ঢাকা ১১:৪৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

নির্বাচনের আগে রেমিট্যান্সে স্বস্তি, হুন্ডি ও জাল নোটের আশঙ্কা

সরকারের নানা উদ্যোগে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বেড়ে চলেছে, যা দেশের অর্থনীতিতে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও কিছুটা স্বস্তি পেয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে রেমিট্যান্স এসেছে ১০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। পাশাপাশি হুন্ডির দৌরাত্ম্য কমেছে এবং ডলারের বাজারেও কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরেছে।

তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে অর্থনীতির এই স্বস্তির পরিবেশে হুন্ডি ও জাল নোটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে হুন্ডি ব্যবসায়ীদের সক্রিয়তা বাড়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে, যা বৈধপথে রেমিট্যান্স প্রবাহকে ব্যাহত করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনের আগে প্রবাসী আয় বাড়া স্বাভাবিক হলেও হুন্ডির বিস্তার বৈধ চ্যানেলের প্রবাহকে বিপদে ফেলতে পারে। এ কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

এছাড়া নির্বাচনের আগে বাজারে জাল নোট ছড়ানোর আশঙ্কাও রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, কিছু মহল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে জাল টাকা ছড়িয়ে ভোটারদের প্রভাবিত করতে পারে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যৌথভাবে কাজ করছে এবং নিয়মিত মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা নিয়েছে। সম্প্রতি তারা এক বৈঠকে নির্বাচনের সময় জাল নোটের প্রবাহ ও হুন্ডির বিস্তার ঠেকাতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত রেমিট্যান্স প্রবাহ ছিল যথাক্রমে জুলাইয়ে ২৪৭ কোটি ৭৮ লাখ, আগস্টে ২৪২ কোটি ১৯ লাখ, সেপ্টেম্বরে ২৬৮ কোটি ৫৮ লাখ এবং অক্টোবরে ২৫৬ কোটি ৩৪ লাখ ৮০ হাজার ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট রেমিট্যান্স ছিল ৩০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ২৬ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি।

এই ইতিবাচক প্রবাহের মধ্যেই হুন্ডি ও জাল নোটের আশঙ্কা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। নির্বাচনের আগে এ দুটি ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারের বিভিন্ন সংস্থা একযোগে কাজ করছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক মানুষকে ক্যাশলেস লেনদেনে উৎসাহিত করছে, বিশেষ করে সীমান্ত এলাকায়, যাতে জাল নোট প্রবাহের ঝুঁকি কমে।

অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, নির্বাচনের সময় অর্থের প্রবাহ বেড়ে যায় এবং অনেক সময় প্রার্থীরা নগদ অর্থ ব্যবহার করেন। তাই রেমিট্যান্সকে বৈধ পথে আনতে, হুন্ডি দুর্বল করতে ও জাল নোট ঠেকাতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি। এখন ব্যাংক ও খোলাবাজারে ডলারের দাম প্রায় সমান, ফলে প্রবাসীরা বৈধপথেই টাকা পাঠাতে আগ্রহী হচ্ছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, প্রবাসীদের সচেতন করতে কাজ চলছে এবং ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বৈধপথে রেমিট্যান্সের ডলারের দাম স্থিতিশীল রয়েছে, তাই হুন্ডির প্রসার তেমন বাড়বে না। সম্পূর্ণ বন্ধ করা সম্ভব না হলেও তা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে।

তিনি আরও জানান, সীমান্ত এলাকা ও নগরাঞ্চলে জাল নোট রোধে বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে। বড় আর্থিক লেনদেন ব্যাংকিং চ্যানেলে করতে সবাইকে উৎসাহিত করা হচ্ছে, যাতে অর্থনীতি ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা দুটোই সুরক্ষিত থাকে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সাধারণ মানুষ ও প্রবাসীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, জমি, ফ্ল্যাট বা বড় কোনো সম্পত্তি কেনাবেচার সময় অবশ্যই ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করতে। হুন্ডির মাধ্যমে পাঠানো অর্থ সরকারি রেকর্ডে না থাকায় তা অবৈধ বিবেচিত হতে পারে। তাই দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রেরণ ও ক্যাশলেস লেনদেন বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধ: সালমান ও আনিসুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আদেশ আজ

নির্বাচনের আগে রেমিট্যান্সে স্বস্তি, হুন্ডি ও জাল নোটের আশঙ্কা

আপডেট সময় : ০৩:২৮:৩৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৫

সরকারের নানা উদ্যোগে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বেড়ে চলেছে, যা দেশের অর্থনীতিতে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও কিছুটা স্বস্তি পেয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে রেমিট্যান্স এসেছে ১০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। পাশাপাশি হুন্ডির দৌরাত্ম্য কমেছে এবং ডলারের বাজারেও কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরেছে।

তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে অর্থনীতির এই স্বস্তির পরিবেশে হুন্ডি ও জাল নোটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে হুন্ডি ব্যবসায়ীদের সক্রিয়তা বাড়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে, যা বৈধপথে রেমিট্যান্স প্রবাহকে ব্যাহত করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনের আগে প্রবাসী আয় বাড়া স্বাভাবিক হলেও হুন্ডির বিস্তার বৈধ চ্যানেলের প্রবাহকে বিপদে ফেলতে পারে। এ কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

এছাড়া নির্বাচনের আগে বাজারে জাল নোট ছড়ানোর আশঙ্কাও রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, কিছু মহল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে জাল টাকা ছড়িয়ে ভোটারদের প্রভাবিত করতে পারে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যৌথভাবে কাজ করছে এবং নিয়মিত মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা নিয়েছে। সম্প্রতি তারা এক বৈঠকে নির্বাচনের সময় জাল নোটের প্রবাহ ও হুন্ডির বিস্তার ঠেকাতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত রেমিট্যান্স প্রবাহ ছিল যথাক্রমে জুলাইয়ে ২৪৭ কোটি ৭৮ লাখ, আগস্টে ২৪২ কোটি ১৯ লাখ, সেপ্টেম্বরে ২৬৮ কোটি ৫৮ লাখ এবং অক্টোবরে ২৫৬ কোটি ৩৪ লাখ ৮০ হাজার ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট রেমিট্যান্স ছিল ৩০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ২৬ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি।

এই ইতিবাচক প্রবাহের মধ্যেই হুন্ডি ও জাল নোটের আশঙ্কা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। নির্বাচনের আগে এ দুটি ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারের বিভিন্ন সংস্থা একযোগে কাজ করছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক মানুষকে ক্যাশলেস লেনদেনে উৎসাহিত করছে, বিশেষ করে সীমান্ত এলাকায়, যাতে জাল নোট প্রবাহের ঝুঁকি কমে।

অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, নির্বাচনের সময় অর্থের প্রবাহ বেড়ে যায় এবং অনেক সময় প্রার্থীরা নগদ অর্থ ব্যবহার করেন। তাই রেমিট্যান্সকে বৈধ পথে আনতে, হুন্ডি দুর্বল করতে ও জাল নোট ঠেকাতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি। এখন ব্যাংক ও খোলাবাজারে ডলারের দাম প্রায় সমান, ফলে প্রবাসীরা বৈধপথেই টাকা পাঠাতে আগ্রহী হচ্ছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, প্রবাসীদের সচেতন করতে কাজ চলছে এবং ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বৈধপথে রেমিট্যান্সের ডলারের দাম স্থিতিশীল রয়েছে, তাই হুন্ডির প্রসার তেমন বাড়বে না। সম্পূর্ণ বন্ধ করা সম্ভব না হলেও তা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে।

তিনি আরও জানান, সীমান্ত এলাকা ও নগরাঞ্চলে জাল নোট রোধে বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে। বড় আর্থিক লেনদেন ব্যাংকিং চ্যানেলে করতে সবাইকে উৎসাহিত করা হচ্ছে, যাতে অর্থনীতি ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা দুটোই সুরক্ষিত থাকে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সাধারণ মানুষ ও প্রবাসীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, জমি, ফ্ল্যাট বা বড় কোনো সম্পত্তি কেনাবেচার সময় অবশ্যই ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করতে। হুন্ডির মাধ্যমে পাঠানো অর্থ সরকারি রেকর্ডে না থাকায় তা অবৈধ বিবেচিত হতে পারে। তাই দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রেরণ ও ক্যাশলেস লেনদেন বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।