েছে। ভাষা দক্ষতার সুবাদে ২০০১ থেকে ২০০২ সালে বাংলাদেশ ও চীনের তৎকালীন সরকারপ্রধান, রাষ্ট্রপ্রধান ও উচ্চপর্যায়ের সরকারি প্রতিনিধিদলের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকগুলোতে রাষ্ট্রীয় দোভাষী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ হয়েছিল তাঁর।
বিশ্বমঞ্চে ভাষার প্রভাব তুলে ধরে তিনি জানান, ম্যান্ডারিন বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ও বহুল পঠিত বিদেশি ভাষা। বিশ্বজুড়ে প্রায় ২০ কোটিরও বেশি মানুষ এই ভাষা শিখছেন এবং বেশ কিছু দেশের জাতীয় পাঠ্যক্রমেও এটি যুক্ত করা হয়েছে। ফলে ম্যান্ডারিন এখন আর নিছক কূটনীতিক বা তাত্ত্বিক গবেষকদের ভাষা নয়; এটি ব্যবসা, সাধারণ চাকরি ও দৈনন্দিন জীবিকার অবিচ্ছেদ্য মাধ্যম।
দেশের কৌশলগত জনশক্তি রূপান্তরের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ জনশক্তি রপ্তানিকারক রাষ্ট্র হলেও আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত অদক্ষ শ্রমিকের পরিবর্তে আন্তর্জাতিক ভাষায় পারদর্শী দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা। ম্যান্ডারিন জানা থাকলে বাংলাদেশিরা কেবল দেশেই নয়, বরং সারা বিশ্বে চলমান চীনের শত শত আন্তর্জাতিক মেগা প্রকল্পে উচ্চ বেতনের পেশাদার পদে নিজেদের জায়গা করে নিতে পারবেন।
এর বাইরে চীনে ক্রমবর্ধমান ‘মেডিকেল ট্যুরিজম’-এর সম্ভাবনা তুলে ধরে তিনি উল্লেখ করেন, উন্নত চিকিৎসার জন্য বহু বাংলাদেশি এখন চীনে যাচ্ছেন। ফলে ম্যান্ডারিন জানা চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী ও সমন্বয়কারীদের সামনে এক নতুন সম্ভাবনাময় পেশাগত ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, বাংলাদেশ ও চীনের বহুমুখী সম্পর্কের পরিধি যত বাড়ছে, ম্যান্ডারিন ভাষা ততই দুই দেশের যোগাযোগের সবচেয়ে টেকসই ও কার্যকর সেতুতে পরিণত হচ্ছে।

























