আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই সারা দেশে একযোগে সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত ঐতিহাসিক গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই গণভোটে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’-এর স্বপক্ষে প্রকাশ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটের ঘোষণা দিয়ে মাঠে নেমেছে জামায়াতে ইসলামী ও ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) সহ ১১টি রাজনৈতিক দল। দলগুলো তাদের নির্বাচনী প্রচারণার পাশাপাশি বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সমাবেশ, পথসভা এবং নিবিড় গণসংযোগের মাধ্যমে এই সংস্কারের পক্ষে জনমত গঠনের কৌশল গ্রহণ করেছে। তবে প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি এখন পর্যন্ত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ কোনো পক্ষেই অবস্থান স্পষ্ট না করায় নির্বাচনের আগেই দেশের রাজনীতি কার্যত দুই মেরুতে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
গণভোটের মাধ্যমে মূলত সংবিধানের কয়েকটি মৌলিক সংস্কারে জনগণের সম্মতি যাচাই করা হবে। প্রস্তাবিত সংস্কারগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতার ভারসাম্য আনা, নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক স্বাধীনতা জোরদার করা, বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা, প্রশাসনে দলীয়করণের অবসান এবং নাগরিকের মৌলিক ও ভোটাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করা। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে আর কোনোদিন স্বৈরতান্ত্রিক বা একক ক্ষমতার রাজনীতি ফিরে আসার সুযোগ থাকবে না। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ এবং ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন ইতোমধ্যেই বিভিন্ন সভায় ‘হ্যাঁ’ ভোটের গুরুত্ব তুলে ধরে একে আগামী ৫০ বছরের রাষ্ট্রপথ নির্ধারণের লড়াই হিসেবে অভিহিত করেছেন।
রাজনৈতিক এই মেরুকরণে ১১ দলের লিয়াজোঁ কমিটি সমন্বিতভাবে কাজ শুরু করেছে। জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার একে দুর্নীতি ও ফ্যাসিবাদকে ‘না’ বলার মাধ্যম হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বৈরাচারকে বর্জন করে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলার আহ্বান জানিয়েছেন। খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস এবং খেলাফত আন্দোলনের শীর্ষ নেতারাও নিজ নিজ দলের পক্ষ থেকে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণায় সরব হয়েছেন। তারা মনে করছেন, নতুন বাংলাদেশ গড়তে এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন আনতে এই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়া অপরিহার্য। তবে তারা একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের ফলে প্রচারণার গুরুত্ব কমে যাওয়ার বিষয়ে কিছুটা উদ্বেগও প্রকাশ করেছেন।
অন্যদিকে, বিএনপি এসব সংস্কার প্রস্তাবনা নিয়ে শুরু থেকেই কিছুটা আপত্তি জানিয়ে আসছে। দলটির নেতাদের মতে, গণভোটের প্রশ্ন ও প্রস্তাবগুলো রাজনৈতিকভাবে একতরফা হতে পারে। তারা বর্তমানে গণভোটের চেয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকেই তাদের মূল লক্ষ্য বা প্রধান এজেন্ডা হিসেবে বিবেচনা করছেন। বিশ্লেষকদের মতে, সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে হওয়ায় ভোটারদের আচরণে এর বড় প্রভাব পড়তে পারে। সরকার ও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে গণভোটের প্রচারণা আরও জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন অনেক জোটবদ্ধ নেতা। শেষ পর্যন্ত ১২ ফেব্রুয়ারির এই ব্যালট যুদ্ধ কেবল প্রার্থী নির্বাচনের লড়াই নয়, বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রদর্শন ও ক্ষমতার কাঠামো নির্ধারণের এক ঐতিহাসিক রেফারেন্ডাম বা গণরায় হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
রিপোর্টারের নাম 

























