উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করতে নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা বাঙালির এক চিরন্তন প্রথা। প্রতি বছর ঈদের আগে রাজধানীসহ বড় শহরগুলো থেকে প্রায় দেড় কোটির বেশি মানুষ শেকড়ের খোঁজে গ্রামে ছোটেন। কিন্তু এই বিশাল যাত্রাপথ কখনোই আমাদের জন্য পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক ছিল না। তবে এবারের চিত্রপট যেন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে একটু বেশিই অস্বাভাবিক এবং উদ্বেগজনক। একদিকে সড়কে দীর্ঘ যানজট, অন্যদিকে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আর লাশের সারি। মাত্র এক মাস আগে দায়িত্ব নেওয়া একটি নতুন সরকার যখন রাষ্ট্র সংস্কারের মতো বিশাল কর্মযজ্ঞে হাত দিয়েছে, ঠিক সেই মুহূর্তে পরিবহন খাতের এই চরম নৈরাজ্য কি শুধুই দুর্ঘটনা? নাকি এর নেপথ্যে রয়েছে এক মাসের এই নবীন সরকারকে জনসমক্ষে ব্যর্থ প্রমাণ করার কোনো সুগভীর ব্লু-প্রিন্ট?
সিন্ডিকেটের পরিকল্পিত ‘পুশব্যাক’
পরিসংখ্যান বলছে, দেশের পরিবহন খাত দীর্ঘদিন ধরেই একটি শক্তিশালী মাফিয়া চক্রের হাতে জিম্মি। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির বিভিন্ন সময়ের প্রতিবেদন ঘাটলেই দেখা যায়, সড়কে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক আনফিট গাড়ি চলাচল করে এবং এসব গাড়ির চালকদের অনেকেরই বৈধ লাইসেন্স নেই। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরই চাঁদাবাজি ও অবৈধ গাড়ির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করে। মহাসড়কগুলো থেকে রাজনৈতিক ও পুলিশি চাঁদাবাজি বন্ধের কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়। আর এখানেই আঘাত লেগেছে দশকের পর দশক ধরে গড়ে ওঠা কায়েমি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর গায়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের যানজট ও দুর্ঘটনার ধরনটি বেশ সন্দেহজনক। ঈদের ঠিক দুই-তিন দিন আগে হঠাৎ করেই মহাসড়কগুলোতে এমন হাজার হাজার ফিটনেসবিহীন লক্কড়ঝক্কড় বাস নামিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। এগুলো রাস্তায় বারবার বিকল হয়ে কৃত্রিম যানজট তৈরি করেছে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, “যেকোনো নতুন সরকার যখন পুরোনো ও দুর্নীতিগ্রস্ত কোনো সিস্টেমে আঘাত করে, তখন সেই সিস্টেমের সুবিধাভোগীরা পাল্টা আঘাত (Pushback) করে। পরিবহন খাতের বর্তমান অরাজকতা মূলত সেই সিন্ডিকেটের একটি সুপরিকল্পিত চাল। তারা সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে সরকারকে বার্তা দিতে চাইছে যে, তাদের স্বার্থে আঘাত লাগলে তারা পুরো দেশকে স্থবির করে দিতে পারে।”
কাঠামোগত দুর্বলতা নাকি ষড়যন্ত্রের জাল?
মাত্র চার সপ্তাহের শাসনামলে কোনো সরকারের পক্ষেই রাতারাতি একটি দেশের জরাজীর্ণ পরিবহন ব্যবস্থা আমূল বদলে ফেলা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের (এআরআই) একাধিক গবেষণায় বারবার উঠে এসেছে যে, আমাদের সড়ক দুর্ঘটনাগুলোর মূল কারণ কাঠামোগত ত্রুটি, চালকদের বেপরোয়া মানসিকতা এবং আইনের প্রয়োগহীনতা।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের একজন অধ্যাপক বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে—“এক মাসের একটি সরকারের কাছে আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ থাকে না। বছরের পর বছর ধরে বিআরটিএ-তে যে দুর্নীতির আখড়া গড়ে উঠেছে, তা ভাঙতে সময় লাগবে। এবারের ঈদযাত্রায় আমরা দেখেছি, প্রশাসন চেষ্টা করেছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে ঘাপটি মেরে থাকা পূর্ববর্তী ব্যবস্থার সুবিধাভোগী কিছু অসাধু কর্মকর্তা সরকারের নির্দেশনাকে সুকৌশলে অকার্যকর করার চেষ্টা করেছে। মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে ট্রাফিক পুলিশের রহস্যময় নিষ্ক্রিয়তা এর একটি বড় প্রমাণ।”
ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত ও নাগরিক দায়
এত ষড়যন্ত্র ও প্রতিকূলতার মাঝেও সরকারের সদিচ্ছার কোনো ঘাটতি দেখা যায়নি। বিগত দিনের মতো এবার কোনো মন্ত্রী বা সরকারি আমলাকে ‘সব ঠিক আছে’ বলে মিডিয়ার সামনে বাগাড়ম্বর করতে দেখা যায়নি; বরং তারা সমস্যা স্বীকার করে নিয়ে তা সমাধানের চেষ্টা করেছেন। প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন মহাসড়কে। চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
দুর্ঘটনায় ঝরে যাওয়া প্রতিটি প্রাণ আমাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। স্বজন হারানো পরিবারের কান্না কোনো সান্ত্বনাতেই থামার নয়। কিন্তু আমাদের আবেগকে পুঁজি করে যারা ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চাইছে, তাদের চক্রান্ত বুঝতে হবে।
একটি নিরাপদ ও আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বর্তমান সরকার যে রূপরেখা নিয়ে এগোচ্ছে, তা বাস্তবায়ন করতে সময় ও ধৈর্য প্রয়োজন। সিন্ডিকেটের এই পরিকল্পিত বিশৃঙ্খলার ফাঁদে পা দিয়ে নতুন সরকারের প্রতি আস্থা হারানোটা হবে ষড়যন্ত্রকারীদেরই বিজয়। তাই আবেগ নয়, বরং যৌক্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে সরকারকে তার সংস্কার কাজে সহযোগিতা করা এবং তাদের অন্তত কাজ করার সময়টুকু দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
রিপোর্টারের নাম 
























