মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন
০৩:৫১ অপরাহ্ন | ১লা নভেম্বর ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ | রবিবার, ১৬ই কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি

প্রেমের অভিযোগে নাম-ঠিকানা ও ফোন নম্বর ভাইরাল: ফেসবুকের বিষাক্ত প্রচারণায় চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুক্তভোগীরা

  • হালনাগাদ সময় : ০৩:১২:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
  • ০ বার পড়া হয়েছে

হিন্দু তরুণের সঙ্গে মুসলিম তরুণীর প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথাকথিত ‘ভাগওয়া লাভ ট্র্যাপ’ ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ছড়িয়ে মানুষের নাম, ছবি, ফোন নম্বর ও বাসার ঠিকানা ফাঁস (ডক্সিং) করে মারাত্মক হয়রানি ও হুমকির মুখে ফেলার একটি উদ্বেগজনক চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। ডিজিটাল মিডিয়া গবেষণা সংস্থা ‘ডিসমিসল্যাব’-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এই সংঘবদ্ধ প্রচারণার শিকার হয়ে অনেক নারী ও তরুণ নিরাপত্তার চরম ঝুঁকিতে পড়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন, পড়াশোনা ও চাকরি বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন।

ডিসমিসল্যাবের তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত মাত্র তিন মাসে ২৩টি সুনির্দিষ্ট ফেসবুক পেজে এ ধরনের অন্তত ২৮৮টি পোস্টের প্রমাণ মিলেছে। ডুপ্লিকেট বা একই পোস্ট একাধিকবার প্রকাশ বাদ দেওয়ার পরও স্বতন্ত্র পোস্টের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৯৪টিতে। এই পোস্টগুলোর ৯৭ শতাংশেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া ৫৫ শতাংশ পোস্টে পূর্ণ নাম, ৩০ শতাংশে বাসাবাড়ির ঠিকানা, ১৬ শতাংশে সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইলের লিংক এবং ৬ শতাংশ পোস্টে ব্যক্তিগত ফোন নম্বর কোনো প্রকার সম্মতি ছাড়াই প্রকাশ করা হয়।

সংস্থাটির গবেষকরা ব্যক্তিগত ফোন নম্বর ফাঁস হওয়া ভুক্তভোগীদের মধ্য থেকে ১২ জনের সরাসরি সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। ভুক্তভোগীদের প্রত্যেকেই তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ পুরোপুরি ভিত্তিহীন ও বানোয়াট বলে দাবি করেছেন। এক নারী শিক্ষার্থী জানান, সকালে ঘুম থেকে উঠে তিনি দেখেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর ছবি, ঠিকানা ও যোগাযোগের নম্বর ছড়িয়ে দিয়ে এক হিন্দু সহপাঠীর সঙ্গে জড়িয়ে কুৎসা রটানো হচ্ছে। এরপর থেকেই তিনি ও তাঁর পরিবার ক্রমাগত হুমকি, অচেনা নম্বরের ফোন ও ব্ল্যাকমেইলের শিকার হচ্ছেন। চরম মানসিক ট্রমা ও সামাজিক কলঙ্কের ভয়ে তিনি কার্যত গৃহবন্দি হয়ে দিন কাটাচ্ছেন। তাঁর ভাষায়, “আমাকে এখন চোরের মতো জীবন কাটাতে হচ্ছে।”

মূলত ভারতে ‘লাভ জিহাদ’ ষড়যন্ত্ৰতত্ত্বের পাল্টা আখ্যান হিসেবে ২০২৩ সালের দিকে ‘ভাগওয়া লাভ ট্র্যাপ’ কথাটি সামনে আসে। সেখানে দাবি করা হয়, মুসলিম নারীদের ফাঁদে ফেলে কৌশলে হিন্দুধর্মে ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে। পরবর্তীতে সেই একই বিষাক্ত ন্যারেটিভ বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবেশ করে এবং নির্দিষ্ট ফেসবুক পেজ ও গ্রুপ খুলে আন্তধর্মীয় সম্পর্কের অভিযোগ তুলে তরুণ-তরুণীদের টার্গেট করে অনলাইনে ট্রায়াল ও ডক্সিংয়ের হাতিয়ারে রূপ নেয়।

ডিসমিসল্যাবের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অল্প কয়েকটি পেজ থেকেই এই প্রচারণার বেশিরভাগ কনটেন্ট ও রিঅ্যাকশন ছড়িয়েছে। মোট ২৮৮টি পোস্টের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ছড়িয়েছে মাত্র ৫টি পেজ থেকে—যার মধ্যে রয়েছে ‘বিউটিফুল ইসলাম’, ‘ভয়েস অব উম্মাহ’, ‘রুহের ডাক’, ‘অনার গার্ড বিডি’ এবং ‘মো. রাসেল ভালুকা ধীতপুর’। এছাড়া ‘মোল্লার আলো’ নামের পেজটি থেকে প্রকাশিত ২০টি পোস্টেই মোট ইন্টারঅ্যাকশন ছিল ৩৮ হাজারের বেশি, যা এই অপপ্রচারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।

এই সাইবার নিপীড়ন কেবল ফেসবুকের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। অনুসন্ধানে ‘সেইভ মুসলিম গার্লস’ নামের একটি স্বতন্ত্র বাংলা ওয়েবসাইটের সন্ধান মিলেছে, যেখানে ‘মুসলিম নামের নষ্টাদের তালিকা’ শিরোনামে আপত্তিকর বিভাগ খুলে জেলাভিত্তিক তরুণীদের নাম ও ছবি দিয়ে প্রকাশ্যে চরিত্র হনন এবং নারীদের ‘চিনে নেওয়ার’ আহ্বান জানানো হচ্ছে।

মেটার অফিশিয়াল কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির অনুমতি ছাড়া ফোন নম্বর, ঠিকানা বা অবস্থান প্রকাশ বা খোঁজা ‘ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন’ (Privacy Violation) হিসেবে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও বাস্তবে এই পেজগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর নজরদারি দেখা যায়নি। বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) আইন বিশেষজ্ঞ মনীষা বিশ্বাস সতর্ক করে জানিয়েছেন, নারীদের ক্ষেত্রে এ ধরনের ডক্সিং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা ও ব্ল্যাকমেইলের মতো মারাত্মক বাস্তব জীবনের অপরাধে রূপ নিতে পারে। দ্রুত সাইবার মনিটরিং ও আইনি পদক্ষেপ না নিলে অনলাইন ট্রায়াল থেকে বড় ধরনের সামাজিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

Share this news as a Photo Card

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রেমের অভিযোগে নাম-ঠিকানা ও ফোন নম্বর ভাইরাল: ফেসবুকের বিষাক্ত প্রচারণায় চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুক্তভোগীরা

01 November 2026

বিশ্বসুন্দরী থেকে রূপালি পর্দার রানী: জীবনের ৫৩ বছরে ঐশ্বরিয়া রাই

www.deshkhobor24.com |
fb/deshkhobor24bd

প্রেমের অভিযোগে নাম-ঠিকানা ও ফোন নম্বর ভাইরাল: ফেসবুকের বিষাক্ত প্রচারণায় চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুক্তভোগীরা

হালনাগাদ সময় : ০৩:১২:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬

হিন্দু তরুণের সঙ্গে মুসলিম তরুণীর প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথাকথিত ‘ভাগওয়া লাভ ট্র্যাপ’ ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ছড়িয়ে মানুষের নাম, ছবি, ফোন নম্বর ও বাসার ঠিকানা ফাঁস (ডক্সিং) করে মারাত্মক হয়রানি ও হুমকির মুখে ফেলার একটি উদ্বেগজনক চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। ডিজিটাল মিডিয়া গবেষণা সংস্থা ‘ডিসমিসল্যাব’-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এই সংঘবদ্ধ প্রচারণার শিকার হয়ে অনেক নারী ও তরুণ নিরাপত্তার চরম ঝুঁকিতে পড়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন, পড়াশোনা ও চাকরি বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন।

ডিসমিসল্যাবের তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত মাত্র তিন মাসে ২৩টি সুনির্দিষ্ট ফেসবুক পেজে এ ধরনের অন্তত ২৮৮টি পোস্টের প্রমাণ মিলেছে। ডুপ্লিকেট বা একই পোস্ট একাধিকবার প্রকাশ বাদ দেওয়ার পরও স্বতন্ত্র পোস্টের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৯৪টিতে। এই পোস্টগুলোর ৯৭ শতাংশেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া ৫৫ শতাংশ পোস্টে পূর্ণ নাম, ৩০ শতাংশে বাসাবাড়ির ঠিকানা, ১৬ শতাংশে সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইলের লিংক এবং ৬ শতাংশ পোস্টে ব্যক্তিগত ফোন নম্বর কোনো প্রকার সম্মতি ছাড়াই প্রকাশ করা হয়।

সংস্থাটির গবেষকরা ব্যক্তিগত ফোন নম্বর ফাঁস হওয়া ভুক্তভোগীদের মধ্য থেকে ১২ জনের সরাসরি সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। ভুক্তভোগীদের প্রত্যেকেই তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ পুরোপুরি ভিত্তিহীন ও বানোয়াট বলে দাবি করেছেন। এক নারী শিক্ষার্থী জানান, সকালে ঘুম থেকে উঠে তিনি দেখেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর ছবি, ঠিকানা ও যোগাযোগের নম্বর ছড়িয়ে দিয়ে এক হিন্দু সহপাঠীর সঙ্গে জড়িয়ে কুৎসা রটানো হচ্ছে। এরপর থেকেই তিনি ও তাঁর পরিবার ক্রমাগত হুমকি, অচেনা নম্বরের ফোন ও ব্ল্যাকমেইলের শিকার হচ্ছেন। চরম মানসিক ট্রমা ও সামাজিক কলঙ্কের ভয়ে তিনি কার্যত গৃহবন্দি হয়ে দিন কাটাচ্ছেন। তাঁর ভাষায়, “আমাকে এখন চোরের মতো জীবন কাটাতে হচ্ছে।”

মূলত ভারতে ‘লাভ জিহাদ’ ষড়যন্ত্ৰতত্ত্বের পাল্টা আখ্যান হিসেবে ২০২৩ সালের দিকে ‘ভাগওয়া লাভ ট্র্যাপ’ কথাটি সামনে আসে। সেখানে দাবি করা হয়, মুসলিম নারীদের ফাঁদে ফেলে কৌশলে হিন্দুধর্মে ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে। পরবর্তীতে সেই একই বিষাক্ত ন্যারেটিভ বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবেশ করে এবং নির্দিষ্ট ফেসবুক পেজ ও গ্রুপ খুলে আন্তধর্মীয় সম্পর্কের অভিযোগ তুলে তরুণ-তরুণীদের টার্গেট করে অনলাইনে ট্রায়াল ও ডক্সিংয়ের হাতিয়ারে রূপ নেয়।

ডিসমিসল্যাবের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অল্প কয়েকটি পেজ থেকেই এই প্রচারণার বেশিরভাগ কনটেন্ট ও রিঅ্যাকশন ছড়িয়েছে। মোট ২৮৮টি পোস্টের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ছড়িয়েছে মাত্র ৫টি পেজ থেকে—যার মধ্যে রয়েছে ‘বিউটিফুল ইসলাম’, ‘ভয়েস অব উম্মাহ’, ‘রুহের ডাক’, ‘অনার গার্ড বিডি’ এবং ‘মো. রাসেল ভালুকা ধীতপুর’। এছাড়া ‘মোল্লার আলো’ নামের পেজটি থেকে প্রকাশিত ২০টি পোস্টেই মোট ইন্টারঅ্যাকশন ছিল ৩৮ হাজারের বেশি, যা এই অপপ্রচারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।

এই সাইবার নিপীড়ন কেবল ফেসবুকের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। অনুসন্ধানে ‘সেইভ মুসলিম গার্লস’ নামের একটি স্বতন্ত্র বাংলা ওয়েবসাইটের সন্ধান মিলেছে, যেখানে ‘মুসলিম নামের নষ্টাদের তালিকা’ শিরোনামে আপত্তিকর বিভাগ খুলে জেলাভিত্তিক তরুণীদের নাম ও ছবি দিয়ে প্রকাশ্যে চরিত্র হনন এবং নারীদের ‘চিনে নেওয়ার’ আহ্বান জানানো হচ্ছে।

মেটার অফিশিয়াল কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির অনুমতি ছাড়া ফোন নম্বর, ঠিকানা বা অবস্থান প্রকাশ বা খোঁজা ‘ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন’ (Privacy Violation) হিসেবে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও বাস্তবে এই পেজগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর নজরদারি দেখা যায়নি। বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) আইন বিশেষজ্ঞ মনীষা বিশ্বাস সতর্ক করে জানিয়েছেন, নারীদের ক্ষেত্রে এ ধরনের ডক্সিং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা ও ব্ল্যাকমেইলের মতো মারাত্মক বাস্তব জীবনের অপরাধে রূপ নিতে পারে। দ্রুত সাইবার মনিটরিং ও আইনি পদক্ষেপ না নিলে অনলাইন ট্রায়াল থেকে বড় ধরনের সামাজিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

Share this news as a Photo Card