জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেছেন, বিএনপি একদিকে ঋণখেলাপি ও হত্যা মামলার আসামিদের মন্ত্রী বানিয়েছে, অন্যদিকে সংসদ সদস্যদের জন্য নির্ধারিত বৈধ সুবিধাগুলো গ্রহণ না করে সাধু সাজার চেষ্টা করছে। বৃহস্পতিবার রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। নাহিদ ইসলাম একই সঙ্গে জাতীয় সংসদ ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকার আহ্বান জানান এবং দাবি করেন, নতুন সরকার গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের চেষ্টা করছে।
সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ ইসলাম বলেন, জাতীয় সংসদে শপথ গ্রহণের দিন বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, তাদের দলের কোনো সংসদ সদস্য শুল্কমুক্ত গাড়ি বা প্লটের মতো সুবিধা নেবেন না। অথচ কয়েকটি বড় বাজেটের মন্ত্রণালয় এমন ব্যবসায়ী ও ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিদের দেওয়া হয়েছে, যারা এসব মন্ত্রণালয় থেকে দুর্নীতি ও আর্থিক অসঙ্গতির কার্যক্রম চালাবেন। তিনি বলেন, “একদিকে তারা বলছে, প্লট নেবে না, গাড়ি নেবে না। কিন্তু তারা ঋণখেলাপিদের সংসদে নিয়ে গেল, ঋণখেলাপিদের মন্ত্রিসভায় স্থান দিচ্ছে। ফলে বৈধ সুবিধাকে অস্বীকার করে জনগণের সামনে সাধু সাজা হচ্ছে, কিন্তু অন্যদিকে ঋণখেলাপি ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের বড় বড় বাজেটের মন্ত্রণালয় দেওয়া হচ্ছে, যাতে সেই সকল মন্ত্রণালয় থেকে দুর্নীতির সুযোগ তারা পায়।”
এনসিপির এই নেতা আক্ষেপ করে বলেন, তারা আশা করেছিলেন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ গণতন্ত্র, দুর্নীতিমুক্ত সুশাসন ও আধিপত্যবাদমুক্ত দেশ হিসেবে এগিয়ে যাবে। কিন্তু সেই স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে। তিনি দাবি করেন, নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে এবং ভোট গ্রহণ সুষ্ঠু হলেও ফলাফলে কারচুপি হয়েছে। এরপরেও গণতন্ত্র ও দেশের স্থিতিশীলতার স্বার্থে তারা নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়েছেন এবং জাতীয় সংসদ ও সংবিধান সংস্কার পরিষদকে কার্যকর করতে শপথ গ্রহণ করেছেন।
নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, সরকারি দল বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ না করে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। তিনি দ্রুত তাদের শপথ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ ছাড়া এই জাতীয় সংসদের কোনো মূল্যই নেই। তিনি উল্লেখ করেন, এই জাতীয় সংসদ শুধু একটি সাধারণ সংসদ নয়, এটি একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবেও কাজ করবে, যা গণঅভ্যুত্থানের পর ঐকমত্য কমিশনের আলোচনা, নির্বাচন ও গণভোটের মাধ্যমে গঠিত হয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিশ্চিত হবে। তিনি হুঁশিয়ারি দেন, যদি গণভোট বাতিল হয়ে যায়, তাহলে সরকারেরও বৈধতা থাকবে না।
নতুন মন্ত্রিসভাকে ‘পুরনো বন্দোবস্তের ধারাবাহিকতা’ আখ্যা দিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, এই মন্ত্রিসভা পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। মন্ত্রিসভায় আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষা করা হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, পঁচিশটি জেলা থেকে কোনো মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী করা হয়নি, যা স্পষ্টত আঞ্চলিক বৈষম্য। এটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বা প্রতিনিধিত্বশীল হয়নি, কারণ নারী, ভিন্ন ধর্মাবলম্বী বা ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ যথেষ্ট পরিমাণ হয়নি।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) তথ্য তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম জানান, প্রায় ৬২ শতাংশ সংসদ সদস্যের ঋণের পরিমাণ ১৮ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা। তিনি আরও বলেন, এই মন্ত্রিসভার প্রায় ৬২ শতাংশ মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ী হওয়া অপরাধ না হলেও, অর্ধেকের বেশি ব্যবসায়ীকে মন্ত্রিত্ব দিলে তারা জনগণের স্বার্থের চেয়ে ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা করবেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ঋণখেলাপিও আছেন। তিনি উদাহরণ হিসেবে বলেন, “অনেক বড় বাজেটের মন্ত্রণালয় এমন একজনকে দেওয়া হলো, যিনি রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী এবং হত্যা মামলার আসামী। ব্যবসায়ের স্বার্থে একটা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দলে তিনি অত গুরুত্বপূর্ণ কেউ না। শুধুমাত্র আর্থিক, ব্যবসায়িক এবং দুর্নীতির কারণেই তাকে সেই মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হয়েছে।”
অন্তর্বর্তী সরকারে খলিলুর রহমানের নিয়োগের বিরোধিতা করা সত্ত্বেও বিএনপি তাকে নিজেদের মন্ত্রিসভায় স্থান দেওয়ায় নাহিদ ইসলাম প্রশ্ন তোলেন। তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও দেশের বিভিন্ন জায়গায় তাদের কার্যালয় খোলা হচ্ছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এই নির্বাচনে ভারত, আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির মধ্যে একটি যোগসাজশ হয়েছে এবং বিএনপি আওয়ামী লীগের পুরো ভোট ব্যাংককে নিজের দিকে নেওয়ার চেষ্টা করেছে।
নতুন সরকার গঠনের সঙ্গে সঙ্গেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ এবং কণ্ঠরোধের চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণ ও নির্দেশনা সত্ত্বেও রমজানে মাছ, মাংস, সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির সমালোচনা করে সিন্ডিকেট ও অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিনসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
রিপোর্টারের নাম 

























