মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন
১২:৩৮ অপরাহ্ন | ৩১শে অক্টোবর ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ | শনিবার, ১৫ই কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি

অনলাইনে সক্রিয় মাদক কারবারিরা: ফেসবুক ও টেলিগ্রামের মাধ্যমে চলছে হোম ডেলিভারির রমরমা বাণিজ্য

  • হালনাগাদ সময় : ১১:২৫:০০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

দোকানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘সুপার ডাইমন্ড ক্যান্ডি হাউজ’ এবং এর কর্ণধার সিয়াম চৌধুরীর ঘোষণা হলো—তারা সম্পূর্ণ বিশ্বস্ততা ও সততার সঙ্গে লেনদেন করে থাকেন, যেখানে হোম ডেলিভারি অথবা নির্দিষ্ট লোকেশনে এসে মাদক নেওয়ারও সুব্যবস্থা রয়েছে। বিজ্ঞাপনের নানা পসরা সাজিয়ে ঠিক এভাবেই বর্তমানে অনলাইনে অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে উঠেছে বিভিন্ন মাদক কারবারি চক্র। ইয়াবা ও হেরোইনের মতো মারাত্মক সব মাদক তারা লোক মারফত সরাসরি ক্রেতার ঠিকানায় পৌঁছে দিচ্ছে। এমনকি ‘ক্যাশ অন ডেলিভারি’ পদ্ধতির মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট কুরিয়ারে গিয়ে ‘বুমাত্রা প্রশ্নে’ বা কোনো ঝুটঝামেলা ছাড়াই মাদক সংগ্রহ করার সুযোগ রয়েছে বলেও দাবি করছে এই কারবারিরা। গত কয়েক দিনে ফেসবুক ও টেলিগ্রাম চ্যানেলের ওপর নজর চালিয়ে অন্তত ২০টি এমন পাবলিক গ্রুপ শনাক্ত করেছে সংবাদমাধ্যম ‘স্ট্রিম’, যার কোনো কোনোটিতে সদস্যের সংখ্যা ১০ হাজারের ঘরও ছাড়িয়ে গেছে। নাম ও লোগো ভিন্ন হলেও মূলত এই গ্রুপগুলোতে জমজমাট বিজ্ঞাপন প্রচারের মাধ্যমেই অবৈধ মাদকের রমরমা কারবার পরিচালিত হচ্ছে।

ক্রেতার ছদ্মবেশে সিয়াম চৌধুরীর ফেসবুক আইডিতে মেসেজ পাঠানো হলে ‘আলী নাহিদ হৃদিক’ নামের সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি আইডি থেকে যোগাযোগ করা হয়। সিয়াম জানান যে তাঁর মাধ্যমে রাজধানীর যেকোনো স্থানে মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে ইয়াবার হোম ডেলিভারি নেওয়া সম্ভব। তিনি আরও জানান, ‘মনে করুন—এক পিসের দাম ২২০ টাকা, সঙ্গে ডেলিভারি চার্জ প্রায় সমান। তবে ২৫ পিস নিলে পাইকারি রেট পাওয়া যাবে, তখন দাম কিছুটা কমে আসবে।’ অন্যদিকে, এই ধরনের অনলাইন মাদক কারবার প্রতিরোধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) জানিয়েছে যে তারা অনলাইন পেট্রোলিংসহ নিয়মিত নানা কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে এবং বিগত ছয় মাসের মধ্যে অন্তত অর্ধডজন কারবারিকে আটক করেছে। ডিএনসির ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিচালক মেহেদী হাসান জানান, মাদকের অনলাইন কারবার দমনে তারা সব সময় গোয়েন্দা নজরদারি বা অনলাইন পেট্রোলিং অব্যাহত রেখেছেন। পাশাপাশি কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা তথ্য পেলে তা তদন্ত সাপেক্ষে তাৎক্ষণিক অ্যাকশনে যাওয়া হয় এবং ইতোমধ্যেই নিজ উদ্যোগে অনলাইনে নজরদারি চালিয়ে মাদক জব্দসহ বেশ কয়েকটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

ফেসবুক ও টেলিগ্রামের বিভিন্ন পাবলিক গ্রুপ ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন এলাকার নানা স্তরের মানুষ এসবের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে এবং তারা নিয়মিত মাদক-সংক্রান্ত বিভিন্ন পোস্ট ও কমেন্ট করছে। এমনকি মাদক কেনাবেচার পাশাপাশি সেবন-সঙ্গী খোঁজার মতো কাজও সেখানে দেদারছে চলছে। একইভাবে টেলিগ্রামের বিভিন্ন গোপন গ্রুপ ও চ্যানেলের মাধ্যমেও এই কারবার সমান তালে চলছে। এই গ্রুপ ও চ্যানেল পরিচালনায় সরাসরি যুক্ত অন্তত ২৫ জনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে যে তাদের কেউ কেউ হোম ডেলিভারির প্রতিশ্রুতি দিলেও অনেকে আবার নির্দিষ্ট কোনো লোকেশনে গিয়ে তা সংগ্রহ করতে বলেন। শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই নয়, ফেসবুক-টেলিগ্রামের পাশাপাশি নিজস্ব ওয়েবসাইটের মাধ্যমেও এখন মাদকের কারবার চলছে। সম্প্রতি এ রকমই একটি অভিনব চক্রের সন্ধান পেয়েছে ডিএনসি, যারা রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রধান টার্গেট করে এই কারবার চালিয়ে আসছিল।

ঢাকায় হোম ডেলিভারি দেওয়া এমনই এক কারবারি আফনান রহমান ইরফান ইয়াবার পাশাপাশি আইসও সরবরাহ করে থাকেন। ইরফান বলছিলেন, ‘যেকোনো সময় হোম ডেলিভারি দিতে পারব। তবে ১০০ টাকা অগ্রিম ডেলিভারি চার্জ বিকাশ বা অন্য মাধ্যমে দিতে হবে, আমার লোক গিয়ে পার্সেল পৌঁছে দিয়ে আসবে।’ এদিকে নিজেকে মালিবাগ ফরচুন মার্কেটের কর্মী পরিচয় দেওয়া অপর কারবারি আহসান আরূপ জানান, তাঁর অবৈধ কারবারটি মূলত দুপুর ১২টা থেকে বেলা ৩টা এবং বিকেলে ৫টা থেকে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত চালু থাকে এবং ক্রেতারা চাইলে তাঁর বাসায় এসেও মাদক সেবন করার সুযোগ পান। তিনি আরও বলেন, ‘আমার ইয়াবা একবার খেলে বারবার আসা লাগবে। আমি নিজে খেয়ে পরীক্ষা করে তারপর বেচি, আর সবচেয়ে ভালো মালটাই দিই।’ ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে বিজ্ঞাপন পাওয়া রাজারবাগের বাসিন্দা তৃষা আক্তার জানান, তাঁর কাছ থেকেও সরাসরি ও হোম ডেলিভারি দুই মাধ্যমেই মাদক নেওয়া সম্ভব, তবে এর জন্য অবশ্যই অগ্রিম টাকা পরিশোধ করতে হবে।

সংশ্লিষ্ট অনলাইন গ্রুপগুলোতে অত্যন্ত সুকৌশলে পাইকারি দরেও মাদক বিক্রি করা হয়, যার সঙ্গে জড়িত পাইকারদের অধিকাংশেরই বসবাস সীমান্তবর্তী এলাকায়। যেমন ‘মনের ডায়েরি’ নামের একটি ফেসবুক আইডি ব্যবহারকারী জানান যে তিনি খুচরা কোনো মাদক বিক্রি করেন না এবং কেউ নিতে চাইলে তাকে সর্বনিম্ন ৫০টি পিস নিতে হবে। তিনি বলেন, চট্টগ্রামের কেরানিহাট থেকে সরাসরি কিংবা কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে এগুলো সংগ্রহ করা সম্ভব। কুরিয়ারের মাধ্যমে মাদক নিতে গেলে আইনি কোনো জটিলতা বা ধরা পড়ার ঝুঁকি আছে কি না—এমন প্রশ্ন করা হলে সেই কারবারি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানান, ‘প্রতি মাসে আমি এজেআর কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে কয়েক লাখ টাকার বিক্রি করছি, কোনো সমস্যা হয় না। আপনার নামে পার্সেল ইস্যু হবে, আপনি কুরিয়ারের সংশ্লিষ্ট শাখায় গিয়ে টাকা পরিশোধ করে পার্সেল নিয়ে আসবেন, কেউচ্ছু জিজ্ঞেস করবে না।’

তবে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে এজেআর কুরিয়ার সার্ভিসের এজিএম (অপারেশন) মো. রুবেল দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানান, কুরিয়ারের মাধ্যমে কোনো ধরনের মাদক পাঠানোর ন্যূনতম সুযোগ নেই; কারণ তারা প্রতিটি পার্সেল প্রেরণের আগে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে চেক করেন। তাছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সহযোগিতা চাইলে তারা সর্বাত্মক সহায়তা করেন। তাই কুরিয়ার ব্যবহার করে মাদক পাচার কোনোভাবেই সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওই ব্যক্তি কীসের ভিত্তিতে এমন অবাস্তব দাবি করেছেন তা কেবল তিনিই ভালো বলতে পারবেন। অন্যদিকে কক্সবাজারের পাইকার রেজাউল করিম রাজা জানান, তিনি নিজে হোম ডেলিভারি বা কুরিয়ারের মাধ্যমে কোনো কারবার করেন না; তাঁর ক্ষেত্রে নিয়ম হলো সর্বনিম্ন এক হাজার পিস মাদক সরাসরি কক্সবাজার থেকে এসে নিতে হবে। ক্রেতাকে কক্সবাজারে এসে হোটেল রুম ভাড়া করে থাকতে হবে এবং তার লোক গিয়ে পৌঁছে দিয়ে আসবে, যেখানে ডেলিভারিম্যানকে প্রতি পিসের জন্য অতিরিক্ত ১০ টাকা করে দিতে হয়।

সামাজিক মাধ্যমের গণ্ডি পেরিয়ে সম্প্রতি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে মাদক বিক্রির চাঞ্চল্যকর তথ্যও সামনে এসেছে। ডিএনসি জানায়, বসুন্ধরা এলাকার শিক্ষার্থীদের টার্গেট করা ওই চক্রটি ক্যাম্পাসে ঘুরে ঘুরে ‘ভিজিটিং কার্ড’ বিতরণ করত। সেই কার্ডের ‘কিউআর কোড’ স্ক্যান করলে আগ্রহীদের একটি নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে নিয়ে যাওয়া হতো এবং সেখান থেকে একটি গোপন টেলিগ্রাম গ্রুপে যুক্ত করা হতো, যে গ্রুপে কেবল দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ২৫০ জন শিক্ষার্থী যুক্ত ছিল। গত ১৬ অক্টোবর ডিএনসি রাজধানীর ভাটারা এলাকার একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে ৩০০ গ্রাম গাঁজাসহ সাইম ইসলাম (১৯) নামের এক যুবককে আটক করে। ডিএনসির পরিচালক (অপারেশনস) অতিরিক্ত ডিআইজি সৈয়দা জান্নাত আরা জানান, অনলাইন মাদক কারবারিদের ওপর তাদের নিয়মিত কড়া নজরদারি রয়েছে এবং সদ্য সংশোধিত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী ইতোমধ্যেই তিনটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। তারা এই অপরাধ নির্মূলে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এদিকে সদ্য প্রণীত ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ বেশ বড় ধরনের বিতর্ক ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই নতুন আইন অনুযায়ী, কোনো সাইবার স্পেস, ডিজিটাল ডিভাইস, ওয়েবসাইট, সামাজিক মাধ্যম, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ইলেকট্রনিক যোগাযোগব্যবস্থা বা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে মাদকদ্রব্য কিংবা সাইকোঅ্যাকটিভ সাবস্টেন্স ক্রয়-বিক্রয়, সংগ্রহ, প্রস্তুত, বিজ্ঞাপন, মধ্যস্থতা, যোগাযোগ বা এ-সংক্রান্ত কোনো অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা করা গুরুতর অপরাধ। শুধু তাই নয়, মাদক কেনাবেচার উদ্দেশ্যে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা, ই-ওয়ালেট, ভার্চুয়াল সম্পদ বা ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহারও অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এসব ক্ষেত্রে অপরাধীর কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট মাদকদ্রব্য উদ্ধার হওয়াটা বাধ্যতামূলক নয়। এই আইনে যেকোনো মেয়াদের কারাদণ্ডসহ সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড এবং অনূর্ধ্ব ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া আইনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, আন্তর্জাতিক বা সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যেকোনো মেয়াদের কারাদণ্ড অথবা অনূর্ধ্ব ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

তবে আইনের এই সংশোধনী এবং বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডের বিধান নিয়ে আইন বিশেষজ্ঞ মহলে তীব্র বিতর্ক ও উদ্বেগ রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী ইসরাত হাসান মন্তব্য করেন যে, অনলাইনে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি হলেও কে বা কারা কার নাম ও পরিচয় ব্যবহার করে এই কারবার চালাচ্ছে তা নিখুঁতভাবে শনাক্ত এবং প্রমাণ করা অত্যন্ত জটিল একটি প্রক্রিয়া। ভুয়া বা হ্যাক করা অ্যাকাউন্ট এবং সাজানো ডিজিটাল তথ্যের অপব্যবহার করে যেকোনো নিরীহ মানুষকে খুব সহজেই ফাঁসানোর সুযোগ থেকে যায়। তিনি আরও বলেন, মাদক উদ্ধার না হলে সংশ্লিষ্ট পদার্থের রাসায়নিক পরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়াও সম্ভব হয় না, ফলে সেটি আদতে মাদক ছিল কি না এবং কী ধরনের মাদক ছিল তা প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ডিজিটাল তথ্যের সত্যতা এবং অভিযুক্তের প্রকৃত সম্পৃক্ততা শতভাগ নিশ্চিত করা আবশ্যক উল্লেখ করে তিনি বলেন, মাদক উদ্ধার ছাড়াই শাস্তির বিধান—বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডের মতো সর্বোচ্চ শাস্তির খড়্গ ঝোলানো ন্যায়বিচারের মৌলিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ, উদ্ধার বাধ্যতামূলক না করা হলেও অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সন্দেহাতীতভাবে অপরাধ প্রমাণের চূড়ান্ত দায় কিন্তু সম্পূর্ণভাবেই রাষ্ট্রপক্ষের ওপর বর্তায়।

Share this news as a Photo Card

জনপ্রিয় সংবাদ

এইচএসসি পরীক্ষা: বিদেশি কেন্দ্রগুলোতেও কমেছে পাসের হার

31 October 2026

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পৌঁছাল ইউরেনিয়ামের নতুন চালান

www.deshkhobor24.com |
fb/deshkhobor24bd

অনলাইনে সক্রিয় মাদক কারবারিরা: ফেসবুক ও টেলিগ্রামের মাধ্যমে চলছে হোম ডেলিভারির রমরমা বাণিজ্য

হালনাগাদ সময় : ১১:২৫:০০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

দোকানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘সুপার ডাইমন্ড ক্যান্ডি হাউজ’ এবং এর কর্ণধার সিয়াম চৌধুরীর ঘোষণা হলো—তারা সম্পূর্ণ বিশ্বস্ততা ও সততার সঙ্গে লেনদেন করে থাকেন, যেখানে হোম ডেলিভারি অথবা নির্দিষ্ট লোকেশনে এসে মাদক নেওয়ারও সুব্যবস্থা রয়েছে। বিজ্ঞাপনের নানা পসরা সাজিয়ে ঠিক এভাবেই বর্তমানে অনলাইনে অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে উঠেছে বিভিন্ন মাদক কারবারি চক্র। ইয়াবা ও হেরোইনের মতো মারাত্মক সব মাদক তারা লোক মারফত সরাসরি ক্রেতার ঠিকানায় পৌঁছে দিচ্ছে। এমনকি ‘ক্যাশ অন ডেলিভারি’ পদ্ধতির মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট কুরিয়ারে গিয়ে ‘বুমাত্রা প্রশ্নে’ বা কোনো ঝুটঝামেলা ছাড়াই মাদক সংগ্রহ করার সুযোগ রয়েছে বলেও দাবি করছে এই কারবারিরা। গত কয়েক দিনে ফেসবুক ও টেলিগ্রাম চ্যানেলের ওপর নজর চালিয়ে অন্তত ২০টি এমন পাবলিক গ্রুপ শনাক্ত করেছে সংবাদমাধ্যম ‘স্ট্রিম’, যার কোনো কোনোটিতে সদস্যের সংখ্যা ১০ হাজারের ঘরও ছাড়িয়ে গেছে। নাম ও লোগো ভিন্ন হলেও মূলত এই গ্রুপগুলোতে জমজমাট বিজ্ঞাপন প্রচারের মাধ্যমেই অবৈধ মাদকের রমরমা কারবার পরিচালিত হচ্ছে।

ক্রেতার ছদ্মবেশে সিয়াম চৌধুরীর ফেসবুক আইডিতে মেসেজ পাঠানো হলে ‘আলী নাহিদ হৃদিক’ নামের সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি আইডি থেকে যোগাযোগ করা হয়। সিয়াম জানান যে তাঁর মাধ্যমে রাজধানীর যেকোনো স্থানে মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে ইয়াবার হোম ডেলিভারি নেওয়া সম্ভব। তিনি আরও জানান, ‘মনে করুন—এক পিসের দাম ২২০ টাকা, সঙ্গে ডেলিভারি চার্জ প্রায় সমান। তবে ২৫ পিস নিলে পাইকারি রেট পাওয়া যাবে, তখন দাম কিছুটা কমে আসবে।’ অন্যদিকে, এই ধরনের অনলাইন মাদক কারবার প্রতিরোধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) জানিয়েছে যে তারা অনলাইন পেট্রোলিংসহ নিয়মিত নানা কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে এবং বিগত ছয় মাসের মধ্যে অন্তত অর্ধডজন কারবারিকে আটক করেছে। ডিএনসির ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিচালক মেহেদী হাসান জানান, মাদকের অনলাইন কারবার দমনে তারা সব সময় গোয়েন্দা নজরদারি বা অনলাইন পেট্রোলিং অব্যাহত রেখেছেন। পাশাপাশি কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা তথ্য পেলে তা তদন্ত সাপেক্ষে তাৎক্ষণিক অ্যাকশনে যাওয়া হয় এবং ইতোমধ্যেই নিজ উদ্যোগে অনলাইনে নজরদারি চালিয়ে মাদক জব্দসহ বেশ কয়েকটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

ফেসবুক ও টেলিগ্রামের বিভিন্ন পাবলিক গ্রুপ ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন এলাকার নানা স্তরের মানুষ এসবের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে এবং তারা নিয়মিত মাদক-সংক্রান্ত বিভিন্ন পোস্ট ও কমেন্ট করছে। এমনকি মাদক কেনাবেচার পাশাপাশি সেবন-সঙ্গী খোঁজার মতো কাজও সেখানে দেদারছে চলছে। একইভাবে টেলিগ্রামের বিভিন্ন গোপন গ্রুপ ও চ্যানেলের মাধ্যমেও এই কারবার সমান তালে চলছে। এই গ্রুপ ও চ্যানেল পরিচালনায় সরাসরি যুক্ত অন্তত ২৫ জনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে যে তাদের কেউ কেউ হোম ডেলিভারির প্রতিশ্রুতি দিলেও অনেকে আবার নির্দিষ্ট কোনো লোকেশনে গিয়ে তা সংগ্রহ করতে বলেন। শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই নয়, ফেসবুক-টেলিগ্রামের পাশাপাশি নিজস্ব ওয়েবসাইটের মাধ্যমেও এখন মাদকের কারবার চলছে। সম্প্রতি এ রকমই একটি অভিনব চক্রের সন্ধান পেয়েছে ডিএনসি, যারা রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রধান টার্গেট করে এই কারবার চালিয়ে আসছিল।

ঢাকায় হোম ডেলিভারি দেওয়া এমনই এক কারবারি আফনান রহমান ইরফান ইয়াবার পাশাপাশি আইসও সরবরাহ করে থাকেন। ইরফান বলছিলেন, ‘যেকোনো সময় হোম ডেলিভারি দিতে পারব। তবে ১০০ টাকা অগ্রিম ডেলিভারি চার্জ বিকাশ বা অন্য মাধ্যমে দিতে হবে, আমার লোক গিয়ে পার্সেল পৌঁছে দিয়ে আসবে।’ এদিকে নিজেকে মালিবাগ ফরচুন মার্কেটের কর্মী পরিচয় দেওয়া অপর কারবারি আহসান আরূপ জানান, তাঁর অবৈধ কারবারটি মূলত দুপুর ১২টা থেকে বেলা ৩টা এবং বিকেলে ৫টা থেকে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত চালু থাকে এবং ক্রেতারা চাইলে তাঁর বাসায় এসেও মাদক সেবন করার সুযোগ পান। তিনি আরও বলেন, ‘আমার ইয়াবা একবার খেলে বারবার আসা লাগবে। আমি নিজে খেয়ে পরীক্ষা করে তারপর বেচি, আর সবচেয়ে ভালো মালটাই দিই।’ ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে বিজ্ঞাপন পাওয়া রাজারবাগের বাসিন্দা তৃষা আক্তার জানান, তাঁর কাছ থেকেও সরাসরি ও হোম ডেলিভারি দুই মাধ্যমেই মাদক নেওয়া সম্ভব, তবে এর জন্য অবশ্যই অগ্রিম টাকা পরিশোধ করতে হবে।

সংশ্লিষ্ট অনলাইন গ্রুপগুলোতে অত্যন্ত সুকৌশলে পাইকারি দরেও মাদক বিক্রি করা হয়, যার সঙ্গে জড়িত পাইকারদের অধিকাংশেরই বসবাস সীমান্তবর্তী এলাকায়। যেমন ‘মনের ডায়েরি’ নামের একটি ফেসবুক আইডি ব্যবহারকারী জানান যে তিনি খুচরা কোনো মাদক বিক্রি করেন না এবং কেউ নিতে চাইলে তাকে সর্বনিম্ন ৫০টি পিস নিতে হবে। তিনি বলেন, চট্টগ্রামের কেরানিহাট থেকে সরাসরি কিংবা কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে এগুলো সংগ্রহ করা সম্ভব। কুরিয়ারের মাধ্যমে মাদক নিতে গেলে আইনি কোনো জটিলতা বা ধরা পড়ার ঝুঁকি আছে কি না—এমন প্রশ্ন করা হলে সেই কারবারি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানান, ‘প্রতি মাসে আমি এজেআর কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে কয়েক লাখ টাকার বিক্রি করছি, কোনো সমস্যা হয় না। আপনার নামে পার্সেল ইস্যু হবে, আপনি কুরিয়ারের সংশ্লিষ্ট শাখায় গিয়ে টাকা পরিশোধ করে পার্সেল নিয়ে আসবেন, কেউচ্ছু জিজ্ঞেস করবে না।’

তবে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে এজেআর কুরিয়ার সার্ভিসের এজিএম (অপারেশন) মো. রুবেল দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানান, কুরিয়ারের মাধ্যমে কোনো ধরনের মাদক পাঠানোর ন্যূনতম সুযোগ নেই; কারণ তারা প্রতিটি পার্সেল প্রেরণের আগে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে চেক করেন। তাছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সহযোগিতা চাইলে তারা সর্বাত্মক সহায়তা করেন। তাই কুরিয়ার ব্যবহার করে মাদক পাচার কোনোভাবেই সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওই ব্যক্তি কীসের ভিত্তিতে এমন অবাস্তব দাবি করেছেন তা কেবল তিনিই ভালো বলতে পারবেন। অন্যদিকে কক্সবাজারের পাইকার রেজাউল করিম রাজা জানান, তিনি নিজে হোম ডেলিভারি বা কুরিয়ারের মাধ্যমে কোনো কারবার করেন না; তাঁর ক্ষেত্রে নিয়ম হলো সর্বনিম্ন এক হাজার পিস মাদক সরাসরি কক্সবাজার থেকে এসে নিতে হবে। ক্রেতাকে কক্সবাজারে এসে হোটেল রুম ভাড়া করে থাকতে হবে এবং তার লোক গিয়ে পৌঁছে দিয়ে আসবে, যেখানে ডেলিভারিম্যানকে প্রতি পিসের জন্য অতিরিক্ত ১০ টাকা করে দিতে হয়।

সামাজিক মাধ্যমের গণ্ডি পেরিয়ে সম্প্রতি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে মাদক বিক্রির চাঞ্চল্যকর তথ্যও সামনে এসেছে। ডিএনসি জানায়, বসুন্ধরা এলাকার শিক্ষার্থীদের টার্গেট করা ওই চক্রটি ক্যাম্পাসে ঘুরে ঘুরে ‘ভিজিটিং কার্ড’ বিতরণ করত। সেই কার্ডের ‘কিউআর কোড’ স্ক্যান করলে আগ্রহীদের একটি নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে নিয়ে যাওয়া হতো এবং সেখান থেকে একটি গোপন টেলিগ্রাম গ্রুপে যুক্ত করা হতো, যে গ্রুপে কেবল দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ২৫০ জন শিক্ষার্থী যুক্ত ছিল। গত ১৬ অক্টোবর ডিএনসি রাজধানীর ভাটারা এলাকার একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে ৩০০ গ্রাম গাঁজাসহ সাইম ইসলাম (১৯) নামের এক যুবককে আটক করে। ডিএনসির পরিচালক (অপারেশনস) অতিরিক্ত ডিআইজি সৈয়দা জান্নাত আরা জানান, অনলাইন মাদক কারবারিদের ওপর তাদের নিয়মিত কড়া নজরদারি রয়েছে এবং সদ্য সংশোধিত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী ইতোমধ্যেই তিনটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। তারা এই অপরাধ নির্মূলে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এদিকে সদ্য প্রণীত ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ বেশ বড় ধরনের বিতর্ক ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই নতুন আইন অনুযায়ী, কোনো সাইবার স্পেস, ডিজিটাল ডিভাইস, ওয়েবসাইট, সামাজিক মাধ্যম, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ইলেকট্রনিক যোগাযোগব্যবস্থা বা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে মাদকদ্রব্য কিংবা সাইকোঅ্যাকটিভ সাবস্টেন্স ক্রয়-বিক্রয়, সংগ্রহ, প্রস্তুত, বিজ্ঞাপন, মধ্যস্থতা, যোগাযোগ বা এ-সংক্রান্ত কোনো অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা করা গুরুতর অপরাধ। শুধু তাই নয়, মাদক কেনাবেচার উদ্দেশ্যে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা, ই-ওয়ালেট, ভার্চুয়াল সম্পদ বা ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহারও অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এসব ক্ষেত্রে অপরাধীর কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট মাদকদ্রব্য উদ্ধার হওয়াটা বাধ্যতামূলক নয়। এই আইনে যেকোনো মেয়াদের কারাদণ্ডসহ সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড এবং অনূর্ধ্ব ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া আইনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, আন্তর্জাতিক বা সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যেকোনো মেয়াদের কারাদণ্ড অথবা অনূর্ধ্ব ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

তবে আইনের এই সংশোধনী এবং বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডের বিধান নিয়ে আইন বিশেষজ্ঞ মহলে তীব্র বিতর্ক ও উদ্বেগ রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী ইসরাত হাসান মন্তব্য করেন যে, অনলাইনে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি হলেও কে বা কারা কার নাম ও পরিচয় ব্যবহার করে এই কারবার চালাচ্ছে তা নিখুঁতভাবে শনাক্ত এবং প্রমাণ করা অত্যন্ত জটিল একটি প্রক্রিয়া। ভুয়া বা হ্যাক করা অ্যাকাউন্ট এবং সাজানো ডিজিটাল তথ্যের অপব্যবহার করে যেকোনো নিরীহ মানুষকে খুব সহজেই ফাঁসানোর সুযোগ থেকে যায়। তিনি আরও বলেন, মাদক উদ্ধার না হলে সংশ্লিষ্ট পদার্থের রাসায়নিক পরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়াও সম্ভব হয় না, ফলে সেটি আদতে মাদক ছিল কি না এবং কী ধরনের মাদক ছিল তা প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ডিজিটাল তথ্যের সত্যতা এবং অভিযুক্তের প্রকৃত সম্পৃক্ততা শতভাগ নিশ্চিত করা আবশ্যক উল্লেখ করে তিনি বলেন, মাদক উদ্ধার ছাড়াই শাস্তির বিধান—বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডের মতো সর্বোচ্চ শাস্তির খড়্গ ঝোলানো ন্যায়বিচারের মৌলিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ, উদ্ধার বাধ্যতামূলক না করা হলেও অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সন্দেহাতীতভাবে অপরাধ প্রমাণের চূড়ান্ত দায় কিন্তু সম্পূর্ণভাবেই রাষ্ট্রপক্ষের ওপর বর্তায়।

Share this news as a Photo Card