মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ত্রিমুখী সংঘাতের আঁচ এখন কোটি কোটি সাধারণ মানুষের পকেটে। পারস্য উপসাগরের আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র আর ড্রোন যুদ্ধের দামামা বাজলেও তার মূল্য চুকাতে হচ্ছে ঢাকা থেকে নয়াদিল্লি, ম্যানিলা থেকে সিউল—বিশ্বের হাজার হাজার প্রান্তিক মানুষকে। হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি নৌপথ স্থবির হয়ে পড়ায় বিশ্বজুড়ে সরবরাহ সংকটের পাশাপাশি তেলের দামে আগুন লেগেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বিশ্লেষকরা একে ‘ধনীর বাধানো যুদ্ধে গরিবের ভোগান্তি’ হিসেবে অভিহিত করছেন।
বাংলাদেশে দুর্ভোগের চিত্র রাজধানীর পাম্পগুলোতে এখন যানবাহনের মাইলের পর মাইল দীর্ঘ সারি। সরবরাহ সীমিত হওয়ায় সরকার জ্বালানি তেল বিক্রিতে সীমা বেঁধে দিয়েছে। মোটরসাইকেল চালক শাকিল খান জানান, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ায় তার দৈনিক আয় তলানিতে ঠেকেছে। রাইসুল ইসলামের মতো গাড়ি চালকদের দিনে দুবার পাম্পে লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। সাধারণ মানুষের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে অর্থনীতির ওপর এমন চাপ সৃষ্টি হবে যা কাটিয়ে ওঠা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
দক্ষিণ এশিয়ায় হাহাকার জ্বালানির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল দক্ষিণ এশিয়া এখন সবচেয়ে ঝুঁকিতে। ভারতে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) জন্য মানুষ রাত ৩টা থেকে লাইনে দাঁড়াচ্ছে। রান্নার গ্যাস না পেয়ে অনেক পরিবার লাকড়ির চুলায় ফিরতে বাধ্য হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ভারত সরকার শিল্পখাতের জ্বালানি কমিয়ে গৃহস্থালিতে সরবরাহ করার মতো জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রতিবেশী পাকিস্তানেও জ্বালানি সাশ্রয়ে স্কুল বন্ধ রাখা এবং সরকারি কর্মকর্তাদের নতুন এসি বা আসবাব কেনায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে নেওয়া কঠোর পদক্ষেপ
- দক্ষিণ কোরিয়া: ৩০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো জ্বালানি পণ্যের দামে সীমা বেঁধে দিয়েছে এবং হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে বিকল্প পথে জ্বালানি পরিবহনের চেষ্টা করছে।
- থাইল্যান্ড: সরকারি কর্মচারীদের বিদেশ সফর স্থগিত করে বাসা থেকে কাজ করার (Work from Home) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
- ফিলিপাইন: জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারি কার্যদিবস চার দিনে নামিয়ে আনা হয়েছে এবং অফিসের এসির তাপমাত্রা ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
মন্দার ঝুঁকিতে খোদ যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের বাধানো যুদ্ধের প্রভাব থেকে মুক্ত নয় যুক্তরাষ্ট্রও। প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় মার্কিন ভোক্তাদের ওপর চাপ বাড়ছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি সত্তরের দশকের মতো গভীর মন্দার মুখে পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA) পরিস্থিতি সামাল দিতে নিজেদের মজুদ থেকে রেকর্ড ৪০ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে, যা সংস্থাটির ইতিহাসে নজিরবিহীন।
জাতিসংঘ সতর্ক করে বলেছে, এই যুদ্ধের প্রভাব শুধু নির্দিষ্ট অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা ও সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে এমন আঘাত হানবে যার পরিণতি হবে ভয়াবহ। সরকারগুলো নানা পদক্ষেপ নিলেও জনমনে স্বস্তি ফিরছে না, কারণ এই সংকটের শেষ কোথায়—তা কারোরই জানা নেই।
রিপোর্টারের নাম 



















