মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন
০১:০৩ পূর্বাহ্ন | ৪ঠা নভেম্বর ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ | বুধবার, ১৯শে কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি

উপকূলের লবণাক্ত মাটিতে আধুনিক সবজি চাষে বিপ্লব এনেছেন নারী কৃষকরা

  • হালনাগাদ সময় : ০১:৫৩:২৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

চারদিকে নোনা পানি এবং মাটিতে লবণাক্ততার তীব্র প্রভাব—এমন প্রতিকূল পরিবেশে সবজি চাষ উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জন্য বরাবরই একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। তবে সেই চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা করে আধুনিক কৃষিপদ্ধতি ব্যবহার করে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন করছেন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার উপকূলীয় এলাকার নারীরা।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কোথাও মাচা পদ্ধতিতে ঝুলছে নানা জাতের সবজি, ব্যাগে মাটি ভরে সফলভাবে হচ্ছে আদা চাষ, আবার কোথাও মাদা ও বেড পদ্ধতিতে চমৎকারভাবে ফলছে পালংশাক, বেগুন ও ঢ্যাঁড়স। চারপাশের নোনাপানির লবণাক্ততার মাঝেও সবুজের এমন সমারোহ যেন এক নতুন সম্ভাবনার গল্প বলে।

তেমনি একজন সফল নারী উদ্যোক্তা হলেন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের কুলতলি গ্রামের দিপীকা রাণী। পেশায় গৃহিণী হলেও তিনি নিজ উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন বাড়ির আঙিনায় লবণাক্ত মাটিতে একটি সফল সবজি খামার। সেখানে তিনি চাষ করেছেন আধুনিক পদ্ধতিতে মিষ্টি পানির নানা ফসল।

তিনি জানান, আমাদের সুন্দরবন এলাকাটি মূলত লবণাক্ততাকবলিত। পূর্বে আমরা এখানে ঠিকঠাকমতো কোনো শাকসবজি ফলাতে পারতাম না। আগে যখনই শাকসবজি লাগানো হতো, মাটির উচ্চ লবণাক্ততার কারণে তা দ্রুত মারা যেত। তবে এখন আমরা স্থানীয় বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে সম্পূর্ণ আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ শুরু করেছি।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, আমি আমার বাড়ির আঙিনায় মিষ্টি পানির একটি আধার বা পুকুর তৈরি করেছি। সেখানে সারা বছর বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করি। সেই সংরক্ষিত পানি দিয়ে আমি যেমন পরিবারের সুপেয় পানিসহ গৃহস্থালির সকল কাজ সম্পন্ন করি, তেমনি সবজির ক্ষেতেও নিয়মিত সেই মিষ্টি পানি সরবরাহ করি।

লবণাক্ত জমিতে যেভাবে সফলভাবে ফসল ফলিয়েছেন তা বর্ণনা করে দিপীকা রাণী বলেন, বাড়ির আঙিনায় পুকুর কেটে মাচা পদ্ধতিতে সবজি চাষ করছি। বেড পদ্ধতি, মালচিং পদ্ধতি, বস্তা পদ্ধতি, ভার্টিক্যাল টাওয়ার পদ্ধতি, ভার্টিক্যাল টাওয়ার ড্রিপ সেচ পদ্ধতি এবং আলোর ফাঁদসহ প্রায় ১২টি আধুনিক পদ্ধতিতে আমি সবজি চাষ করেছি। আমার বাড়ির চারপাশের এই সবজি চাষ করে আমি যেমন আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছি, তেমনি আমার স্বামীকেও নানাভাবে সহযোগিতা করতে পারছি। বাড়িতে উৎপাদিত এই সবজি আমি প্রতিদিন বাজারে বিক্রির জন্য দিই এবং প্রতিদিন প্রায় ১০ থেকে ১২ কেজির বেশি সবজি বাজারে বিক্রি করে থাকি।

তারই দেখাদেখি একই গ্রামের ইতি বিশ্বাস বলেন, আমি দিপীকা দিদির অনুপ্রেরণায় বাড়ির আঙিনায় লবণাক্ত জমিতে সবজি চাষ শুরু করি। প্রথম দিকে কিছু সবজির চারা মারা গেলেও হাল ছাড়িনি। কয়েক দফায় চেষ্টার পর অবশেষে সফলতা পেয়েছি। দিদির দেখাদেখি আমিও চাষ করেছি ঢ্যাঁড়স, পুঁইশাক, বস্তার ভেতরে আদা, উচ্ছে, লাউ, মিষ্টি কুমড়া, পালংশাক ও লালশাক। এসবের পুরোটাই আধুনিক পদ্ধতিতে চাষ করা হয়েছে, যাতে মাটির নিচে থাকা লবণাক্ত পানি কোনোভাবেই চারাগাছ স্পর্শ করতে না পারে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে আমরা এখন কৃষি কাজ পরিচালনা করছি।

উল্লেখ্য, উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাবে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, জলাবদ্ধতা এবং সুপেয় পানির তীব্র সংকট কৃষির জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে চিংড়িঘের ও নোনা পানির আধারের কারণে চাষাবাদ ব্যাহত হয়। তবে এসব প্রতিকূলতাকে পাশ কাটিয়ে বসতভিটায় সফলভাবে সবজি চাষ করে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন স্থানীয় নারীরা।

এ বিষয়ে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার আটুলিয়া ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আশালতা জানান, আমাদের শ্যামনগর উপজেলার কৃষিতে নারীদের অবদান অপরিসীম।

Share this news as a Photo Card

জনপ্রিয় সংবাদ

মসজিদে নববিতে নারীদের ধর্মীয় আলোচনা শোনার বিশেষ ব্যবস্থা

03 November 2026

ধানমন্ডিতে বহুতল আবাসিক ভবনে আগুন, নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ২ ইউনিট

www.deshkhobor24.com |
fb/deshkhobor24bd

উপকূলের লবণাক্ত মাটিতে আধুনিক সবজি চাষে বিপ্লব এনেছেন নারী কৃষকরা

হালনাগাদ সময় : ০১:৫৩:২৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬

চারদিকে নোনা পানি এবং মাটিতে লবণাক্ততার তীব্র প্রভাব—এমন প্রতিকূল পরিবেশে সবজি চাষ উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জন্য বরাবরই একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। তবে সেই চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা করে আধুনিক কৃষিপদ্ধতি ব্যবহার করে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন করছেন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার উপকূলীয় এলাকার নারীরা।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কোথাও মাচা পদ্ধতিতে ঝুলছে নানা জাতের সবজি, ব্যাগে মাটি ভরে সফলভাবে হচ্ছে আদা চাষ, আবার কোথাও মাদা ও বেড পদ্ধতিতে চমৎকারভাবে ফলছে পালংশাক, বেগুন ও ঢ্যাঁড়স। চারপাশের নোনাপানির লবণাক্ততার মাঝেও সবুজের এমন সমারোহ যেন এক নতুন সম্ভাবনার গল্প বলে।

তেমনি একজন সফল নারী উদ্যোক্তা হলেন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের কুলতলি গ্রামের দিপীকা রাণী। পেশায় গৃহিণী হলেও তিনি নিজ উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন বাড়ির আঙিনায় লবণাক্ত মাটিতে একটি সফল সবজি খামার। সেখানে তিনি চাষ করেছেন আধুনিক পদ্ধতিতে মিষ্টি পানির নানা ফসল।

তিনি জানান, আমাদের সুন্দরবন এলাকাটি মূলত লবণাক্ততাকবলিত। পূর্বে আমরা এখানে ঠিকঠাকমতো কোনো শাকসবজি ফলাতে পারতাম না। আগে যখনই শাকসবজি লাগানো হতো, মাটির উচ্চ লবণাক্ততার কারণে তা দ্রুত মারা যেত। তবে এখন আমরা স্থানীয় বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে সম্পূর্ণ আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ শুরু করেছি।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, আমি আমার বাড়ির আঙিনায় মিষ্টি পানির একটি আধার বা পুকুর তৈরি করেছি। সেখানে সারা বছর বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করি। সেই সংরক্ষিত পানি দিয়ে আমি যেমন পরিবারের সুপেয় পানিসহ গৃহস্থালির সকল কাজ সম্পন্ন করি, তেমনি সবজির ক্ষেতেও নিয়মিত সেই মিষ্টি পানি সরবরাহ করি।

লবণাক্ত জমিতে যেভাবে সফলভাবে ফসল ফলিয়েছেন তা বর্ণনা করে দিপীকা রাণী বলেন, বাড়ির আঙিনায় পুকুর কেটে মাচা পদ্ধতিতে সবজি চাষ করছি। বেড পদ্ধতি, মালচিং পদ্ধতি, বস্তা পদ্ধতি, ভার্টিক্যাল টাওয়ার পদ্ধতি, ভার্টিক্যাল টাওয়ার ড্রিপ সেচ পদ্ধতি এবং আলোর ফাঁদসহ প্রায় ১২টি আধুনিক পদ্ধতিতে আমি সবজি চাষ করেছি। আমার বাড়ির চারপাশের এই সবজি চাষ করে আমি যেমন আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছি, তেমনি আমার স্বামীকেও নানাভাবে সহযোগিতা করতে পারছি। বাড়িতে উৎপাদিত এই সবজি আমি প্রতিদিন বাজারে বিক্রির জন্য দিই এবং প্রতিদিন প্রায় ১০ থেকে ১২ কেজির বেশি সবজি বাজারে বিক্রি করে থাকি।

তারই দেখাদেখি একই গ্রামের ইতি বিশ্বাস বলেন, আমি দিপীকা দিদির অনুপ্রেরণায় বাড়ির আঙিনায় লবণাক্ত জমিতে সবজি চাষ শুরু করি। প্রথম দিকে কিছু সবজির চারা মারা গেলেও হাল ছাড়িনি। কয়েক দফায় চেষ্টার পর অবশেষে সফলতা পেয়েছি। দিদির দেখাদেখি আমিও চাষ করেছি ঢ্যাঁড়স, পুঁইশাক, বস্তার ভেতরে আদা, উচ্ছে, লাউ, মিষ্টি কুমড়া, পালংশাক ও লালশাক। এসবের পুরোটাই আধুনিক পদ্ধতিতে চাষ করা হয়েছে, যাতে মাটির নিচে থাকা লবণাক্ত পানি কোনোভাবেই চারাগাছ স্পর্শ করতে না পারে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে আমরা এখন কৃষি কাজ পরিচালনা করছি।

উল্লেখ্য, উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাবে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, জলাবদ্ধতা এবং সুপেয় পানির তীব্র সংকট কৃষির জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে চিংড়িঘের ও নোনা পানির আধারের কারণে চাষাবাদ ব্যাহত হয়। তবে এসব প্রতিকূলতাকে পাশ কাটিয়ে বসতভিটায় সফলভাবে সবজি চাষ করে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন স্থানীয় নারীরা।

এ বিষয়ে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার আটুলিয়া ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আশালতা জানান, আমাদের শ্যামনগর উপজেলার কৃষিতে নারীদের অবদান অপরিসীম।

Share this news as a Photo Card