ঢাকা ০৩:৫৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬

মেঘনা চরের নীরব আর্তনাদ: ভোট আসে, সরকার বদলায়, ভাগ্য বদলায় না

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৬:৪৫:৫৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৮ বার পড়া হয়েছে

লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার মেঘনা নদীর বুকে জেগে ওঠা চরাঞ্চলে বসবাসরত হাজারো মানুষের জীবন যেন এক অন্তহীন সংগ্রাম। প্রতিটি নির্বাচনের আগে নানা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিতে আশার আলো জ্বলে উঠলেও, ভোট ফুরালেই সেই আলো মিলিয়ে যায় ঘোর অন্ধকারে। মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত এই জনপদের মানুষের ভাগ্যের চাকা আজও ঘোরেনি, রয়ে গেছে উন্নয়নের মূলধারা থেকে যোজন যোজন দূরে।

রায়পুর উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ অংশজুড়ে বিস্তৃত এই মেঘনা চরাঞ্চল। এখানে বহু পরিবার প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বসবাস করে আসছে, কিন্তু তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন আসেনি। নদীভাঙন, অনুন্নত যোগাযোগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সংকট এখানকার মানুষের নিত্যসঙ্গী।

উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মোল্লারহাট, হাজিমারা, চান্দারকাল ও সাজু মোল্লার মাছঘাট পর্যন্ত যেতে হয় সিএনজি অটোরিকশায়। এরপর ইঞ্জিনচালিত নৌকায় আরও প্রায় ৩০ মিনিটের ঝুঁকিপূর্ণ নদীপথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছাতে হয় চরে। বর্ষা মৌসুমে নদীর রুদ্রমূর্তি ধারণ করলে এই নৌপথ হয়ে ওঠে অত্যন্ত বিপজ্জনক। ঝড়-বৃষ্টি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে যাতায়াত প্রায় অসাধ্য হয়ে পড়ে, যা চরবাসীর একমাত্র ভরসা।

চরাঞ্চলে পর্যাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাব প্রকট। অনেক শিক্ষার্থীকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন নৌকায় চড়ে মূল ভূখণ্ডে গিয়ে পড়াশোনা করতে হয়। বর্ষার উত্তাল নদী তাদের শিক্ষাজীবনে প্রায়শই বাধা হয়ে দাঁড়ায়, স্কুল কামাই করা তাদের জন্য নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। চিকিৎসাসেবার চিত্র আরও করুণ। জরুরি প্রয়োজনে হাসপাতালে নিতে দীর্ঘ সময় ও ঝুঁকি পোহাতে হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে অকালে প্রাণ হারানোর ঘটনাও ঘটে মাঝে মাঝে, যা চরবাসীর মনে গভীর ক্ষোভের জন্ম দেয়।

নদীভাঙন এখানকার মানুষের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক। প্রতি বছর মেঘনার করাল গ্রাসে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি ও গবাদিপশু। স্থায়ী বাঁধ বা কার্যকর নদীশাসন ব্যবস্থার অভাবে অনিশ্চয়তার মধ্যেই দিন কাটাতে হচ্ছে তাদের।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নির্বাচনের আগে প্রার্থীরা চরাঞ্চলে গিয়ে উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি দেন। রাস্তাঘাট নির্মাণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, কমিউনিটি ক্লিনিক চালু, স্থায়ী বাঁধ নির্মাণসহ বিভিন্ন আশ্বাসের ফুলঝুরি ছড়ানো হয়। কিন্তু ভোট শেষ হলেই সেসব প্রতিশ্রুতি কেবল কথার কথা হয়ে থাকে, বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায় না। চরবাসীর দাবি, টেকসই নদীশাসন ব্যবস্থা, নিরাপদ ও স্থায়ী যোগাযোগ, একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং পর্যাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা হলে তাদের জীবনমানের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে। একই সাথে দুর্যোগকালীন আশ্রয়কেন্দ্র ও সরকারি সহায়তা বৃদ্ধিরও জোর দাবি জানান তারা।

ভোটের সময়টুকুতে স্বপ্ন দেখেন চরবাসী, কিন্তু বাস্তবতার কঠিন জমিনে দাঁড়িয়ে তাদের স্বপ্নগুলো বারবারই ভেঙে যায়। সরকার বদলায়, জনপ্রতিনিধি বদলায়—কিন্তু মেঘনার চরের হাজারো মানুষের জীবনসংগ্রাম যেন একই বৃত্তে ঘুরপাক খায়। উন্নয়নের আলো কবে পৌঁছাবে এই প্রত্যন্ত জনপদে, সেই প্রশ্ন আজও রয়ে গেছে অমীমাংসিত।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

‘রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন এখনো আসেনি, জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করতে হবে’: স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল

মেঘনা চরের নীরব আর্তনাদ: ভোট আসে, সরকার বদলায়, ভাগ্য বদলায় না

আপডেট সময় : ০৬:৪৫:৫৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার মেঘনা নদীর বুকে জেগে ওঠা চরাঞ্চলে বসবাসরত হাজারো মানুষের জীবন যেন এক অন্তহীন সংগ্রাম। প্রতিটি নির্বাচনের আগে নানা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিতে আশার আলো জ্বলে উঠলেও, ভোট ফুরালেই সেই আলো মিলিয়ে যায় ঘোর অন্ধকারে। মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত এই জনপদের মানুষের ভাগ্যের চাকা আজও ঘোরেনি, রয়ে গেছে উন্নয়নের মূলধারা থেকে যোজন যোজন দূরে।

রায়পুর উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ অংশজুড়ে বিস্তৃত এই মেঘনা চরাঞ্চল। এখানে বহু পরিবার প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বসবাস করে আসছে, কিন্তু তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন আসেনি। নদীভাঙন, অনুন্নত যোগাযোগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সংকট এখানকার মানুষের নিত্যসঙ্গী।

উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মোল্লারহাট, হাজিমারা, চান্দারকাল ও সাজু মোল্লার মাছঘাট পর্যন্ত যেতে হয় সিএনজি অটোরিকশায়। এরপর ইঞ্জিনচালিত নৌকায় আরও প্রায় ৩০ মিনিটের ঝুঁকিপূর্ণ নদীপথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছাতে হয় চরে। বর্ষা মৌসুমে নদীর রুদ্রমূর্তি ধারণ করলে এই নৌপথ হয়ে ওঠে অত্যন্ত বিপজ্জনক। ঝড়-বৃষ্টি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে যাতায়াত প্রায় অসাধ্য হয়ে পড়ে, যা চরবাসীর একমাত্র ভরসা।

চরাঞ্চলে পর্যাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাব প্রকট। অনেক শিক্ষার্থীকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন নৌকায় চড়ে মূল ভূখণ্ডে গিয়ে পড়াশোনা করতে হয়। বর্ষার উত্তাল নদী তাদের শিক্ষাজীবনে প্রায়শই বাধা হয়ে দাঁড়ায়, স্কুল কামাই করা তাদের জন্য নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। চিকিৎসাসেবার চিত্র আরও করুণ। জরুরি প্রয়োজনে হাসপাতালে নিতে দীর্ঘ সময় ও ঝুঁকি পোহাতে হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে অকালে প্রাণ হারানোর ঘটনাও ঘটে মাঝে মাঝে, যা চরবাসীর মনে গভীর ক্ষোভের জন্ম দেয়।

নদীভাঙন এখানকার মানুষের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক। প্রতি বছর মেঘনার করাল গ্রাসে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি ও গবাদিপশু। স্থায়ী বাঁধ বা কার্যকর নদীশাসন ব্যবস্থার অভাবে অনিশ্চয়তার মধ্যেই দিন কাটাতে হচ্ছে তাদের।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নির্বাচনের আগে প্রার্থীরা চরাঞ্চলে গিয়ে উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি দেন। রাস্তাঘাট নির্মাণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, কমিউনিটি ক্লিনিক চালু, স্থায়ী বাঁধ নির্মাণসহ বিভিন্ন আশ্বাসের ফুলঝুরি ছড়ানো হয়। কিন্তু ভোট শেষ হলেই সেসব প্রতিশ্রুতি কেবল কথার কথা হয়ে থাকে, বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায় না। চরবাসীর দাবি, টেকসই নদীশাসন ব্যবস্থা, নিরাপদ ও স্থায়ী যোগাযোগ, একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং পর্যাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা হলে তাদের জীবনমানের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে। একই সাথে দুর্যোগকালীন আশ্রয়কেন্দ্র ও সরকারি সহায়তা বৃদ্ধিরও জোর দাবি জানান তারা।

ভোটের সময়টুকুতে স্বপ্ন দেখেন চরবাসী, কিন্তু বাস্তবতার কঠিন জমিনে দাঁড়িয়ে তাদের স্বপ্নগুলো বারবারই ভেঙে যায়। সরকার বদলায়, জনপ্রতিনিধি বদলায়—কিন্তু মেঘনার চরের হাজারো মানুষের জীবনসংগ্রাম যেন একই বৃত্তে ঘুরপাক খায়। উন্নয়নের আলো কবে পৌঁছাবে এই প্রত্যন্ত জনপদে, সেই প্রশ্ন আজও রয়ে গেছে অমীমাংসিত।