বছরের প্রায় ছয় মাস পানিতে নিমজ্জিত থাকে পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার দেউলবাড়ি দোবরা ও নেছারাবাদ উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা। বছরের দীর্ঘ সময় জলমগ্ন থাকলেও থেমে নেই এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা। বরং পানিকে কাজে লাগিয়ে ভাসমান বেডে সবজির চারা উৎপাদনের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে সম্ভাবনাময় কৃষি ব্যবস্থা। এ কাজে পুরুষের পাশাপাশি যুক্ত হচ্ছেন নারীরাও। কেউ শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন, আবার কেউ গড়ে তুলছেন নিজের উদ্যোগ। এতে একদিকে যেমন নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে সমৃদ্ধ হচ্ছে স্থানীয় গ্রামীণ অর্থনীতি। তবে সরকারি সহায়তা, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও বিনা সুদে ঋণ পেলে এ অঞ্চলে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নেছারাবাদ উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের গগন গ্রামের কৃষক জাকির হোসেনের স্ত্রী নুরজাহান বেগম। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে এসে ২০০৫ সাল থেকে ভাসমান বেডে চারা উৎপাদনের কাজ শুরু করেন তিনি। এলাকার অসহায় ও কর্মহীন নারীদের নিয়ে কাজ করার মধ্য দিয়ে নারী উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। বর্তমানে তাঁর উদ্যোগে প্রায় ১০ জন স্থানীয় নারী কাজ করছেন। কেউ দুলালী লতা দিয়ে তৈরি ম্যাদার ভেতরে বিভিন্ন জাতের সবজির বীজ বুনছেন, আবার কেউ অঙ্কুরিত চারা সাজিয়ে দিচ্ছেন।
নুরজাহানের স্বপ্ন, নিজে বড় উদ্যোক্তা হওয়ার পাশাপাশি এলাকার অসহায় ও কর্মহীন নারীদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা। তবে পর্যাপ্ত মূলধন, সরকারি সহায়তা ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের অভাব তাঁর এ উদ্যোগের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ অঞ্চলের নারীরা দুলালী লতা দিয়ে ম্যাদা তৈরি করে এর ভেতরে বিভিন্ন জাতের সবজির বীজ বুনে দেন। কয়েকজন নারী শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিন একজন নারী ১ হাজার থেকে ২ হাজার চারা উৎপাদনের প্রাথমিক কাজ করতে পারেন। প্রতি এক হাজার ম্যাদা তৈরির বিনিময়ে তাঁরা পান ১৫০ টাকা। এ সামান্য আয় দিয়েই চলে তাঁদের সংসার। তাঁদের কেউ কেউ নিজেরাই উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু পর্যাপ্ত অর্থ ও প্রশিক্ষণের অভাবে সে স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারছেন না। তাঁদের মতে, সরকারি সহায়তা, বিনা সুদে ঋণ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে আরও অনেক নারী এ কাজে যুক্ত হয়ে উদ্যোক্তা হতে পারবেন। এতে নারীদের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
প্রায় ২২৫ হেক্টর জমিতে ভাসমান বেড ও ধাপ তৈরি করে এ পদ্ধতিতে সবজির চারা উৎপাদন করা হচ্ছে। প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো এ কৃষি পদ্ধতিতে কিছুটা আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও এখনো এর সম্ভাবনার পুরোপুরি বিকাশ ঘটেনি। একসময় অভাব-অনটনে দিন কাটানো অনেক পরিবার এ কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিজেদের ভাগ্য বদলেছেন। এ কার্যক্রমের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত হয়ে এক হাজারেরও বেশি পরিবারের জীবনে এসেছে পরিবর্তন।
বিলের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ভাসমান বেডে লাউ, মিষ্টিকুমড়া, শিমসহ বিভিন্ন জাতের সবজির চারা উৎপাদন করা হয়। দেশের বিরল এ কৃষি পদ্ধতিতে নাজিরপুরের দেউলবাড়ি দোবরা ও নেছারাবাদের বলদিয়া এলাকায় কৃষির নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে।


























