আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে ঘিরে সিলেট বিভাগজুড়ে এখন উৎসবের আমেজ। প্রায় ৯১ লাখ ৬৮ হাজার ভোটারের এই মহাযজ্ঞ নির্বিঘ্ন ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে নেওয়া হয়েছে নজিরবিহীন ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা, যেখানে আকাশ থেকে টহল দিচ্ছে ড্রোন এবং মাটিতে সক্রিয় রয়েছে বিস্ফোরক শনাক্তকারী ডগ স্কোয়াড।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন পর ভোটের এই আমেজে অনেকেই ছুটে যাচ্ছেন গ্রামের বাড়িতে, যা এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে সিলেটজুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছেন।
সিলেট বিভাগের ৪ জেলার ১৯টি আসনে মোট ভোটার সংখ্যা প্রায় ৯১ লাখ ৬৮ হাজার। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশ সনাতন ধর্মাবলম্বী। এবারের নির্বাচনে প্রধান বিরোধী জোটের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা প্রকাশ্যে সক্রিয় থাকলেও মাঠের বাস্তবতা বলছে, দৃশ্যমান লড়াইয়ের পাশাপাশি ‘নীরব ভোট’ বড় ভূমিকা রাখতে পারে। বিদ্রোহী প্রার্থী, জোটের সমঝোতা, সংখ্যালঘু ভোট, চা-শ্রমিক এবং অরাজনৈতিক সংগঠন ও পীর-আলেমদের প্রভাব—সব মিলিয়ে জয়-পরাজয়ের সমীকরণ কয়েকটি আসনে জটিল করে তুলেছে।
বিভাগের মোট ২ হাজার ৮৮১টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১ হাজার ১২৬টি কেন্দ্রকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে ঢেলে সাজানো হয়েছে নিরাপত্তা ছক। সিলেট রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয় ও রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯টি সংসদীয় আসনের অর্ধেকেরও বেশি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ। এর মধ্যে সুনামগঞ্জ জেলায় সর্বাধিক ৪৫১টি এবং মৌলভীবাজারে ২২৩টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় রয়েছে। এসব কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরার পাশাপাশি প্রথমবারের মতো পুলিশ সদস্যদের শরীরে থাকছে ‘বডি-ওর্ন ক্যামেরা’, যার মাধ্যমে কন্ট্রোল রুম থেকে কেন্দ্রের পরিস্থিতি সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা হবে। সীমান্ত আসনগুলোতে ড্রোন নিয়ে দায়িত্ব পালন করবে বিজিবি। দুর্গম হাওরাঞ্চলের কেন্দ্রগুলোতে হেলিকপ্টারের সহায়তা নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
সিলেট জেলায় ১ হাজার ১৬টি কেন্দ্রের মধ্যে ২১৭টি ঝুঁকিপূর্ণ, যার মধ্যে নগরীর ২৯৪টি কেন্দ্রের ৯৫টিকেই ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি)। সুনামগঞ্জ জেলার ৬৬৪টি কেন্দ্রের মধ্যে ৪৫১টি ঝুঁকিপূর্ণ, এর ১৫৭টি দুর্গম হাওরাঞ্চলে অবস্থিত। জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ এহসান শাহ জানিয়েছেন, প্রতিটি উপজেলায় ২ প্লাটুন বিজিবি ও ১ হাজার ১০০ সেনা সদস্য মোতায়েন থাকবে। হবিগঞ্জ জেলায় ৬৪৭টি কেন্দ্রের মধ্যে ২৩৫টি ঝুঁকিপূর্ণ, যার ১০৩টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ। এখানেও প্রথমবারের মতো বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে এবং ১৭ প্লাটুন বিজিবি মাঠে রয়েছে। মৌলভীবাজার জেলার ৫৫৪টি কেন্দ্রের মধ্যে ২২৩টি ঝুঁকিপূর্ণ। জেলা পুলিশ সুপার মো. মনজুর রহমান জানান, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে দ্রুত পৌঁছানোর জন্য মোবাইল টিম ও ফোর্স বিন্যাস করা হয়েছে। নির্বাচনের দিন প্রতিটি সাধারণ কেন্দ্রে ২ জন পুলিশ ও ১৩ জন আনসার সদস্য এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ৩-৪ জন পুলিশ ও ১৫ জন আনসার সদস্য মোতায়েন থাকবেন। এছাড়া স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে র্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর টহল দল সার্বক্ষণিক মাঠে থাকবে।
বুধবার সকাল থেকেই সিলেটের প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে ব্যালট পেপার, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সসহ নির্বাচনের প্রয়োজনীয় সব সরঞ্জাম পৌঁছাতে শুরু করেছে। সিলেটের জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. সারওয়ার আলম এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। এবারের নির্বাচনে ভোটাররা সংসদ সদস্য নির্বাচনের জন্য সাদা এবং গণভোটের জন্য গোলাপি—দুটি ভিন্ন রঙের ব্যালটে ভোট দেবেন। ভোটগ্রহণ চলবে টানা বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, নগরীর সব ভোটকেন্দ্র সিসিটিভির আওতায় আনা হয়েছে এবং যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলায় মোবাইল টিম ও স্ট্রাইকিং ফোর্স প্রস্তুত রয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভোটারদের আশ্বস্ত করে বলা হয়েছে, কেন্দ্রে গিয়ে নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে কঠোর হস্তে দমন করা হবে।
ভোটের এই মহোৎসবে যোগ দিতে মঙ্গলবার থেকেই গ্রামমুখী মানুষের ঢল নেমেছে সড়ক ও রেলপথে। রাজধানী ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো মানুষ সিলেটে ফিরছেন, একইসঙ্গে সিলেটে বসবাসরত অন্য জেলার ভোটাররাও ছুটছেন নিজ নিজ গন্তব্যে। ঢাকা-সিলেট রুটে ট্রেন ও বাসে যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। এদিকে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে সিলেটের তামাবিল স্থলবন্দরের আমদানি-রফতানি কার্যক্রম পাঁচ দিনের জন্য (১১ থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি) সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আমদানি-রফতানি কার্যক্রমে জড়িত মালিক, কর্মচারী, হ্যান্ডলিং শ্রমিক ও ট্রাকচালকেরা যাতে নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সেজন্যই এই পদক্ষেপ। ১৬ ফেব্রুয়ারি সোমবার সকাল থেকে বন্দরের কার্যক্রম পুনরায় চালু হবে।
সিলেট-১ (মহানগর ও সদর) আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টায় সারদা হল ভোটকেন্দ্রে তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। অন্যদিকে, একই আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমান সকাল ৮টায় নগরীর শিবগঞ্জ হাতিমবাগ স্কলার্সহোম স্কুল ও কলেজ কেন্দ্রে ভোট দেবেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ করতে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি) ৭টি জরুরি নির্দেশনা সম্বলিত একটি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। এসএমপি কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী স্বাক্ষরিত এই বিজ্ঞপ্তিতে নগরবাসীকে নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছে, আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রিপোর্টারের নাম 






















