দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর প্রায় ৮৪ শতাংশই কোনো ধরনের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা ছাড়া অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করছেন, যার মোট সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, স্নাতক ও তদূর্ধ্ব ডিগ্রিধারী তরুণ-যুবকদের ৬০ শতাংশেরও বেশি মানুষ নিজেদের যোগ্যতা অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত আনুষ্ঠানিক চাকরি না পেয়ে অনানুষ্ঠানিক ও স্বল্প আয়ের কাজে যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছেন। যেখানে তাদের আয় আনুষ্ঠানিক খাতের তুলনায় ৪৫ থেকে ৮৪ শতাংশ পর্যন্ত কম। এমন বাস্তবতায় উদীয়মান ৮২টি অর্থনীতির দেশের তুলনায় বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির গতি নেমে এসেছে অর্ধেকেরও নিচে। বিশ্বব্যাংকের ‘ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ ইন সাউথ এশিয়া: ফ্রম টেলউইন্ডস টু হেডউইন্ডস ফর ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপরেখা ও ভবিষ্যৎ জনমিতিক চ্যালেঞ্জের এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে প্রতিবেদন প্রকাশ ও আলোচনাসভায় বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদরা জানান, আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে ৮২টি উদীয়মান দেশের গড় বার্ষিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার যেখানে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশে এই হার মাত্র ২ দশমিক ৭ শতাংশ। মাঝারি ও বড় আকারের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও মোট কর্মসংস্থানের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক। শ্রম-উৎপাদনশীলতার দিক থেকেও বিশ্বের অধিকাংশ দেশের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ ও ভারত।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৪৫ সালে বাংলাদেশে কর্মক্ষম মানুষের অনুপাত সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে এবং এর পর থেকেই তা দ্রুত কমতে শুরু করবে। বিপরীতে ক্রমাগত বাড়তে থাকবে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা। ২০৫১ সালের মধ্যে দেশে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সি মানুষের অনুপাত দাঁড়াবে ১৪ শতাংশে, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ পূর্ণাঙ্গ ‘বয়স্ক সমাজে’ পরিণত হবে। অর্থাৎ জনমিতিক লভ্যাংশ বা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ কাজে লাগানোর সুযোগ শেষ হতে আর বেশি সময় বাকি নেই। কিন্তু পর্যাপ্ত ও টেকসই কর্মসংস্থান তৈরি, উন্নত শিক্ষা এবং সামাজিক সুরক্ষার মতো মৌলিক প্রস্তুতি এখনো চরমভাবে দুর্বল। ফলে রাষ্ট্র হিসেবে পুরোপুরি ধনী হওয়ার আগেই বাংলাদেশ প্রবীণদের সমাজে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
প্রতিবেদনে স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বল অবকাঠামো ও আঞ্চলিক বৈষম্যের তথ্যও তুলে ধরা হয়। দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বাস করলেও সেখানে নিয়োজিত আছেন মাত্র ২০ শতাংশ স্বাস্থ্যকর্মী; বিপরীতে শহরে চিকিৎসকের ঘনত্ব গ্রামের চেয়ে ১৮ গুণ বেশি। তাছাড়া অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে দেশের ৮২ শতাংশ প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রস্তুতি নেই এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম রয়েছে মাত্র সাড়ে ৭ শতাংশ কেন্দ্রে। হৃদরোগ চিকিৎসার সব সরঞ্জাম একসঙ্গে রয়েছে ১ শতাংশেরও কম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।
প্রতিবেদন প্রকাশ পরবর্তী প্যানেল আলোচনায় সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন জানান, সরকার ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডকে কাজে লাগাতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি তরুণদের আধুনিক দক্ষতা উন্নয়নে জোর দিচ্ছে। পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র বিনির্মাণে সরকার জীবনচক্রভিত্তিক সুরক্ষা কৌশল গ্রহণ করছে, যেখানে নবজাতক থেকে শুরু করে প্রবীণদের সামাজিক সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে ভালো মানের আনুষ্ঠানিক চাকরি সৃষ্টি না করতে পারলে এই জনমিতিক সংকট ভবিষ্যতে চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।


























