ঢাকা ০৩:১৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

রাজনীতিতে ফেরার তৎপরতা: ভারত-কেন্দ্রিক আওয়ামী লীগের নতুন চাল?

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৩৬:৪৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১৩ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে সক্রিয় করার তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একদিকে যখন নবগঠিত সরকার দেশ পরিচালনায় নিজেদের অবস্থান সুসংহত করছে, অন্যদিকে আওয়ামী লীগও বিভিন্ন মাধ্যমে তাদের প্রত্যাবর্তনকে জোরদার করার চেষ্টা চালাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে, প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের কূটনৈতিক অঙ্গন এবং সে দেশের গণমাধ্যমেও আওয়ামী লীগ এবং এর শীর্ষনেত্রী শেখ হাসিনার প্রসঙ্গটি বারবার আলোচিত হচ্ছে।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর, ১৪ ফেব্রুয়ারি ভারতের একটি পরিচিত পত্রিকা ‘দ্য ট্রিবিউন’ তাদের প্রতিবেদনে বাংলাদেশে নিযুক্ত সাবেক ভারতীয় হাইকমিশনার বীণা সিক্রির একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে। সেখানে তিনি ইঙ্গিত দেন যে, বাংলাদেশের নতুন সরকার হয়তো আওয়ামী লীগের উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। বীণা সিক্রি বলেন, “যেহেতু বাংলাদেশে নির্বাচন শেষ হয়ে গেছে, তাই নতুন প্রধানমন্ত্রী হয়তো প্রথম ধাপে ভাববেন কেন আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা উঠানো যাবে না।” এই মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, বর্তমানে আওয়ামী লীগের উপর যে নিষেধাজ্ঞা বলবৎ রয়েছে এবং যার কারণে দলটি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেনি, তা ভবিষ্যতে পুনর্বিবেচনার সম্ভাবনা রয়েছে।

সাবেক এই কূটনীতিক আরও উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং জামায়াতে ইসলামীর জোট প্রায় সমানে সমানে ভোট পেলেও শেষ পর্যন্ত বিএনপি জোট কিছুটা ভালো ফল করেছে। তার এই পর্যবেক্ষণ বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতাকে নতুন নেতৃত্বের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছে, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনার প্রশ্নে।

বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা বিদ্যমান এবং তারা এই বারের নির্বাচনে অংশ নেয়নি। এই নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত বিষয়টি নিয়ে ভারতই সবচেয়ে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

নির্বাচন পরবর্তী সময়ে, ১৪ ফেব্রুয়ারি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ভারতীয় এক সাংবাদিক আওয়ামী লীগ এবং নতুন সরকারের আন্তর্জাতিক অপরাধ সংক্রান্ত অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। জবাবে তারেক রহমান বলেন, “আইন মেনে চলার মাধ্যমে” (By ensuring rule of law) এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, বিএনপি বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ রক্ষা করেই পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করবে। ব্রিটিশ গণমাধ্যম ‘দ্য ইনডিপেনডেন্ট’ এর একজন সাংবাদিক ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার ভাগ্নী টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতির মামলাগুলো এগিয়ে নেওয়া হবে কিনা, সেই প্রশ্নও উত্থাপন করেন।

এসব প্রশ্নের উত্তরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, বিএনপির পররাষ্ট্রনীতি সকল দেশের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে, কোনো নির্দিষ্ট দেশকে কেন্দ্র করে নয়। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমরা অবশ্যই বিচার বিভাগকে নির্বাহী ও আইনসভা বিভাগ থেকে পৃথক রাখতে চাই।” ভারত, পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে পুনরায় প্রশ্ন করা হলে তারেক রহমান তা পূর্বেই উত্তর দেওয়া হয়েছে বলে জানান এবং আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী পুনরায় বলেন, “দেশের স্বার্থ ঠিক রেখে আমাদের নীতি নির্ধারিত হবে।”

শেখ হাসিনার পুত্রের প্রত্যাবর্তনের আকুতি:

এদিকে, ব্রিটিশ গণমাধ্যম আইটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় নির্বাচনকে স্বীকৃতি দিতে রাজি না হলেও, তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হলে তার সঙ্গে আলোচনায় বসতে রাজি বলে জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত জয় ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দাবি করেন যে, দেশের বৃহত্তম দল এবং সব প্রগতিশীল দলকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন যে, নির্বাচন এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে জামায়াতে ইসলামী তাদের জনসমর্থনের তুলনায় বেশি প্রভাব বিস্তার করতে পারে।

আওয়ামী লীগের শাসনামলে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার জামায়াতকে নিষিদ্ধ করেনি, বরং আদালতের রায়ের কারণে তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। গঠনতন্ত্র সংশোধন করলে তারা আবার অংশ নিতে পারত। বাংলাদেশে ফেরার প্রসঙ্গে জয় বলেন, তিনি অবশ্যই একদিন ফিরবেন এবং মন্তব্য করেন যে, “তারেক রহমান, যিনি দণ্ডিত হয়েছিলেন, তিনি এখন সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী। এসব পরিস্থিতি চিরস্থায়ী হয় না।” শেখ হাসিনার দেশে ফেরা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তার কোনো সন্দেহ নেই যে তিনি একদিন ফিরবেন, তবে এই মুহূর্তে দেশে ফেরা নিরাপদ হবে না।

আওয়ামী লীগের অফিস খোলার ঘটনা ও প্রাসঙ্গিকতা:

নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরদিন থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলায় আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কার্যালয়গুলো পুনরায় খোলার ঘটনা সামনে এসেছে। পঞ্চগড় সদরের চাকলাহাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ কার্যালয়, যা এতদিন তালাবদ্ধ ছিল, নির্বাচনের পরদিন বিএনপি নেতা আবু দাউদ প্রধান কর্তৃক খুলে দেওয়া হয়। এই ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং তিনি জানান যে, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে তিনি এই পদক্ষেপ নিয়েছেন এবং আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়াবেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা এই স্থানটি মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহারের কথা বললেও, পরবর্তীতে কিছু প্রতিবেদনে ঘরটিকে আওয়ামী লীগের অফিস নয় বরং গুদামঘর হিসেবে উল্লেখ করা হয় এবং ভিডিওটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ছড়ানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়।

একইভাবে, ১৫ ফেব্রুয়ারি খুলনায় দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা জেলা ও টাউন আওয়ামী লীগ কার্যালয় পুনরায় খোলা হয়, যেখানে দলীয় পতাকা উত্তোলন এবং শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার প্রতিকৃতিতে মাল্যদান করা হয়। স্থানীয় নেতারা দলীয় কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। দিনাজপুর এবং ঠাকুরগাঁও, পীরগঞ্জেও দীর্ঘ সময় পর উপজেলা আওয়ামী লীগকে প্রকাশ্যে সক্রিয় হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে, ১৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২-এ শেখ মুজিবুর রহমানের ভগ্ন বাসভবনে শ্রদ্ধা জানাতে গেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আ ক ম জামাল উদ্দিনসহ পাঁচজনকে পুলিশ নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়। জনরোষের মুখে তাদের হেফাজতে নেওয়া হলেও, পুলিশ জানায় এটি গ্রেপ্তার নয়, বরং নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল এবং পরে ছেড়ে দেওয়া হয়।

মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচার ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট:

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা ও অন্যান্য নেতাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ও বিচার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। গত বছর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। এছাড়া, রাষ্ট্রবিরোধী মামলায় শেখ হাসিনাসহ ২৮৫ জনের বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়া প্রস্তুত হয়েছে। দুর্নীতি মামলায় তাকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং তিনি বর্তমানে পলাতক।

নির্বাচন-পরবর্তী এই ধারাবাহিক ঘটনাপ্রবাহ, যেখানে একদিকে আওয়ামী লীগের প্রকাশ্য পুনরাগমনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, অন্যদিকে বিচার প্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া—সব মিলিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন এক নতুন ও জটিল অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আইনজীবীদের মতে, আওয়ামী লীগের শাসনামলে বিএনপির নেতাকর্মীদের উপর যে জেল-জুলুম, খুন ও গুমের ঘটনা ঘটেছিল, তার বিচার হওয়ার আগেই আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত হতে দেওয়া হবে একটি বড় অন্যায়। এই পরিস্থিতি আগামী দিনে দেশের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতিকে কোন দিকে নিয়ে যায়, তা সময়ই বলে দেবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

সমঝোতার চাঁদা বৈধ হলেও চাঁদাবাজি রুখতে কঠোর হুঁশিয়ারি নৌমন্ত্রীর

রাজনীতিতে ফেরার তৎপরতা: ভারত-কেন্দ্রিক আওয়ামী লীগের নতুন চাল?

আপডেট সময় : ০৯:৩৬:৪৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে সক্রিয় করার তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একদিকে যখন নবগঠিত সরকার দেশ পরিচালনায় নিজেদের অবস্থান সুসংহত করছে, অন্যদিকে আওয়ামী লীগও বিভিন্ন মাধ্যমে তাদের প্রত্যাবর্তনকে জোরদার করার চেষ্টা চালাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে, প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের কূটনৈতিক অঙ্গন এবং সে দেশের গণমাধ্যমেও আওয়ামী লীগ এবং এর শীর্ষনেত্রী শেখ হাসিনার প্রসঙ্গটি বারবার আলোচিত হচ্ছে।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর, ১৪ ফেব্রুয়ারি ভারতের একটি পরিচিত পত্রিকা ‘দ্য ট্রিবিউন’ তাদের প্রতিবেদনে বাংলাদেশে নিযুক্ত সাবেক ভারতীয় হাইকমিশনার বীণা সিক্রির একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে। সেখানে তিনি ইঙ্গিত দেন যে, বাংলাদেশের নতুন সরকার হয়তো আওয়ামী লীগের উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। বীণা সিক্রি বলেন, “যেহেতু বাংলাদেশে নির্বাচন শেষ হয়ে গেছে, তাই নতুন প্রধানমন্ত্রী হয়তো প্রথম ধাপে ভাববেন কেন আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা উঠানো যাবে না।” এই মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, বর্তমানে আওয়ামী লীগের উপর যে নিষেধাজ্ঞা বলবৎ রয়েছে এবং যার কারণে দলটি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেনি, তা ভবিষ্যতে পুনর্বিবেচনার সম্ভাবনা রয়েছে।

সাবেক এই কূটনীতিক আরও উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং জামায়াতে ইসলামীর জোট প্রায় সমানে সমানে ভোট পেলেও শেষ পর্যন্ত বিএনপি জোট কিছুটা ভালো ফল করেছে। তার এই পর্যবেক্ষণ বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতাকে নতুন নেতৃত্বের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছে, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনার প্রশ্নে।

বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা বিদ্যমান এবং তারা এই বারের নির্বাচনে অংশ নেয়নি। এই নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত বিষয়টি নিয়ে ভারতই সবচেয়ে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

নির্বাচন পরবর্তী সময়ে, ১৪ ফেব্রুয়ারি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ভারতীয় এক সাংবাদিক আওয়ামী লীগ এবং নতুন সরকারের আন্তর্জাতিক অপরাধ সংক্রান্ত অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। জবাবে তারেক রহমান বলেন, “আইন মেনে চলার মাধ্যমে” (By ensuring rule of law) এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, বিএনপি বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ রক্ষা করেই পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করবে। ব্রিটিশ গণমাধ্যম ‘দ্য ইনডিপেনডেন্ট’ এর একজন সাংবাদিক ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার ভাগ্নী টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতির মামলাগুলো এগিয়ে নেওয়া হবে কিনা, সেই প্রশ্নও উত্থাপন করেন।

এসব প্রশ্নের উত্তরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, বিএনপির পররাষ্ট্রনীতি সকল দেশের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে, কোনো নির্দিষ্ট দেশকে কেন্দ্র করে নয়। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমরা অবশ্যই বিচার বিভাগকে নির্বাহী ও আইনসভা বিভাগ থেকে পৃথক রাখতে চাই।” ভারত, পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে পুনরায় প্রশ্ন করা হলে তারেক রহমান তা পূর্বেই উত্তর দেওয়া হয়েছে বলে জানান এবং আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী পুনরায় বলেন, “দেশের স্বার্থ ঠিক রেখে আমাদের নীতি নির্ধারিত হবে।”

শেখ হাসিনার পুত্রের প্রত্যাবর্তনের আকুতি:

এদিকে, ব্রিটিশ গণমাধ্যম আইটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় নির্বাচনকে স্বীকৃতি দিতে রাজি না হলেও, তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হলে তার সঙ্গে আলোচনায় বসতে রাজি বলে জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত জয় ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দাবি করেন যে, দেশের বৃহত্তম দল এবং সব প্রগতিশীল দলকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন যে, নির্বাচন এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে জামায়াতে ইসলামী তাদের জনসমর্থনের তুলনায় বেশি প্রভাব বিস্তার করতে পারে।

আওয়ামী লীগের শাসনামলে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার জামায়াতকে নিষিদ্ধ করেনি, বরং আদালতের রায়ের কারণে তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। গঠনতন্ত্র সংশোধন করলে তারা আবার অংশ নিতে পারত। বাংলাদেশে ফেরার প্রসঙ্গে জয় বলেন, তিনি অবশ্যই একদিন ফিরবেন এবং মন্তব্য করেন যে, “তারেক রহমান, যিনি দণ্ডিত হয়েছিলেন, তিনি এখন সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী। এসব পরিস্থিতি চিরস্থায়ী হয় না।” শেখ হাসিনার দেশে ফেরা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তার কোনো সন্দেহ নেই যে তিনি একদিন ফিরবেন, তবে এই মুহূর্তে দেশে ফেরা নিরাপদ হবে না।

আওয়ামী লীগের অফিস খোলার ঘটনা ও প্রাসঙ্গিকতা:

নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরদিন থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলায় আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কার্যালয়গুলো পুনরায় খোলার ঘটনা সামনে এসেছে। পঞ্চগড় সদরের চাকলাহাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ কার্যালয়, যা এতদিন তালাবদ্ধ ছিল, নির্বাচনের পরদিন বিএনপি নেতা আবু দাউদ প্রধান কর্তৃক খুলে দেওয়া হয়। এই ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং তিনি জানান যে, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে তিনি এই পদক্ষেপ নিয়েছেন এবং আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়াবেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা এই স্থানটি মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহারের কথা বললেও, পরবর্তীতে কিছু প্রতিবেদনে ঘরটিকে আওয়ামী লীগের অফিস নয় বরং গুদামঘর হিসেবে উল্লেখ করা হয় এবং ভিডিওটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ছড়ানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়।

একইভাবে, ১৫ ফেব্রুয়ারি খুলনায় দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা জেলা ও টাউন আওয়ামী লীগ কার্যালয় পুনরায় খোলা হয়, যেখানে দলীয় পতাকা উত্তোলন এবং শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার প্রতিকৃতিতে মাল্যদান করা হয়। স্থানীয় নেতারা দলীয় কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। দিনাজপুর এবং ঠাকুরগাঁও, পীরগঞ্জেও দীর্ঘ সময় পর উপজেলা আওয়ামী লীগকে প্রকাশ্যে সক্রিয় হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে, ১৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২-এ শেখ মুজিবুর রহমানের ভগ্ন বাসভবনে শ্রদ্ধা জানাতে গেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আ ক ম জামাল উদ্দিনসহ পাঁচজনকে পুলিশ নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়। জনরোষের মুখে তাদের হেফাজতে নেওয়া হলেও, পুলিশ জানায় এটি গ্রেপ্তার নয়, বরং নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল এবং পরে ছেড়ে দেওয়া হয়।

মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচার ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট:

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা ও অন্যান্য নেতাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ও বিচার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। গত বছর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। এছাড়া, রাষ্ট্রবিরোধী মামলায় শেখ হাসিনাসহ ২৮৫ জনের বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়া প্রস্তুত হয়েছে। দুর্নীতি মামলায় তাকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং তিনি বর্তমানে পলাতক।

নির্বাচন-পরবর্তী এই ধারাবাহিক ঘটনাপ্রবাহ, যেখানে একদিকে আওয়ামী লীগের প্রকাশ্য পুনরাগমনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, অন্যদিকে বিচার প্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া—সব মিলিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন এক নতুন ও জটিল অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আইনজীবীদের মতে, আওয়ামী লীগের শাসনামলে বিএনপির নেতাকর্মীদের উপর যে জেল-জুলুম, খুন ও গুমের ঘটনা ঘটেছিল, তার বিচার হওয়ার আগেই আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত হতে দেওয়া হবে একটি বড় অন্যায়। এই পরিস্থিতি আগামী দিনে দেশের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতিকে কোন দিকে নিয়ে যায়, তা সময়ই বলে দেবে।